নারী স্বাধীনতা: শৈশব থেকে আমৃত্যু এক লড়াইয়ের নাম

ফারজানা নীলা: নারীবাদ নিয়ে পড়া, লেখা, মন্তব্য, বক্তব্য দেওয়া যত সোজা, বাস্তবে এর চর্চা ঠিক ততোটাই কঠিন। একটি স্বাধীন জীবন, যা প্রতিটা মানুষের জন্মগত অধিকার তা জন্মগত ভাবেই পুরুষরা পেয়ে যায়। আর নারীদের সেই শৈশবকাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত লড়াই করেই যেতে হয় একটি স্বাভাবিক স্বাধীন জীবনের জন্য।

যে বয়সে তাদের এক্কাদোক্কা খেলার কথা, মাঠে-খালে-পার্কে দাবড়িয়ে বেড়ানোর কথা, হাসি-খেলা-উল্লাসে নতুনকে আবিষ্কারের বয়সে কোন ছোট্ট পরীকে হয়তো কোনো শকুন ছিঁড়ে খায়। ক্ষত-বিক্ষত করে সদ্য মায়ের আঁচল ছাড়া শরীর। কত শত এমন সংবাদে আমাদের সকাল শুরু হয়। শুনে জেনে আমরা আমাদের ঘরের ছোট্ট মেয়েটাকে আরও ভেতরের রুমে চলে যেতে বলি।

আরও উদ্বিগ্ন হই তাঁর বাইরে থাকার সময়টাতে, হয়তো ভয়ের কবলে তার ছোট্ট গোলাপি ফ্রকের দিকেও নজর দেই। কিছুই উত্তেজনাকর নেই তার শরীরে, তবুও ভয়ে বুক কাঁপে, আরও কিছু কী পরাতে হবে, অথবা চাপাতে হবে তার কাপড়ের উপর? সেই ক্ষত-বিক্ষত শিশুর জায়গায় নিজের সন্তানের মুখ বসিয়ে অজানা ভয়ে শিউরে উঠতে হয়!

একটু যখন বেড়ে উঠে, শরীরে এদিক-ওদিকে কিছু নতুন ফুটে উঠে, শরীরের এই নতুনকে নিয়ে যখন সে উৎসুক, আনন্দিত, কিছুটা বিব্রত, ঠিক সেই সময় তাঁকে সহ্য করতে হয় জানা-অজানা মানুষের কুৎসিত মন্তব্য। তার বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে, তার অভ্যাসবশত দৌড়ানোর সময়, তার অভ্যাসবশত গায়ে ওড়না না দিয়ে বেরিয়ে আসার সময়, তার উচ্চস্বরে হাসার সময় তার দিকে ছুটে আসে এক ঝাঁক নোংরা কথার আবর্জনা। নিজ শরীরকেই তার ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে তখন। নিজের সৌন্দর্য্য তার কাছে হয়ে উঠে থকথকে পুঁজ। আবার কেউ কেউ পারে না এসব মানতে। হাল ছেড়ে দিয়ে আশ্রয় নেয় সিলিঙে ঝুলানো দড়ির কাছে। সদ্য কিশোরী রূপ নেয় সদ্য লাশে।

এরপর সে হয়ে উঠে তরুণী। সাহসী-চঞ্চল-ঝলমলে। স্বপ্ন চোখে সে উচ্চশিক্ষায় পা দিতে চায়। পথ কি তার ওই ছেলে বন্ধুদের মতো সরল? না গো, সেখানেও তাকে যুদ্ধ করতে হয় সকল কিছুর সাথে, সবার সাথে। পরিবার যেখানে তার ভাইকে বলে দ্রুত পড়ালেখা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, সেখানে তাকে বলে, “অনেক হয়েছে, এবার বিয়ের পিঁড়িতে বসো”। মান করে, রাগ করে, ঝগড়া করে ক্লান্ত হয়ে আবার হাল ধরে অবশেষে একটা সার্টিফিকেট নেয় তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। একটু মাথা তুলে, তার এখন একটা জায়গা আছে সমাজে। নিজের যোগ্যতায় সে কিছু আয় করতে পারে। এরপর অন্যের ঘরে যাওয়ার পালা। কারও সাথে ঘর করবে সে তো সুখের। কিন্তু সুখের পাশাপাশি চলতে থাকে কিছু গুঞ্জন। চাকরি ছাড়ো, বাচ্চা নাও, ঘরে মন দাও। বেচারি ঘরে মন দেয় ঠিকই, এটাই তো তার আপনজনের আবাস, তবুও তাকে প্রমাণ দিয়ে যেতে হয় অবিরাম। স্বামী আসেন ক্লান্ত হয়ে অফিস থেকে, টিভি আর চা তার সঙ্গী। মেয়েদের ক্লান্তি থাকতে নেই, তাকে এসেই ঢুকতে হয় হেঁসেলে। খাবার স্বাদও হতে হবে। নইলে কথা উঠবে, “শুধু চাকরি করলেই হয় না, রান্নাও জানতে হয়”।

