নারীভাবনা

ফিরোজ আহমেদ : কী আধুনিক, কী প্রাচীন, বয়সকালে পুরুষমাত্রেই নারীকে লইয়া ভাবিয়া থাকে। কেহবা আরাধ্য রূপে, কেহ আবার ভোগ্যবস্তুরূপে নারীকে লইয়া ভাবিতে ভাবিতে বসন্তদিন অতিক্রম করিয়া থাকে। একদা চুলে টেরি কাটিয়া বাবুগণ আজকান-চাপকান সহযোগে জুড়িগাড়িযোগে নটিবাটীতে যাইয়া নারী ভাবনায় সমবেত হইতেন। বাঈ নাচিতো চরকির বেগে, বাবুর হাতে থাকিতো রক্তিম গেলাসের পানীয় বাবুর মস্তিষ্কে তুর্কীনাচন সৃষ্টি করিতো।

এইভাবে দীর্ঘদিন ধরিয়া দেবদাস-চুণিলাল-নন্দলালগণ নারীকে লইয়া বহুদূর ভাবিয়াছিলেন। ভাবিতে ভাবিতে কেহবা ফতুর হইয়া নারীকেই দোষারোপ করিয়া গৃহে অবস্থিত মহলবাসিনীর উপর চড়াও হইয়া হাতের সুখ মিটাইয়াছেন; কেহবা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া ডাক্তার-কবিরাজগণকে অঢেল পয়সা ঢালিয়া অকাতরে যৌবনে সংঘটিত ঘটনাক্রমের জন্য নারীকে অভিসম্পাত করিয়া আপাত সান্তনা খুঁজিয়াছেন। এইভাবে নানান ব্যক্তিবর্গের নারীভাবনা নানানরূপে সমাজে বিবৃত ছিল। বস্তুত নারীভাবনায় পুরুষরাই সদা সক্রিয় – একথা বলাই বাহুল্য; কেননা নারীরা নিজেরা নিজেদের লইয়া ভাবিতে জানে না – ইহা পুরুষমাত্রেই সু-অবহিত। সুতরাং, বিষয়টি এইভাবেই চলিয়া আসিতেছিল…

নারী লইয়া ভাবিতে ভাবিতে একদা আবিষ্কার হইলো নারীর প্রকারভেদ একান্ত আবশ্যক। দুষ্টু নারী ও শিষ্ট নারীর প্রকৃতি সংজ্ঞায়িত করাও অত্যাবশ্যক। ফলে পণ্ডিতগণ রাশি রাশি পুঁথি-পুস্তিকা লইয়া বসিয়া পড়িলেন। আবিষ্কৃত হইল নারীর হস্তিনী, শঙ্খিনী, হরিণী, পদ্মিনী ইত্যাদি রূপ। দোষগুণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করিয়া, নারীর ব্যবচ্ছেদ ঘটাইয়া নারীতত্ত্বের সৃষ্টি করা হইল। নারীকে সমাজ নামক স্বর্ণশৃঙ্খলে রাখিবার উৎকৃষ্ট পন্থাসমূহও সুবিবেচনার সহিত উপস্থাপিত হইল। নারীর মঙ্গলামঙ্গল লইয়া পণ্ডিত পুরুষগণ বিস্তর লিখিলেন, বলিলেন এবং সমাজ ও ধর্মনীতি হিসাবে উহা প্রতিষ্ঠাও করিলেন। বিষয়টি এইভাবেই চলিয়া আসিতেছিল…

কিন্তু বিধিবাম…

ইত্যবসরে কিছু সৃষ্টিছাড়া পুরুষ সকল কিছুর ব্যত্যয় ঘটাইলো। তাহারা অকস্মাৎ নারীকে চন্দ্রের সহিত তুলনা করিয়া, নারীর দেহসৌষ্ঠবকে স্বর্গীয় জ্ঞান করিয়া ও তাহাদিগকে দেবীতুল্য করিয়া, তাহাদের অঙ্গুলীকে বানরের সুখাদ্য চম্পককদলীর সহিত অহেতুক তুলনা করিয়া, গাত্রবর্ণকে কাঁচাস্বর্ণের মানে উত্তীর্ণ করাইয়া একেবারে হুলস্থুল ঘটাইয়া দিল। এইসকল জাতধর্ম বিনষ্টকারী পুরুষকূলকে লোকে কবি আখ্যা দিয়া সর্বনাশের ষোলকলা পূরণ করিল। কবিগণের এহেন প্রশ্রয় পাইয়া নারীগণ প্রথমে পুরুষ পদতল হইতে মস্তক তুলিল, তারপর পদধূলিবিহীন জীবন-যাপনে অভ্যস্ততা কাটাইয়া উঠিতে লাগিল, পরিশেষে নিজ পদযুগলের উপর ভরসা খুঁজিবার মত পাপচিন্তা শুরু করিল। পুরুষ নামের কলঙ্ক, কবি নামধারী এসকল ব্যক্তিবর্গ কী সর্বনাশটাই না করিল কোমলমতি, অবলা ও মহলবাসিনী নারীগণের। চতুর্দিকে ধিক্কার পড়িল। সমাজকে, মানবজাতিকে এইভাবে রসাতলে প্রেরণ করিবার ষড়যন্ত্র রুখিতে পুরুষগণ, সমাজপতিগণ এবং পণ্ডিতগণ বিভিন্ন সভা গঠন করিলেন (অধুনা যাহাকে লোকে টাস্কফোর্স বলিয়া থাকে সেরূপ আর কী)।

