পতাকার ছেলেটা নেই, শামীমা রয়ে গেল একা

সুপ্রীতি ধর: ঢাকায় আসার পথে হানিফ পরিবহনের বাস দুর্ঘটনায় দুজনের গুরুতর আহত হওয়ার খবরটি পেয়েছিলাম ফেসবুকের মাধ্যমেই। আমাদের মাঠে-ময়দানের লড়াই করা মানুষজনই খবরটি শেয়ার করেছিল। ওরা আপডেট দিচ্ছিল একটু পর পর। কোন হাসপাতাল থেকে কোন হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে, আইসিইউ খালি পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য সব খবরের মতো এটিও পড়েছিলাম।

আর দৃশ্যটা ভাবছিলাম, একদল ছেলেমেয়ে রক্তাক্ত দুটি প্রেমিক-প্রেমিকাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে ঢাকার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। কোথাও তাদের চিকিৎসা হয়নি সময়মতো। এর মধ্যে ছেলেটির অবস্থা ছিল করুণ। ওদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। মেলেনি। এ রাষ্ট্রে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নয়, শিক্ষাও নয়, বেঁচে থাকাও নয়।

জানি না তখন দুটি আহত মানুষের মনে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। জানা সম্ভবও না। আমি তো কখনও এই অবস্থার ভিতর দিয়ে যাইনি। পরে শুনি ছেলেটিকে অ্যাপোলোতে নেয়া হয়েছে। শুনেই বুকটা ধক করে উঠলো। এসব বড় বড় হাসপাতালের নাম শুনলেই কেন জানি চুপসে যাই আমি। কোনদিন এর চৌকাঠ মাড়াতে পারবো না জেনেই হয়তো। আমি তো চিনি না ফারজাতকে, জানি না তার আর্থিক সঙ্গতির কথা। খুব অসহায় মনে হলো সব-সবকিছুকেই। কীভাবে এতো টাকার জোগাড় হবে?

জীবন বাঁচানোই তখন মুখ্য। বন্ধুরা পণ করেছে, ওকে বাঁচাবেই। যতো টাকা লাগুক, মানুষের কাছে হাত পেতে নিয়ে আসবে। দু:সাহসী সব বন্ধুজন। কিন্তু কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা যে প্রাণ নিয়েও খেলে, এই সাধারণ বোধটা তখন বন্ধুদের মাথায় ছিল না একেবারেই। আর চিন্তার সময়ই বা ছিল নাকি! সব খেয়াল করছিলাম ফেসবুকে। একটু একটু করে চিকিৎসার আশংকা, টাকার আশংকার কথা আমিও বলার চেষ্টা করেছি। মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম কী করা যায় ভেবে।

একই সময়ে আমার মনের সবটুকু জুড়েছিল তখন প্রথম আলোর জিয়া (জিয়াউল ইসলাম, চিফ ফটো জার্নালিস্ট)। আমার, আমাদের ছোট ভাই, বন্ধু, সহকর্মি। দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করার মমতা থেকেই হোক, আর ওর সবসময় হাসিমাখা বিনয়ের কারণেই হোক, ওর প্রতি আমার অন্যরকম এক ভালোবাসা আছে। ওর অ্যাকসিডেন্ট তাই আমার মতো অনেকের জীবনই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা জিয়ার ফিরে আসার জন্য আমাদের আকুলতা আর সবকিছুকেই হার মানিয়ে দিয়েছে। বাকিটা ছেড়ে দিয়েছি ভাগ্যের হাতে। আর কীইবা করার আছে! এখন উন্নত চিকিৎসাই একমাত্র ভরসা। অন্তত আমার কাছে, কারণ আমি তো দোয়া বা প্রার্থনায় বিশ্বাসী মানুষ নই।

তবে এর মাঝেও শামীমা-ফারজাতের খবরটি কেন জানি আঁকড়ে ছিলাম। দুটি ছেলেমেয়ে। ফেসবুকে ওদের ওয়ালে গিয়ে প্রতিটি ছবি আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। একজনের হাতের মধ্য দিয়ে আরেকজনের হাত। অন্য একটা ছবিতে ফারজাত পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে বাতাসে। প্রচুর প্রাণপ্রাচুর্য্যে ভরা দুটি জীবন। কী হাসি, কী প্রাণচঞ্চল দুটি মানুষ। জীবনের পুরোটাই যাদের সামনে, কতো স্বপ্ন, কতো পাহাড় ডিঙোবার দুর্নিবার আকর্ষণ। ওরা ঘুরে বেড়াতো, ওরা মিছিলে যেতো, ওরা একসাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে সমাজ পরিবর্তনের স্লোগান দিতো। স্বপ্ন দেখতো ভরা দুটি চোখে। 

