ছেলের মা-বাবা বনাম মেয়ের মা-বাবা

প্রিয়াঙ্কা প্রি: মা-বাবা আমাদের জীবনে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত তাদের অবদান, ভূমিকা, প্রয়োজনীয়তা কিছুই অস্বীকার করার মতো নয়। তাই তাদের প্রতি আমাদের দায় ও দায়িত্ব অনেকখানি। সে দায় ও দায়িত্ব থেকে সন্তানেরা বড় হয়ে বাবা-মায়ের খেয়াল রাখে, তাদের দরকার-অদরকার, সুযোগ -সুবিধা দিয়ে থাকে। 

আর্থিক নিশ্চয়তা থেকে শুরু করে তাদের বৃদ্ধ বয়সের নানান আবদার পূরণ করার চেষ্টা করে। তাদের মতামতকে অধিক গুরুত্ব দেয়, অধিক সম্মান দেয়, তাদের বাধ্য সন্তান হয়ে তাদের কথামতো চলার চেষ্টা করে। যেটা সব সন্তানেরই করার কথা। আসলেই কি সব সন্তানের দায়িত্ব! নাকি শুধু ছেলে সন্তানের দায়িত্ব!

প্রিয়াঙ্কা প্রি

আমাদের সমাজের অলিখিত নিয়ম ছেলেটি বড় হয়ে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিবে, এবং তার বিয়ে করা বউও তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিবে, তাদের সন্তুষ্ট রাখবে এবং সে দায় মেয়ের বাবা-মা-ভাই পরিবারের উপরও বর্তায়, কেবলমাত্র ছেলের বাবা-মাকে খুশী রাখা। অন্যদিকে মেয়ের বাবা যদি এরচেয়ে অধিক যত্নে, অধিক পরিশ্রমে, অধিক কষ্টে, অধিক আত্মত্যাগে মেয়েটিকে বড় করে, এরপরেও না তাকে কাছে রাখতে পারে, না তার থেকে কিছু প্রত্যাশা করতে পারে।

একদিন সন্তান বড় হয়ে তাদের দায়িত্ব নিবে, তাদের খুঁটি হবে ছেলের মা-বাবার মতো, মেয়ের মা-বাবা এই আশা নিয়ে মেয়েকে বড় করে না। বরং অন্যের সংসারের ঘানি টেনে যাবে এই নির্মমতা মেনে নিয়ে নি:স্বার্থভাবে বড় করে, বিয়ে দেয়। এরপরেও কিন্তু তাদের দায় শেষ হয়ে যায় না। বরং বিয়ের পর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির জন্য কতটা করে যেতে পারলো সে পরীক্ষায় নামতে হয় তাদের। এবং যতোদিন বেঁচে থাকে প্রতি পদে পদে, জীবনের প্রতিটি স্তরে তাদের একটি মেয়ের যোগ্য মা-বাবার প্রমাণ দিয়ে যেতে হয়।

এবং অতি অবশ্যই প্রতি পদে পদে তাদের হোঁচট খেতে হয়, অসম্মানিত হতে হয়। বিয়ের দিন থেকে এই প্রবাহ শুরু হয়। তারা কতটা খাতির করলো, আপ্যায়ন করলো, কী খাওয়ালো, কী দিল, কী দিল না, সবদিকে তাদের মেয়ের মা-বাবা হবার প্রমাণ দিতে হয়। অন্যদিকে ছেলের মা-বাবা হবার শর্তে প্রতি মুহূর্তে দোষ ধরা ও অসন্তোষ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের ছেলে জন্ম দেয়ার ঋণ শোধ নেয় মেয়ে বাড়ির থেকে।

যে কষ্টে তারা ছেলে বড় করেছে তার দায়স্বরূপ মেয়ের বাবা-মায়ের কাছে যৌতুক চাইতে তাদের বিবেকে বাঁধে না এবং যদি না পায় এর ঝাল নববিবাহিতা বউটির উপর উঠিয়ে মেয়ের বাবা-মাকে শায়েস্তা উপায় তো থাকলোই। বিষয়টা এমন দাঁড়ালো, ছেলে বড় হয়ে বাবা-মায়ের জন্য করে যাবে, আর মেয়ে বড় হলে উল্টো মেয়ে, মেয়ের বর, শ্বশুর-শাশুড়ি এক এক করে লিস্ট বড় হতে থাকবে যাদের জন্য মেয়ের বাবা-মায়ের করে যেতে হবে।

ছেলে পাবে জামাই আদর, আর মেয়েটিকে শুধু মেধায় না, কাজে কর্মে  ও সেবাযত্নে সবার মন জোগানোর অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হবে। অন্য একটি পরিবার থেকে অনৈতিকভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা ছাড়াও, অন্যের মেয়ের থেকে সেবা যত্ন থেকে শুরু করে এমন সব প্রত্যাশা করে যে, মেয়েটির জন্ম থেকে বড় হওয়ায় যাদের কোনরকম অবদান নেই।

