সুদীপা অথবা মৌসুমী’র ‘সু’ নিয়ে যতো মতাদর্শের দ্বন্দ্ব

মৌসুমী কাদের: নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ে’র পরিচালনায় কলকাতার সাম্প্রতিক বাংলা ছবি ‘প্রাক্তন’ হয়তো অনেকেই দেখেছেন। সিনেমার মূল দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুদীপা (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) এবং উজান (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়)। পাশাপাশি উজানের দ্বিতীয় স্ত্রীর চরিত্রে কিছু অতি অভিনয় বাদ দিলে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন মালিনী (অপরাজিতা আঢ্য)।

এই সিনেমাটি নিয়ে অনেককেই বলতে শুনেছি যে ‘দারুণ একটা ছবি’ হয়েছে, অর্থাৎ তাদের ভালো লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে আট-দশটা আইটেম সিনেমার মতোই আনন্দ-বেদনার কাহিনী ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। তবে হতে পারতো হয়তো। সেই আফসোস থেকেই হয়তো এই লেখা।

মতাদর্শগত দিক থেকে দুর্বল দেখলে কোনো সিনেমাই আমার কাছে শতভাগ মূল্যায়ন বা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এটিও পায়নি। বিংশ শতাব্দীর চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা বিশেষত বাঙালীরা, নারীর অবস্থা এবং অবস্থান নিয়ে এই ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি সেটি দেখা এবং মেনে নেয়া সত্যিই খুব কষ্টকর এবং অপমানজনক।

ছবিতে দেখা যায় স্বামী উজানের মতোন অপোগণ্ড একটি ছেলের সাথে সংসার করতে গিয়ে সুদীপা নিজে হানিমুন প্ল্যান করতে পারছে না, ভালবেসে স্বামীর জন্যে জামা-কাপড় কিনলে তাতে স্বামীর মনে হচ্ছে যে ‘স্ত্রী’ টাকার গরম দেখাচ্ছে, বাবা-মায়ের মূলভূমি ছেড়ে সুদীপাকে স্বামীর বাড়ি কলকাতায় থাকতে হচ্ছে, কেননা সেটাই নিয়ম, স্বামী যখন খুশী তখন বা ততোদিন বাড়ির বাইরে থাকতে পারছে, আর ‘স্ত্রী’ সুদীপাকে যথাসময়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। স্বামী উজান জোর গলায় বলছে, সুদীপা তার ‘প্রপার্টি’ আর সেসব শুনেও সুদীপা এডজাস্ট করে সংসারে টিকে থাকবার চেষ্টা করছে। শেষপর্যন্ত স্বামীর অতিক্ষমতা প্রয়োগ এবং স্ত্রীর সংগে নানা বৈপরিত্যের ফলাফল হিসেবে বিবাহবিচ্ছেদ এবং সুদীপার মুম্বাই ফিরে যাওয়া। 

এখানেই যদি গল্পটি শেষ হতো, তাও চলতো। কিন্তু দেখা যায় যে, যে সম্পর্কটি পনের বছর আগে ভেঙে গিয়েছিল, তাদের আবার একটি ট্রেনে ‘প্রাক্তন’ হিসেবে ফিরিয়ে আনা হলো। আর সাথে আবির্ভাব হয় আরেকজন তৃতীয় নারীর, যিনি উজানের বর্তমান স্ত্রী মালিনী। যিনি সামাজিকভাবে একজন গ্রহণযোগ্য নারী, যা মূলত: পিতৃতান্ত্রিক সমাজেরই আরেকটি শিকার। মানিয়ে নেয়া তাকে পরিবার থেকেই শেখানো হয়েছে, ছলচাতুরি করে কী করে শ্বশুরবাড়ি বাগাতে হয় সেটাও তার জানা আর একারণেই সে ‘ভাল স্ত্রী’।

আমরা যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বাস করছি, সেখানে নারী সুস্পষ্টভাবেই নিপীড়িত। এটা নতুন কোন টপিক নয়। বহু পুরনো। মেয়েদের বিয়ে মানেই কম্প্রোমাইজ, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক মানেই ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ ভেবে বসা। প্রেম মানেই দ্বন্দ্ব, দূরত্ব, অহম নিয়ে টানাটানি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর সকল ধরনের ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ এর দায়ভার কেবল মেয়েদের।

এই সিনেমাতেও সুদীপার কাছে প্রত্যাশাটা তেমনই ছিল। একজন আর্কিটেক্ট হিসেবে তার পেশাটা ট্যুরিস্ট গাইড উজানের চেয়ে যতো উন্নতই হোক না কেন, দিনশেষে সে ঘরের বউ। নিজের সকল ইচ্ছেকে জলাঞ্জলি দিয়ে স্বামীর পরিবারের নিয়মকানুন তাকে মেনে চলতে হবে। দীর্ঘদিনের এই ঘানিটানা ইতিহাস থেকে নতুন কী দিয়েছে এই সিনেমা?