তাহারা কবিগণকে সমাজত্যাজ্য এবং নারীগণকে পুনঃমহলবন্দী ঘোষণা করিলেন (পূর্ব থেকে তাহারা মহলবন্দীই ছিল, তবু অধিকন্তু ন দোষায়-সমাজকে তো বাঁচাইতে হইবে)। এমন সমাজচ্যূত পুরুষগণ যেন নারীভাবনার সহিত আর সম্পৃক্ত না হইতে পারে এই জন্য ঘন ঘন সভার সভ্যগণ বৈঠক করিলেন। আর যাহাকে সম্মুখ সমরে পাইলেন তাহাকে নিকাশ করিলেন। বিষয়টি এভাবেই চলিয়া আসিতেছিল…

কিন্তু কাল-মহাকাল জানে, গোদের উপর প্রায়শই বিষফোঁড়া জন্ম লইয়া থাকে।

ক্লারা জেটকিন, সিমন দ্য বেভোয়ার, বেগম রোকেয়া নাম্নী কিছু কলঙ্কিনী এই বিষফোঁড়ার অবতারণা করিলো। তাহারা বহুকালের সত্যগঠিত সমাজকে ধ্বংস করিবার পাঁয়তারা স্বরূপ নারী অধিকার, সমাজে নারীর অবস্থান, নারী শিক্ষা (যাহা কিনা একেবারেই অবৈধ) এমনকী নারী জাগরণ লইয়া উচ্চবাচ্য শুরু করিলো। তাহাদের সহিত যুক্ত হইলো বিভীষণরূপী কিছু পুরুষ। অন্তঃপূরে তাহাদিগকে নানারূপ সহযোগিতা প্রদান, প্রকাশ্যে রাজপথে তাহাদের আন্দোলন নামক বেহায়াপনায় অংশগ্রহণ এবং বিবিধ লেখনীতে সমাজের এতদিনকার গুছাইয়া রাখা ‘নারী’ বিষয়টিকে বিষমরূপে কণ্টকিত করিয়া তুলিলো। সমাজে গেল-গেল বলিয়া রব উঠিল। কতিপয় কলঙ্কিনী যদিবা ভুল করিয়া অধিকার লইয়া রব তুলিয়াই থাকে, তাহাতে তেমন চাঞ্চল্যের কিছু ছিল না। অবলাগুলিকে মিষ্ট কথায় না হইলে প্রহার অথবা বেশী বাড়াবাড়ি করিলে প্রাণসংহার করিলেই বিষয়টা মিটিয়া যাইত। কিন্তু কিছু হতভাগা নচ্ছার পুরুষ এইসকল নটিদের সঙ্গে মিলিয়া ব্রহ্মাণ্ডকে ধ্বংসের পথে ঠেলিয়া দিল।

‘নারীগণ নাকি মানুষ’ – এহেন অপপ্রচার ঠ্যাকানোই দুষ্কর হইয়া পড়িল। সচেতন পুরুষগণ নারীদের প্রথমে মিষ্ট কথায় ভুলাইবার ব্যপক তৎপরতা চালাইলেন। অতঃপর একসেট বাড়তি স্বর্ণ-রৌপ্যের অলঙ্কার উপঢৌকন দিলেন। কেহ কেহ অন্তঃপুরে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণের আধুনিক যন্ত্র বসাইলেন (সোনার অঙ্গের জন্য নহে, উত্তপ্ত নারী মস্তক ঠাণ্ডা করিবার প্রয়াসে)। বৈদ্যুতিক ব্যয় বাড়িলো বিস্তর, কথাও খরচ হইলো ঢের, কিন্তু ইহাতে তেমন সাড়া মিলিলো না।