আমাদের ছোট কমরেড মাহমুদা বলছিল, ওদের ভালবাসা ছিল স্মরণ করার মতোন। ফারজাত তার সহজাত হাসি দিয়ে শামীমার সব রাগ-ক্ষোভ-অভিমান উড়িয়ে দিতো নিমিষেই। কিন্তু এখন যখন শামীমা প্রচণ্ড রকমের অভিমান নিয়ে একটা জীবন-সমুদ্র পাড়ি দিবে, তখন তার হাতটা তো আর ধরবে না ফারজাত। কেন ফারজাত? তোমাদের ভালবাসা তো কম ছিল না একজীবনে বেঁচে থাকার জন্য! তাহলে কেন ছেড়ে গেলে তুমি!

ফারজাত তো এখন অতীত আমাদের কাছে। তিনদিন বেঁচে (?) থেকে চলে গেছে ওপারে। জানি না সেই ওপারটা কেমন, কেনই বা এতো তাড়াহুড়া করলো যাওয়ার জন্য। বিশেষ করে শামীমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একা ফেলে। এতোটা স্বার্থপর কেন ফারজাত? কিন্তু শামীমা তো জানে না একথা। বিদায়েই প্রেম মহৎ, এতো হতে পারে না। ঘুম ভাঙলেই ও জানতে চাইছে ফারজাতের কথা, কেমন আছে সে, কথা বলছে কীনা! না, তাকে এসবের কিছুই বলা হয়নি। তাকে আরও ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কয়দিন? শারীরিক কষ্ট উপশমের পর এই মানসিক আঘাত সে নেবে কী করে? এইদেশে তো মানসিক চিকিৎসার কথা কম মানুষই ভাবে!

নেবে নাইবা কেন? নিতে বাধ্য, যেমন আমরাও বাধ্য সব মেনে নিতে। এই রাষ্ট্র খুনি রাষ্ট্র। সড়ক দুর্ঘটনার নামে প্রতিদিন কত প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে, কজনার খবর আমরা রাখি। যখন লেখাটি লিখছি, সেদিনও অনেকগুলো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে দেশে, অনেকগুলো মানুষ মারা গেছে। তারাও তো কেউ কেউ শামীমা, কেউ ফারজাতের ভূমিকায়।

মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়কে যখন কোপানো হয়েছিল তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ তো পাশেই ছিল, সেও আহত হয়েছিল ভয়াবহভাবে। তারপরও তার চেতনার সবটুকু জুড়েছিল অভি। বার বার সে জানতে চাইছিল অভি ঠিক আছে কীনা! কিন্তু অভি যে ঠিক ছিল না, এটা তাকে পরে জানানো হয়েছিল। সেই থেকে অসংখ্য মানসিক কাউন্সেলিং এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বন্যা। তারপরও কি পুরোপুরি ঠিক হয়েছেন? মনে হয় না। এসব ক্ষত কখনও সারবার নয় যে।

আজ শামীমার জায়গায় কেন জানি নিজেকে বসিয়ে দিয়ে ভাবছি। মনে পড়ছে বন্যার কথা, শৈলীর কথা, যার সজল হারিয়ে গেছে এভারেস্টে উঠতে গিয়ে। বন্যার লেখায় তার অভিকে যেমন অনুভব করি, চোখের জলে ভেসে বন্যার লেখা পড়ি, তেমনি ছোট বোন শৈলীর দীর্ঘশ্বাসও অনুভব করি, যখন সে প্রতি জন্মদিনে সজলকে উইশ করে। আমরা যারা জীবনের কোনো না কোনো বাঁকে স্বজন হারিয়েছি, বন্ধু হারিয়েছি, তারা জানি, হারানোর কষ্ট কতো সুদূরপ্রসারী, কতো শূন্যতায় ভরে দেয় জীবন। তবুও জীবন চলে।

