প্রেম, বিয়ে ও যোগ্যতা

ফারজানা আকসা জহুরা: আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী , তখন আমার এক ফুপাতো বোন আমাকে বলেছিলেন যে, “কালো মেয়েরা যদি প্রেম না করে… তাহলে নাকি তাদের ভালো বিয়ে হয় না, আর তাই আমার উচিৎ তাড়াতাড়ি একটা প্রেমিক জুটিয়ে ফেলা। যদিও খুব ভালো চাকরি বা বাবার টাকা ব্যাপারটা আলাদা”।

আপুটা খুব কালো ছিলেন, পড়াশোনায় খুব ভালো না হলেও এমএ করে “ল” নিয়ে পড়েছিলেন। আপুকে আমার আত্মবিশ্বাসী বলেই মনে হতো ,তাকে কখনো আমি গায়ের রং বা অন্যকিছু নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখিনি। আপুটা প্রেম করতেন না, অন্যদিকে গায়ের রং খুব কালো হওয়ায় তার বিয়ে হতে অনেক সমস্যা হয়েছিল। আপু যে বিয়ে ছাড়া বাঁচতেন না, তা না l কিন্তু তার পরিবার আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সবাই তার বিয়ে নিয়ে খুব নাক গলাতো, সবাই তার গায়ের রংটাকে দোষ দিত কেউ তার শিক্ষাগত যোগ্যতাটাকে দেখতো না। অবশেষে ৩৫ বছর বয়সে আপুর বিয়ে হলো, তাও ফুপুর তিন তলা বাড়ী দেখে!

ফারজানা আকসা জহুরা

আমার আর এক খালাতো বোন ছিল যার গায়ের রং ছিল খুবই কালো l তার বড় বোনটা ছিল তার উল্টো খুবই ফর্সা। দুই বোনের রং এর এত পার্থক্যের কারণে পারিবারিক ভাবেই কালো বোনটিকে ছোটো করে দেখা হতো। ছোটবেলা থেকেই আমি তাকে “ঝামা” দিয়ে শরীল ঘষতে দেখেছি , এতে তার রঙের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি । হলুদ উপটান কোনো কিছুই কাজে আসেনি । আর এই সব কিছুর জন্য তার পরিবার আর পরিবেশ দায়ী ছিল । তার যখন বিয়ের বয়স হয়নি , তখন থেকেই আমার খালা ও পাড়া প্রতিবেশী সবাই তার বিয়ে নিয়ে চিন্তা করতো …এমন কি গ্রামে যে ফেরিওয়ালা সেও সুযোগ পেলেই তাকে রং নিয়ে কথা শুনিয়ে দিতো। তাই সে নিজের রং ফর্সা করার জন্য এতো ব্যস্ত ছিলো যে, তার যে প্রতিভা ছিল তাও নষ্ট হয়ে গেলো। নিজেকে ফর্সা করতে গিয়ে জীবনে কিছুই করা হলো না তার। কোনো মতে মাধ্যমিক পাস করে সে বিয়ের পাত্রী হলো, সেখানে ও সে ব্যর্থ। তার জন্য বিবাহিত …. তালাক প্রাপ্ত…. বউ মরা এইগুলো ছাড়া কোনো পত্র পাওয়া যায়নি। শেষ যৌতুক দিয়ে তাকে পাত্রস্থ করতে হয়েছে।

এখানে এক ভাবির সাথে পরিচিত হলাম তিনিও খুব কালো। আনেকগুলো ভাই বোনের পরিবারে তিনি সবার ছোট, তার বড় বোনের মেয়ের ঘরে মেয়ের বয়স ৬\৭ বছর । তিনি যখন নবম শ্রেণীতে পড়তেন, তখন থেকেই তিনি প্রেম করছেন তাও ফেসবুক ও স্কাইপ এ ! এমন অজপাড়া গাঁয়ে তাদের বাসা ছিলো যেখানে তেমন নেট সুবিধা নেই, আর তাই ভাইটির সাথে কথা বলার জন্য তিনি শহরে বোনের বাসায় থাকতেন।

যদিও তাদের দুই পরিবারের কোনো জানাশোনা ছিলো না, তবুও তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। শুধু এখানেই শেষ না, ভাই যেহেতু বাংলাদেশে যেতে পারবে না, তাই তিনি ইউরোপে আসার জন্য বিগত ৩\৪ বছর ধরে এক দালালের সাথে বেশকিছু দেশ ঘুরেছেন। ইউরোপের ভিসা পাবার পরই তাদের নেট এ বিয়ে হয়। বিয়ের সময় তাদের দুই পরিবারের প্রথম দেখা সাক্ষাত হয় ও ভাবীটির বাবা ভাইটিকে শহরের তিন কাঠা জমি লিখে দেয়। যেহেতু তিনি প্রেম করেন আর বিয়ে করে বিদেশ আসবেন তাই এসএসসির পরে আর পড়াশুনা করেননি!

ভাবীর এই প্রেমের ইতিহাস শুনে আমি মোটেও আপ্লুত হইনি, বরং অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, একটা পরিবার তার মেয়ে বিশেষ করে কালো মেয়েকে নিয়ে কতোটা অসহায় হলে … তাদের ঐ অল্প বয়সী মেয়েকে নেট বা ফেসবুকের মতোন একটি কাল্পনিক দুনিয়ার মাধ্যমে পাত্র বেছে নিতে সাহায্য করে ! আবার অপরিচিত দালাল এর সাথে অনুমতি দেয় দেশ বিদেশ ঘুড়ে বেড়ানোর ! উনার ভাগ্য হয়তো ভালো …. কিন্তু যদি উনি খারাপ লোকের পাল্লায় পড়তেন, তাহলে উনার কী অবস্থা হতো?

