বোকা কিশলয় একা বাঁচতে চায়….

আঁখি সিদ্দিকা: একটা মেয়ে। একটা বললাম কারণ সে বস্তু। মেয়েরা একজন হয় না। একজন হয়ে উঠলে রেপ্লিকা তৈরির কারখানা সমাজের সুড়সুড়ি লাগে। যাহোক একটা মেয়ে! ধরে নেই তার নাম কিশলয়। এই রে কিশলয় নামটা আবার ছেলেদের মতো হয়ে গেলো না? হ্যাঁ, মেয়েটি ছেলেদের মতো হওয়া চলবে না, মেয়েটি আবার মেয়ের মতোও হওয়া চলবে না। তাকে রীতিমতো তার মতো হয়ে উঠতে হবে মাথার উপর যে একজন আছে, মাথার উপর তিনি কে আছেন? এটা বলা যেতে পারে আল্লাহ বা ঈশ্বর। না মোটেই না। তিনি তো সর্বজনীন। তিনি তো শুধু মেয়েটির জন্য না। মেয়েটির সাথে আবার তার পক্ষপাতমূলক ব্যাপার-স্যাপার আছে, ওটা অন্য আলোচ্য বিষয়।

আঁখি সিদ্দিকা

মেয়েটির মাথার উপরে একজন পুরুষ ছাতা লাগে। ধারণা মাত্র। বা অভ্যাস মাত্র। মেয়েটিও চায়, চাইতে শেখানো হয়, অভ্যস্ত করে তোলা হয়। আর যে মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার এই ছাতাটির দরকার নেই বা বন্ধু মনে করে পুরুষকে পাশে রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তাদের অভিজ্ঞতাও ওই ছাতার বিস্তার। রোদ বৃষ্টি ঝড়ে ছায়া হয়ে ওঠা নামকাওয়াস্তে ছাতাখানির আড়ালে নাভিশ্বাস উঠে আসা ওই বস্তু মেয়েটি আর ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে না।

সমাজ,পরিবার নামের সংগঠনটি তার এই একজন হয়ে ওঠা, ব্যক্তি হয়ে ওঠা, ঘাড় সোজা করে, পিঠ টান করে হাঁটা পছন্দ করে না। কিশলয় তার কচি কচি পাতা নিয়ে লুকিয়ে সবুজ হয়ে উঠবে তার ভেতর, সেই পুরুষজনের ভেতর আলগোছে খরগোশ ছানা হয়ে উঠবে, গুলুগুলু বাচ্চা হয়ে থাকবে, পাখিটা হয়ে বাঁচবে। এমন করে বাঁচতে হয়তো কিশলয়ের আপত্তি ছিলো না, কিন্তু গুলুগুলু বাঁচাটুকু ওই বিছানা পর্যন্ত। ওই প্রয়োজন পর্যন্ত। তারপর কিশলয় আবার তথৈবচ। কিশলয়ের কোন ইচ্ছা থাকবে না। কিশলয় নিজের মতো করে তার আর পুরুষের দেয়া ও ফেলে রেখে যাওয়া সন্তানটি একা নিজের মতো করে বাঁচতে ও বাঁচাতে পারবে না।

মেরুদণ্ড সোজা করে, সাহস করে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইলে সে হবে বেয়াদব। আরও যা যা তা এখানে হয়তো লেখা সম্ভব না। কিশলয় বিয়ে না করে একলা বাঁচবে , তা হয় নাকি? একা মেয়েমানুষ কী থেকে কী হয়ে যায়? হলো বিয়ে, পুরুষ নামের ছাতা মাথার উপরে। বেশ, প্রয়োজন ফুরালো পুরুষ ছাতার। সে অন্য কোনো মাথায় তার ছাতা ধরতে চলে গেলো। কিশলয় আবার উঠে দাঁড়ালো। একা বাঁচবে। তার ভেতর থেকে আসা শিশুটিও নিজে বড় করে তুলবে , বাঁচাবে।

কিন্তু কেনো? তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্বেও সে ওঠে কোন অজানা পুরুষের রক্ষিতা, কারণ সে একা বাঁচে। তার বাড়িতে লিখিত ও অলিখিত যেকোনো পুরুষ আসা মানেই সে তার সাথে শোয়, কারণ সে একা বাঁচতে চায়। কিশলয় নত হয় না। এটাই তার মারাত্মক অপরাধ। মেয়েমানুষ! এতো চড়া আর মেজাজি হবার কী দরকার? আরে একা থাকে তো। রস কোথেকে আসবে? অফিসে পুরুষতান্ত্রিক নারী ও পুরষের তার উঁচু গলা, পিঠ টান করে হাঁটা, অন্যায় মেনে না নেওয়া ভূমিকা ভালো লাগে না। কারণ সে একা বাঁচে।

কলিগদের নাকে-নাকে ভাইয়া ডেকে গলে না পরা কিশলয়ের ব্যক্তিত্ব কারও ভালো লাগে না। কারণ মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষ হয়ে থাকবে। তার পুরুষের মতো আচরণ থাকবে কেনো? সব মেরুদণ্ড পুরুষ জমা নিয়ে নিয়েছে সৃষ্টির শুরুতেই। পুরুষের হাড়ের একটা অংশমাত্র দিয়ে মেয়েমানুষ সৃষ্টি হয়েছে, তার আবার এতো জোর হবে কেনো?