এতোদিনের আদরে কন্যাটি রাতারাতি কাজের বুয়া হবার এই কঠিন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হবার পর তার কপালে তো বটেই, তার বাবা-মায়ের জন্যও অপেক্ষা করে কঠিন অসম্মান। একমাত্র ছেলের মা-বাবা হবার কারণে তারা মেয়ের মা-বাবাকে যা খুশী তাই বলার অধিকার রাখে।

তারা কেন তাদের মেয়েকে এভাবে বড় করলো, কেন পড়ালেখা শেখানোর পাশাপাশি বুয়া বানানোর ট্রেনিং দেয়া হলো না, তাদের লালন পালনের উপর আঙুল তুলতে তাদের একবিন্দু দেরি হয় না। মা-বাবা তো বটেই, তাদের ছেলে যে কিনা নিজের বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষায় অবিচল, অন্যের মা-বাবাকে অপমান করতে সেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কখনো সে মা-বাবার গলায় সুর মেলায়, আবার কখনো মা-বাবার অধিক আগ্রাসন পছন্দ না হলেও, বাবা-মা অসম্মানিত হবে এই মর্মে মৌনব্রত ধারণ করে, লক্ষী ও বাধ্য সন্তান হবার প্রমাণ দেয়।

যে পিতা-মাতার ঋণ শোধ করা যাবে না, তারা চাইলেই তার বিবাহসূত্রে অন্যের মেয়ে ও তার পরিবারকে চরম নাজেহাল করার মধ্যে যদি ঋণ শোধের সামান্য স্বাদ পায়, তাতে ক্ষতি কী! তাদের অতি ভাল ছেলেটির প্রচণ্ড আর্থিক সমস্যায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছ থেকে কিছুই প্রত্যাশা করে না, বরং তাদের জন্য কিছুই করতে পারলো না এই চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, এদিকে এরচেয়ে অধিক বৃদ্ধ মেয়ের মা-বাবার কাছে কিন্তু তার প্রত্যাশা অনেক।

অতি ভালো শিক্ষিত ছেলেটি আবার সে কথা মুখ ফুটে নিজের মা-বাবার মতো বলতেও পারে না। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না এই অধিক টানাপোড়েনে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি তার সম্মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আবার অনেকের মনে সম্মান থাকলেও, প্রদর্শনে ঘটে বিপত্তি। মেয়েকে তো “মা” “মা” করে মুখে ফেনা তুলে ফেলতে হবে। কখনো নিজের মা থাকলেও ভুল বুঝে আসলে তাকে না, শাশুড়িকে ডাকছে মেয়ে।

মা মনে মনে খুশী হয়, যাক মেয়েকে মানুষ করলাম। এদিকে ছেলে যদি নিজের মায়ের সামনে শাশুড়িকে “মা” ডেকে বসে, তাহলে তো হলো “এই জন্যই কী ছেলে জন্ম দিলাম, ছেলে আমার গেল গেল, বউয়ের হয়ে গেল “। মার আক্রোশ থামাতে ছেলে সদা সচেষ্ট থাকে যাতে নিজের মায়ের সামনে শাশুড়িকে ভুলেও “মা” না ডাকে। শিক্ষা-দীক্ষা, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান ছেলে পক্ষ নিচু হলে নিজেদের হীনমন্যতা ঢাকতে মেয়ে বাড়ি শুনে কটুক্তি, আর অবস্থান উঁচু হলে তো কথাই নেই।

এতো গেল ঘরের কথা। চাকরির ক্ষেত্রেও, ছেলের আয়ের উপর অতি অবশ্যই মা-বাবার হক আছে, মা-বাবার না লাগলেও তাদের দেয়া উচিৎ। প্রকারান্তে চাকুরীজীবী মেয়ের আয় অবশ্যই পরিবারেই কাজে লাগানো উচিৎ। নিজের মা-বাবাকে দিতে গেলে কেমন যেন ছোটো হয়ে যেতে হয়। আর ছেলের কামাই যতোটা না গর্বের, মেয়ের কামাই খাওয়া ঠিক ততোটাই লজ্জার।

বাবা-মা যদি আমাদের দায়িত্ব হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে তা কেন ভিন্ন হবে! কেন ছেলের মা-বাবা সবসময় আক্রমণাত্মক হয়ে থাকবে, আর অবনত থাকবে মেয়ের মা-বাবা! কেন ছেলের মা-বাবা ঈশ্বর হয়ে পূজনীয় হবে, আর কেনই বা মেয়ের মা-বাবা অপরাধীর মতো সাজা ভোগ করে যাবে! কেন ছেলের মা-বাবা বনাম মেয়ের মা-বাবার এই অসামঞ্জস্যতা, ভারসাম্যহীনতা অক্ষয় থাকবে দিনের পর দিন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.