কেহ কেহ অধুনা কেবল- নেটওয়ার্ক নাম্নী এক বস্তুর কল্যাণে ‘জি বাংলা’ ধরনের কিছু উদ্ভট বিষয়ের সংযোগ ঘটাইলেন। ইহাতে কিছু নারী ভুল বুঝিতে পারিয়া রাজপথ ত্যাজিয়া বাটি ফিরিলো এবং অন্তঃপুরে পুনরায় বসিয়া গেল। সাময়িক শান্তি ও সান্ত্বনা পাওয়া গেল বটে, কিন্তু সত্যিকার কলঙ্কিনীরা কিছুতেই আর বাটিতে ফিরিতে চাহে না। শত প্রহারেও তাহারা আর পূর্বাবস্থায় ফিরিতে চাহে না। চতুর্দিকে কেমন করিয়া জানি রটিয়া গেল নারীদের আর শৃঙ্খলে বাঁধিয়া রাখা যাইবে না। সমাজের পতন আর বুঝি রোধ করা গেল না।

আতংকিত হইয়া সমাজ রক্ষার তাগিদে জ্ঞানী-গুণীজন নতুন করিয়া নারীর সংজ্ঞা প্রদানে উঠিয়া-পড়িয়া লাগিলেন। পণ্ডিতগণ পুনরায় নারীভাবনা লইয়া পড়িলেন। অনেক বৈঠকের পর একমত হইয়া তাহারা বলিলেন,

যে সকল নারী বাটিতে বাস করে, পুরুষগণের সেবা করে, রন্ধন ও সূচিকর্মে পটু, সন্তানধারণ ও লালন-পালন করে এবং পুরুষের প্রতীক্ষায় বিরক্তিহীন প্রহর ধৈর্য্যের সহিত পার করে, তাহারা সতী নারী। সুরাসক্ত পুরুষ ও অতি সুরাপানে মত্ত পুরুষের প্রহারে পিঠ পেতে দেওয়া, বমন ইত্যাদি পরিষ্কারে নতজানু থাকা এবং অন্য নারীর প্রতি আসক্তিকে পুরুষের সাধারণ মানবাধিকার বলিয়া মানিয়া লওয়াই প্রকৃত ও উত্তম নারীধর্ম। সাত চড়েও এই সকল সতী নারীগণ রা করেন না। তাহারা উচ্চশিক্ষা নামক কোনরূপ কুশিক্ষার প্রতি উদগ্র আকর্ষণ বোধ করে না। বরং পুরুষকে সন্তুষ্ট রাখিবার পদ্ধতি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয়ত্ত করাই সতী নারীর একমাত্র ব্রত। ইহারা বাটির অভ্যন্তরে অন্তঃপুরে সুশীলারূপে বাস করে। কদাচ পুরুষের অনুমতি লইয়া বাটি হইতে বাহির হইলে একপ্রস্থ বৃহৎ বস্ত্রখণ্ডে নিজেকে আবৃত করিয়া লয়।

‘নারীগণ যে মানুষ’-এই তত্ত্ব যাহারা প্রচার করিতেছে তাহাদের জানিয়া রাখা ভালো যে, এই ধরনের নারীগণই প্রকৃত অর্থে মানুষ হইলেও হইতে পারে।

তাহারা আরও বলিলেন যে,-

যে সকল নারী অন্তঃপুরের সীমা অতিক্রমনান্তে উচ্চশিক্ষার নামে বাটি হইতে বাহির হইয়া পরপুরুষের পাশে উপবিষ্ট হইয়া বিষ্ঠাবৎ বিদ্যার্জনপূর্বক পুরুষ প্রকৃতিকে প্রতিযোগিতায় হারাইয়া দিয়া সমাজ ধ্বংসের অবতারণা করে, তাহারা ‘অসতী’ নারী। এই সকল নারী নতজানু হওয়া তো দূরের কথা, পুরুষের তর্জন-গর্জনেও বিহ্বলবোধ করে না। স্বার্থপরের মতো আপন অধিকার লইয়া ভাবে, পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার লইয়া তামাশাবোধ করে। সমাজকে থোড়াই পরোয়া করে, কতিপয় ক্ষেত্রে সমাজের নিয়ন্ত্রণ লইতে চায় বা লয়। সংসারের তেল-নুন-আদা-আটা-ময়দার হিসাব ছাড়িয়া এই সকল নারী জগৎ-সংসারের হিসাব গ্রহণের পটুত্ব অর্জন করিয়া থাকে। পুরুষের একাধিক নারী আসক্তিকে অনধিকার বলিয়া দাবি করে। সাত চড় তো দূরের কথা, সামান্য চক্ষু গরম করিলেই ইহারা পুরুষের চক্ষু উৎপাটনের হুমকি দেয়। আর যাহাই হউক ‘নারীরা মানুষ’-এ তত্ত্ব এই সকল নারীগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে।

অদ্যবধি মানবসভ্যতা স্বীকৃত ইহাই ছিল সর্বশেষ নারীভাবনা ও ইহা সম্পর্কিত তত্ত্ব।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.