কিশলয় লেখে। নারীলেখক, নারী সাহিত্যিক, মহিলা কবি এসব গালি তার সহ্য হয় না। কোন পুরুষ সম্পাদক, লেখক, প্রকাশকের সাথে তার সখ্যতা নেই। সে বেয়াদব লেখক। সে তাই কোনো দশকের হয়ে ওঠে না। সে কারও চোখে পড়লেও নারী হিসেবে, তার মুখ ঘুরিয়ে থাকা, তার লেখা, লেখা হয়ে উঠবার চাহিদা তাকে সংঘহীন, একা করে ফেলে। কারণ তার চাহিদা, তার লেখা-তার সৃষ্টিশীলতা সম্মান পাক। নারী হয়ে কারও কোনো সুনজর বা করুণা সে চায় না। তাই তার চাওয়াটুকু অহংকারের মতো দেখায়।

সংগঠক কিশলয় তার স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো পুরুষ বন্ধুদের নিয়ে, পুরুষতান্ত্রিক নারীও ছিলোও তার সাথে। চিনতে ভুল করা কিশলয় এর হৃদয় সেসব স্বার্থপর পুরুষতান্ত্রিকতার কাছে হেরে যায়। বুদ্ধির খেলায় কিশলয়ের স্বপ্ন তাই অন্যকে প্রতিষ্ঠা দেয়।

কিশলয়ের পছন্দের মানুষ তাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। লুকিয়ে ভালোবেসে চলে যাবে। কারণ কিশলয় ডিভোর্সি। তাকে জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে বন্ধু বলা যায় না। কিশলয়কে কারও সামনে তুলে ধরা যায় না। ‘বাবা-মা চায় না, কী করবো বলো?’ তোমাকে তো বাবা মা মেনে নেবেন না, আর আমি তাদের অমতে কিছু করলে তারা হার্ট এ্যাটাক করবেন’। এই সমাজ কিশলয়ের বিবাহবর্হিভুত সম্পর্ক মেনে নেবার জন্য প্রস্তুত নয়। ভালোবাসার মানুষটি তাই প্রয়োজনের সময়টুকু ওই মিঃ হাইড হয়ে থাকতে পেরেছেন। এবার তার বিয়ে করবার পালা, বাবা-মা চান যে। কিশলয়ের হার্ট নেই। তার এ্যাটাক হয় না। কিশলয় হৃদয়ে বুদ্ধি নেই। বোকা কিশলয়ের দুমড়ানো হৃদয় তাই তার ব্যক্তিত্বের দেয়ালের কাছে হার মেনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অনড়।

পরিবার সংগঠনের কাছে ,তার অতি প্রিয় বাবা-মা-ভাই-বোনের কাছে মেয়েটা চিন্তা নয় কেবল, রীতিমতো দুশ্চিন্তার কারণ। কেমনে এতো লম্বা জীবন একলা পার করবে? কিন্তু প্রশ্ন হলো কিশলয়ের মায়ের কাছে কতটুকু তার বাবার ভূমিকা আছে , ওই খাওয়া পরা আর বিছানা ছাড়া। কোন মর্যাদায় থাকেন মা-খালা-মাসী-দিদিরা? কিশলয় তার পরিবারের জন্য করতে ভালোবাসে। মাকে তার দেখে রাখতে ইচ্ছা করে। বাবার সাথে বসে গল্প করতে ইচ্ছা করে। পাশে থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কিশলয় একলা, তাকে দেখতে ভালো লাগে না। ছোট মেয়েদের জামাইরা বাড়ীতে অনুষ্ঠানে আসে। মা বাবা খানিকটা বিব্রত হন। কিশলয়ের এই একলা থাকা তাদের লজ্জার কারণ।

কিশলয়ের জন্য সহৃদয়বান পাত্রের প্রস্তাব আসে। মেয়েটাকে , কিশলয়টাকে উদ্ধার করতে আসছেন তিনি। বিবাহিত জেনেও আসছেন, সন্তান আছে জেনেও আসছে। আহা, ছেলেটার একটা প্রেম ছিলো মাত্র। ওই আর কী বিয়ে হয়েছিলো, টেকেনি। বিয়েটা টেকেনি তাও ছেড়ে যাওয়া মেয়েটির দোষে। ছেলেটি ধোয়া তুলসি পাতা। কিশলয় রাজী হচ্ছে না। তোলপাড়। এমন ছেলে, কেউ হাত ছাড়া করে? কী বোকা রে কিশলয় তুই? তারপর কিশলয়ের সন্তানেরও তো একটা বাবা দরকার। একজন দায়িত্বহীন বাবা চলে গেছে, আরেকজন হৃদয়বান মানুষ দায়িত্ব নিতে এসেছে, এটা কম কী?

বোকা কিশলয় একা বাঁচতে চায়। তার সাহসে ঘুনপোকা লাগতে দিতে চায় না। সে সমাজের রেপ্লিকা হতে চায় না, কিশলয় পুরুষতান্ত্রিকতার মুখস্ত অভ্যাস হতে চায় না। বোকা কিশলয় তার ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরতে চায়। বোকা কিশলয়টি মাটিতে পা রেখে আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলো। এই চাওয়ার, এই অপরাধের শাস্তিস্বরুপ কিশলয় আজ সংঘহীন, নিঃসঙ্গ,জানালাহীন একলা মানুষ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.