আমি যখন চাকরির সুবাদে গ্রামে গুলিতে যেতাম তখন দেখতাম গ্রামের বেশী ভাগ মানুষই অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াকে যোগ্যতা ও গৌরব বলে মনে করেন। এছাড়াও আমাদের দেশগুলি মা বাবারা ছেলেমেয়েদের বিয়ে নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত থাকেন , সেখানে তাদের কালো মেয়ে নিয়ে একটু বেশি চিন্তিত থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আর তাই তারা অন্য কোনো কালো মানুষ দেখলে তাই ভাবেন যে হয়তো মানুষটি কালো তাই তার বিয়ে হচ্ছে না ইত্যাদি। এই সব চিন্তার ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু না, ব্যতিক্রম আছে।

আমার বাবা-মা এর মতোন অনেকেই আছেন যারা তাদের মেয়েদের সম্পদ বলে মনে করেন। তারাও তাদের মেয়েদের পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে বেশী চিন্তিত থাকেন। কিন্তু সমাজ তো আর তাদের মতন চিন্তা করে না। তাই তাদের সুযোগ বুঝেই মনে করিয়ে দেয় তোমার ঘরে মেয়ে আছে তোমরা কন্যা দায়গ্রস্থ পিতামাতা… হয়তো এই কারণ অনেক সংগ্রামী পিতা-মাতাও এক সময় সমাজের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। কারণ ততদিনে তাদের সেই অর্থ বা সামর্থ্য দুটাই শেষ হয়ে যাই।

যাই হোক , আমি ও আমার বাবা মায়ের মতন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতেই বেশি মনোযোগী ছিলাম । যেহেতু গায়ের রং কালো তাই ঐ রকম কোনো ছেলে জীবনে আসেনি যে তার সাথে প্রেম করবো । এতে আমার কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও অনেকের ছিলো । আমার দেখা ক্যাম্পাসে অনেক মেয়ে ছিলো যারা প্রেম করার জন্য অস্থির থাকতো , যেন প্রেম ছাড়া জীবন অচল । শুধু তাই নয় তারা অন্য কোনো মেয়ে বা ছেলে প্রেম না করলে বা প্রেম প্রস্তাব না পেলে তাকে ছোট করার চেষ্টা করতো …অনেক প্রেমিকা তার প্রেমিকে নিয়ে এমন এমন গল্প করতো যে তাদের কথা শুনে মনে হতো তারা প্রেম করে জগৎতের সকল সুখ অর্জন করেছে শুধু তাই না তারা অতী সুন্দরী এবং তাদের অনেক অনেক যোগ্যতা আছে আর তাই ক্যাম্পাসের সব ছেলে তাদেরকেই চাই। এটাই তাদের বড় যোগ্যতা এবং গর্বের বিষয় !

এই ক্ষেত্রে আমার এক সময়ের প্রিয় বান্ধবিও কম যায়নি। গায়ের রং কালো হবার পরও সে যখন একটা ভালো প্রেমিক জুটিয়ে ফেললো , তখন ঐটাই ছিলো তার অহংকার । তার প্রেমিক আছে …. তার পিছ পিছ অনেক ছেলে বন্ধু ঘুরে …. কই আমার তো সেই সব নাই? তার মানে আমি বাতিল …. আমার সমস্যা আছে ! আমি শুধু কালো নই দেখতেও খারাপ ! শুধু আমি না আমার মতন অনেক মেয়েকে এই ধরণের সমস্যায় পড়তে হয়েছে শিক্ষা জীবনে।

যদিও আমার দেখা অনেক সুন্দরী ফর্সা মেয়েও প্রেম না করায় বা দেরিতে বিয়ে করায় চরিত্র খারাপ … ভালো না … দেমাকী … এই টাইপের অপবাদ ও পেয়েছে , তাও মেয়ে ছেলে উভয়ের কাছ থেকে। ব্যাপার টা আমার কাছে ঐ বিয়ে না হলে যে পাড়া প্রতিবেশীর মাথাব্যথা হয় ঠিক সেই রকমই মনে হতো।

আমি প্রেম বা বিয়ে কোনোটার বিপক্ষে নয় কিন্তু প্রতিটা মানুষের যে একই বিষয়ে রুচি থাকবে তাতো না? এমন তো অনেকেই আছে যারা অন্য কিছুতে বেশি আনন্দ পায়। একসাথে চলতে গিয়ে অনেকের সাথে পরিচয় ঘটে, মন ও মতের মিল হলে ভালোলাগা ভালবাসা হতেই পারে, আর অনেকে হয়তো তেমন কাউকে পাই না, তাই হয়তো তাদের জীবনে কখনো প্রেম আসে না বা বিয়ে করেনি।

কিন্তু প্রেম আসেনি বা বিয়ে হয়নি বলেই কি আমি ফেলনা? প্রেম বা বিয়ে কি আমাদের জীবনের সব? কেউ যদি এর ধারে কাছে হাঁটতে না চায় তাহলে কি সে বাতিল? আবার এই প্রেম … বিয়ে… না হলেই কি আমি অসুন্দর? আমার কোনো যোগ্যতা নাই? আমার ব্যক্তিত্বের সমস্যা?

আমার কাছে প্রেম এবং বিয়ে কোনোটাই জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক কিছু না , যা না হলে জীবন চলবে না বা জীবন বৃথা । যারা এই প্রেম আর বিয়ের হচ্ছেনা বলে অন্যের গায়ের রং বা সৌন্দর্য কিংবা চরিত্র ব্যক্তিত্ব নিয়ে টানা হেঁচড়া করে আসলে তাদেরই ব্যক্তিত্বে ও চিন্তায় অনেক সমস্যা আছে ।

শেয়ার করুন:
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
    23
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.