হ্যাঁ, মেয়েদের চাকরি করলেই হয় না, ভাল পড়াশোনা জানলেই হয় না, মেধাবী- কর্মঠ-উদ্যমী-বুদ্ধিমান হলেই হয় না। তাকে জানতে হয় হলুদ-মরিচ-আদা-রসুনের হিসেবটাও। শুধু বসের কাছেই ভাল কর্মচারি হলেই হয় না, শ্বশুর বাড়ির সকলের মনও যোগাতে হবে। নইলে সে “আদর্শ” নারী নয়, “আদর্শ” স্ত্রী নয়, “আদর্শ” বউ নয়। এই আদর্শের পরীক্ষায় পাশ হতে না পারলে হয়তো অনেক সময় করুণ পরিণতিও হয়।

ফারজানা নীলা

যৌতুক নামে এক অভদ্র জিনিস আছে, যেটা বরপক্ষ খুব নির্লজ্জের মতো চেয়ে নেয়। দিতে না পারলে খুব ভদ্র পরিবার গঞ্জনার মধ্যেই রেখে দেয়, আবার কিছু আছে গায়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। খুব অশিক্ষিত পরিবারে হয় এগুলো, তাই না? কিন্তু বলী চড়ে তো ঐ মেয়েটির। অবস্থা সহ্য করতে না পেরে কেউ যদি ত্যাগ করে চলে আসে, তবে সেই মেয়েটির জীবনে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। চরিত্রহীনার অপবাদ, অন্য পুরুষ নিয়ে রসের গল্প, নানা গুঞ্জন নানা আলাপ নানা কানাকানি। একজন একাকি নারীর জীবন, জগত-সংসার সকলের আলোচ্য বিষয়। হিন্দি সিরিয়ালের চেয়েও জনপ্রিয়।

আপনারা যারা যেখানে-সেখানে নারীবাদী দাবি করেন নিজেদের, তাদের বলি, সেই শৈশব থেকে আজ অবধি মেয়েদের যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আপনারা কোনদিন কি তেমন কিছু অভিজ্ঞতা পেয়েছেন? সেই আপনারাই কিন্তু বুক ফুলিয়ে, মুখ বাঁকিয়ে বলেন, মেয়েদের স্বাধীনতার দরকার আছে, তবু তাদেরও উচিত রয়ে-সয়ে চলা।

আচ্ছা এই রয়ে-সয়ে চলা মানে কী? এই যে আপনাদের স্বজাতি ভাইয়েরা একজন শিশুর ওপর হামলে পড়ে, রাস্তা-ঘাটে মেয়ে দেখলে মুখে লালা ঝরায়, ঘরের বৌকে পুড়িয়ে মারে, শারীরিক-মানসিক অত্যাচারে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলে, আপনাদের ভয়েই মেয়েরা চলতে ফিরতে আতঙ্কের ভিতর দিয়ে যায়, তখন কী কেউ গিয়ে তাদের কানে কানে বলে আসতে পারেন না একটু রয়ে-সয়ে চলতে! শুধু আমরা নারীরা আমাদের জন্মগত অধিকার চাইলেই আপনাদের সীমানার কথা মনে পড়ে। যেখানে জন্ম থেকেই আমাদের সীমানার ভেতরেই রেখেছেন।

কী চাই? একটা ধর্ষণহীন, টিজিংহীন, প্রতিবন্ধকতাহীন, অপমানহীন স্বাভাবিক স্বাধীন জীবন।

হে পুরুষকুল, আপনাদের স্বাধীনতা আর আমাদের স্বাধীনতার মধ্যে অনেক ফারাক। আপনারা তা পেয়ে যান জন্মের পরই। আমাদের সেটা প্রতি পদক্ষেপে খুব সাবধানতার সাথে বুঝে-শুনে ফুঁ দিয়ে দিয়ে মেপে মেপে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অর্জন করতে হয়। আমৃত্যু আমাদের যুদ্ধ চলতেই থাকে। স্বাধীনতা তোমরা সোনার চামচে পেয়েছো, আমরা পাই উত্তপ্ত কয়লা ছেঁকে ছেঁকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.