মিডিয়া কাব্য: হয়রানির রকমফের-১

সাজেদা হক: তখন সাংবাদিকতা করছি প্রায় ৬/৭ বছর হবে। ন্যাশনাল ডেস্ক এর ইনচার্জ আমি। মাথার উপর নুরানি চেহারার বড় বড় ভাইরা সব। দেখলেই কদমবুচি করেন অনেকেই। এখনও। তো, একদিন একটা মেসেজ আসলো মোবাইল ফোনে। সবচেয়ে বড় যে জন, তার সামনে গিয়ে সেই ক্ষুদে বার্তাটি খুলে দেখালাম। দেখলেন। চুপ করে থাকলেন মিনিট পাঁচেক। আমার তখন গা কাঁপছে। ভয়ে নয়, রাগে।

অত:পর নীরবতা ভেঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, এই মেসেজের অন্য মানে হবে। আপনি যা ভাবছেন, তা না। তারপরও দেখেন আবারও দেয় কীনা! দিলে তখন ভাবা যাবে কী করা যায়?’

কিন্তু এই কথাটা শুধু দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। ছড়িয়ে পড়লো।

সাজেদা হক

ছড়িয়ে পড়তেই অবাক করার মতো ধাক্কা খেতে হলো আমাকেই। আমার নারী সহকর্মীদের নিয়ে পড়লাম মহা ফাঁপরে। তাদের মধ্যে স্টার রিপোর্টারদের অভিমত, আমার মতো কালো পেঁচাকে অমন (!) ধরনের এসএমএস রাজপুত্তর টাইপের স্টার সাংবাদিক দিতেই পারেন না! অফিসে তো তারাও আছেন! তাছাড়া তারা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত। তিনি এমনটা করতেই পারেন না। সুতরাং সাজেদা এটা বানিয়ে বলছে।

তাছাড়া, সাজেদা কে? রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে সাংবাদিক বানিয়েছে, তার আবার হ্যাডম! রীতিমতো বিস্মিত তারা, আমি কেন তাদের সহকর্মী? আমি নাকি ন্যাশনালটাও ইংরেজিতে বানান করতে পারবো না। একজন সহকর্মী হিসেবে তারা আমার পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ করেন।

বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মিটিংয়ে স্টার নারী সঞ্চালকের মূল দায়িত্বই ছিলো অন্য নারী সাংবাদিকদের একতা তৈরি করা এবং আমার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়া। সেই এসএমএস দেয়া পুরুষ সহকর্মীর পক্ষে দাঁড়ানোকে নৈতিক দায়িত্ব মনে করলেন। অথচ আমাকে একবারও জিজ্ঞ্যেস করা প্রয়োজন অনুভব করেননি ও ভীষণ সংবেদনশীল স্টার নারী সাংবাদিক ও সঞ্চালক।

সেখানেই কাজ করতেন আমার পুরোনো এক নারী সহকর্মীও। তার গলা সবচেয়ে বেশি জোরালো ছিলো। তিনি একধাপ এগিয়ে বললেন, ‘সাজেদার পুরনো অফিসে খোঁজ নিলেই সব জানা যাবে! এর আগেও হয়তো এমন আরও ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি’। সেই বহুল খ্যাতিসম্পন্ন নারী সাংবাদিকের সংসারেও নাকি ক্ষেত, গেঁয়ো, চাষা সাজেদার কারণেই মাঝে মাঝে আগুন লাগে। অথচ আমিই জানি না কিছু। আসলেই ক্ষেতই তো। শহরের হাওয়া লাগেইনি গায়ে। আজও না।

আর পুরুষ সহকর্মীদের কথা কী বলবো! তারা সবাই সামনে চুপ, আড়ালে মুখ টিপে হাসেন। যিনি এসএমএস দিয়েছেন, তিনি রুমে ঢুকলেই বলতেন, এই যে আপনার ….চলে এসেছেন। আমিও হাসতাম ওদের সাথে।

কিন্তু যিনি এসএমএস দিয়েছেন, তার আচরণ সবচেয়ে অবাক হওয়ার মতো। সেই এসএমএসের পর কোনো রিপ্লাই না পেয়ে এবার লেগে পড়লেন আমার কাজের ভুল ধরতে। পেলেনও। দিলেন লম্বা একটি শো’কজ লেটার। পাল্টা উত্তর আমিও দিলাম।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, নিউজরুমের সবাই একদিকে, আর আমি একা একদিকে। একদিন সেই নুরানি চেহারার বড় ভাই আবারও ডেকে বললেন, ‘এ্যাডজাস্ট করতে শেখেন সাজেদা। আপনাকে পছন্দ করি, কিন্তু এ্যাডজাস্ট করতে না শিখলে তো মিডিয়াতে টিকতে পারবেন না’!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.