সুদীপা’র মতোন আধুনিক স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা বোধসম্পন্ন মেধাবী আধুনিক মেয়েরাই  সংসার করতে পারে না- আর সেটাই যেন এই সিনেমার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত। ‘স্বল্প শিক্ষিত এবং কূটবুদ্ধিসম্পন্ন’ মানিয়ে চলা মালিনীর মতো মেয়েগুলোকেই ‘আদর্শ’ বলে চালিয়ে দেয়া হলো। সুদীপার ভালোবাসা তীব্র, তাই সম্ভবত তার কষ্টগুলোকে ডালপালা মেলে দেখানো হলো। আর উজান এর ভালোবাসায় হারাবার কষ্ট আছে, তবে সেটা এতো তীব্র নয় বলেই পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে  মানানসই আদর্শ স্ত্রী পেয়ে সে সব ভুলে সুখী হয়ে রইলো।

যদিও সুদীপারও যে পরে আরেকটি সংসার হয়েছে সেটি দেখা গেল সিনেমার একদম শেষ মুহূর্তে। কিন্তু ঠিক বোঝা গেল না সেই বর্তমান স্বামীটি কি পুরুষতন্ত্র’র প্রভাবমুক্ত? বা কোনদিক থেকে সে বেটার স্বামী?

ট্রেনের শেষ মুহূর্তগুলোতে সুদীপা’কে ক্রমশঃ ‘সু’ তে আক্রান্ত মহান মানবিক করে দেখানো হলো (যেটা দর্শকের জন্য আধুনিক ও আদর্শ মনে হতে পারে);  সে এমনই কেয়ারিং যে প্রাক্তন স্বামীকে তার বর্তমান স্ত্রীর সাথে প্রাইভেট সময় কাটাতে দেবার সুযোগ করে দিয়ে তাদের বাচ্চাকে নিয়ে ট্রেনের কামরার বাইরে চলে যায়। আর প্রাক্তন উজান নির্লজ্জভাবে সেই প্রাইভেসি মুঠোয় তুলে নেয়; এই নেবার মধ্যে কোন লজ্জাই পরিচালকেরা দেখতে পান না। বরং দেখা যায় পুরুষের শারীরিক কামনা-বাসনার কাছে প্রাক্তনের তীব্র অসম্মান আর অমানবিকতায় মুড়িয়ে সুদীপাকে যেন আরো ‘সু’ করে তোলা হয়।

সবমিলিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালকেরা যেন দেখাতে চেয়েছেন যে, সুদীপা আর উজান দু’জনেরই কমবেশি দোষত্রুটি ছিল। তবে উজানের দোষগুলো তেমন গুরুতর নয়, কষ্ট বা অনুতাপের চেয়েও বেশি ছিল সন্তানের জন্মদাত্রী এবং সাধারণ একজন নারীর সাথে সংসার করার আনন্দ। আর নি:সন্দেহে সুদীপার দোষ ছিল; আরেকটু মানিয়ে গুছিয়ে ‘পিছনে খানিকটা কূটচাল আর উপরে দারুণ ‘সু’ রকম ভালো বা আদর্শ’ হয়ে থাকবার গুণের ঘাটতি!  এটা এক ধরনের পুরুষতন্ত্রের হিপোক্র্যাসি!

দারুণ স্মার্ট, উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী নারীর সাথে প্রেম করা চলে। কিন্তু বিয়ে? বিয়ের পর পুরুষ হয়ে ওঠে ‘পতি বা কর্তা’। ‘পিতৃসত্ত্বা’ তখন সকল মানবিকতাকে ছাড়িয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।  প্রশ্ন এখানেই।

মৌসুমী কাদের

বিকল্প হিসেবে কী সিনেমাটিতে দেখানো যেত না যে, একজন ‘কমযোগ্য নারীটির সঙ্গে’ সফল না হয়ে স্বামীটি ঐ প্রাক্তন স্ত্রীটির জন্য সমানভাবে উদারতা প্রকাশ করছে, সমানভাবে স্যাক্রিফাইস করছে। নিজের এবং সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য সুদীপাকেই যোগ্য মনে করছে। পিতৃ বা মাতৃ, কোন সত্ত্বাই তীব্র না হয়ে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমসত্ত্বা, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? নাকি এগুলো দেখালে পিতৃতন্ত্রের গায়ে কলংক লেপে দেয়া হতো?  

সিনেমার মেকিং, অভিনয় আর সুন্দর গানগুলোর কারণে এটি জনপ্রিয় হবে, সেটাই স্বাভাবিক। দর্শকদের যে কারোর এই সিনেমা ভালো লাগতে পারে যদি তার নিজস্ব সচেতনতা না থাকে।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি ভালো নয়, বরং বাজে; কারণ এটি একটি হিপোক্র্যাট আদর্শকে মহান করে ছড়িয়ে দেবার কাজে লেগে যাচ্ছে কোন না কোনভাবে।  

সবকিছুর গোঁজামিল দিয়ে ঋতুপর্ণা আর প্রসেনজিতকে এক ফ্রেমে এনে প্রবল প্রেমের ছলাকলা দেখিয়ে ছবিটিকে সুপার-ডুপার হিট করে ফেলেছেন পরিচালকেরা। কিন্তু তাঁদেরকেই আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, ‘আর কতকাল আপনারা  সুদীপার ‘সু’ তন্ত্রকে পিতৃতন্ত্র দিয়ে ঢেকে রাখবেন?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.