ধর্মীয় পোশাক কি শুধুই নারীদের জন্য?

শাফিনেওয়াজ শিপু: আমাদের দেশে পারিবারিক  ও সামাজিক চাপ, বাবামায়ের ধর্ম-কর্ম পালন  ইত্যাদি অনেক  কারণে মেয়েরা  হিজাব পরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও  ধার্মিক পরিচয়  দেওয়ার জন্যও অনেকে  হিজাব পরে।

শাফিনেওয়াজ শিপু

আবার যারা মাদ্রাসায় পড়ে তাদেরকে রীতিমতো চাপই দেওয়া হয়  হিজাব পরার জন্য। বর্তমানে আমাদের দেশে অনেকে  অন্যের দেখাদেখি   স্টাইল হিসেবে হিজাব পরে। তবে আমরা দেখতে পাই যে, যারা ইচ্ছের বিরুদ্ধে অথবা অজ্ঞতাবশত অভিভাবকদের চাপাচাপিতে হিজাব পরিধান করে, তারা যখনই সুযোগ পায়, হিজাব খুলে ফেলে যেমন,  বাড়ি থেকে দূরে  যদি কোন বান্ধবীর বাসায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোনো বিয়ে বাড়িতে যায়, তখনই হিজাবের নিশানা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।   

আমার মতে, হিজাব বা বোরকা পরিধান করা এক ধরনের বৈষম্য ছাড়া কিছুই নয়, কারণ নারী যদি পুরুষের মতোই পূর্ণ মানুষ হয়, তবে পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নারীদের ওপর নিয়মনীতি প্রয়োগ করা হবে কেন?

পুরুষদের তো এরকম কোনো সীমানা নেই পোশাকের ক্ষেত্রে! ধর্মের রসটুকু নিচ্ছে পুরুষ, আর যতো নিয়ম-কানুনের ঘেরাটোপ সব নারীর জন্য। আর নারীরাও কী বোকা, কোনোরকম প্রশ্ন না করেই মেনেও নিচ্ছে তা। ফলে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে সমাজে, তা সহজে যাবে বলে বোধ হচ্ছে না।

আসলে ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সহাবস্থানের কারণে পুরুষদের হয়েছে পোয়াবারো।  আর নারীদের ওপর বাধ্যতামূলক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বাড়তি পোশাক থেকে শুরু করে তাবৎ নিয়ম-কানুন।

আমরা যতই মুখেই বলি আমাদের জাতি উন্নত হয়েছে এবং সেইসাথে মনমানসিকতারও পরিবর্তন হয়েছে, আদতে এগুলো সবই লোকদেখানো। রাজনৈতিক ক্ষমতার গদিতে নারী থাকলেই, নারীদের সমঅধিকার আর স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। যদি তাই হতো তাহলে এই যুগে এসেও কেন আমরা এখনো নারীদের শিকলে বেঁধে রাখি পোশাকের আড়ালে?

বলতে শুনি, পর্দা হচ্ছে নারীদের জন্য নিরাপদ, যদি তাই হতো তাহলে কেন এতো ধর্ষণ আমাদের দেশে? সেনানিবাসের সুরক্ষিত স্থানে হিজাব পরেও বাঁচতে পারলো না তনু। তার পর্দা তাকে রক্ষা করেনি হিংস্র থাবা থাকে।

ইসলামে বলা আছে যে, নারীদেরকে সম্মান করা উচিত এবং সেইসাথে এটি বলা আছে যে,  কোন পুরুষের চোখ যদি কোন নারীর সৌন্দর্য দর্শন করার অনুমতি পায় , তাহলে  একমাত্র নিজের স্ত্রীর ক্ষেত্রে হবে। সুতরাং কোনো পুরুষের জন্য নিজ স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন নারীর চেহারার সৌন্দর্য দেখা বা অন্য কোন নারীর দেহ আকৃতি অন্তরে অনুভব করা  হলে সেটি হারামবলে বিবেচিত হবে।

আদৌ কি আমাদের সমাজ এই নিয়মটি অনুসরণ করে? যদি তাই করতো তাহলে এতো ধর্ষণ ও ইভটিজিং হতো না।

পুরুষশাসিত সমাজ  হওয়াতে কেন নারীদের মধ্যে এতো কাপড়ের প্রভাব? কেন সেটা পুরুষদের মধ্যে নেই?  কারণ তাঁরা বিশ্বাস করে যে, মেয়েদের প্রয়োজনের অধিক কাপড়ে আবৃত করা মানে শুধু তাদের সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত করাই নয়, বরং তাদের সৌন্দর্য, কর্মদক্ষতাসহ সকল কিছুই অতিরিক্ত কাপড়ে আবৃত করে রাখা, যাতে নারীরা স্বাভাবিক চলাচল করতে না পারে।

আসল কথা হচ্ছে যে, নারীদেরকে ঢেকে রাখার বিষয়টি  নারীখেকো পুরুষ  ও মৌলবাদীদের দ্বারাই সৃষ্টিতারা তো শুধু নারীদেরকে ভোগের পণ্য ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। যার কারণে তারা নারীদেরকে বন্দী করে রাখে। আমাদের দেশে নারীশিক্ষার হার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, কিন্তু এই উন্নতিটাকে আমাদের সমাজ ও মৌলবাদীরা মেনে নিতে পারছে না। তাই তারা নারীদের দমাতে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটছে।

নারী এবং পুরুষ উভয়েই যদি বিধাতার সৃষ্টি হয়, আর পোশাক যখন মানুষেরই সৃষ্টি এবং মানব সভ্যতার অংশ, তবে তা পরিধানে কেন নারী এবং পুরুষদের জন্য ভিন্ন নিয়ম? নারীদের পূর্ণ অধিকার দেয়ার কথা বলা হলেও আসল চিত্র তো ভিন্ন। প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর দেবে কে? আবার সেই পুরুষ?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.