শামীমাও একদিন ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ ঠিক হয়, আবার হয়ও না। আমরা পজিটিভটাই ধরে রাখি। এই শামীমা বা ফারজাত-দুজনের কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। কিন্তু ওদের পরিচিতরা আমার পরিচিত। তাছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন একটা কমন গ্রাউন্ড। ২৫/২৬ বছরের টগবগে যৌবনের তরুণ ফারজাত চলে গেছে। প্রথমে নিয়েছে তাকে হানিফ পরিবহন, পরে অ্যাপোলো হাসপাতাল। তিনদিন পর জানিয়েছে, ফারজাত আর নেই। কিন্তু তার লাশ ফুলে গেছে, তার মানে মানবিকতার পরিবর্তে লাশ নিয়ে ব্যবসা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লাখ লাখ টাকার মামলা, একদিকে প্রিয়জনের লাশ, অন্যদিকে রক্তাক্ত টাকা। একটা দুর্ঘটনা শুধু কতিপয় মানুষের জীবনকেই পঙ্গু করে না, পরিবারকেও পথে বসিয়ে দিয়ে যায় সারাজীবনের মতোন। আর এটা হতে দিয়েছে এই রাষ্ট্রই। সবচেয়ে বড় কালপ্রিট এই রাষ্ট্র, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ভরপুর, দুর্নীতিগ্রস্ত এই রাষ্ট্র। মানুষের মৌলিক সুবিধাগুলোই দেয়নি এই রাষ্ট্র, বরং কেড়ে নিচ্ছে আমাদের একে একে সবাইকে। কাউকে শারীরিকভাবে মারছে, কাউকে মানসিকভাবে।

যদি বলি রাষ্ট্র মেরে ফেলেছে ফারজাতকে, খুব বেশি কি বলা হবে? কতোটা অসহায় আমরা। এই আমরাই দেশে যখন যে নির্যাতিত হচেছ, অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু ফারজাতকে ফেরাতে পারলাম না। অর্থলিপ্সু ক্ষমতাবানদের কাছে আমাদের মানবতাবোধ নস্যি। 

এর আগেও আমরা তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর আন্দোলনে নেমেছিলাম। ফল হয়নি কিছুই। নৌমন্ত্রী যখন বাস শ্রমিকদেরও নেতা, তখন আন্দোলন আর এগোয় না। আমাদেরই কেউ কেউ পরবর্তিতে সেই নৌমন্ত্রীর সাথেই হাত মিলিয়েছিল।

তারপর দেখেছি শাহবাগ আন্দোলন। চোখের সামনে বিশাল মহীরুহকে আগাছায় পরিণত হতে দেখেছি। তাই এখন আমি আর আন্দোলনেও বিশ্বাসী নই। চোখের সামনে সব আন্দোলন বিক্রি হয়ে যেতে দেখেছি। বেহাত হতে দেখেছি। 

এখন তাই কেবল চলে যেতে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই আমাদের। থেকে থেকে মনটা কেবলই কেঁদে উঠছে শামীমার জন্য, ফারজাতের জন্য। এমন নিষ্পাপ মুখ ফারজাতের, সে কী করে শামীমাকে ভাল না বেসে থাকবে কোন পারে?

আর শামীমা, তোমার বন্ধুরা কতোরকম সতর্কতা নিচ্ছে, শেষ রক্ষা হবে কীনা জানি না। কিন্তু এই যে শূন্যতা, এটা কাটিয়ে উঠবার পথ তো জানা নেই আমার। আমি যে কেবল বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেই জানি। কিছু করতে না পারার ব্যর্থতায় এই গভীর রাতে হাঁসফাঁস করছি আমি। তোমার জন্য আজ সারাদিন ধরে কাঁদছি আমি, কাঁদছে তোমার বন্ধুরা।

তুমি আবার বাঁচো শামীমা, আবার পাহাড়ে যেও, তুমিই পতাকাটা উড়িও, ঠিক যেভাবে ফারজাত উড়িয়েছিল।

ফড়িং ক্যামেলিয়ার একটা লাইন খুব দাগ কাটলো মনে। তোমাকেও বলে যাই শামীমা, “হৃদয় ভাঙার কষ্টটা মৃত্যু থেকেও যন্ত্রণার। কাউকে হারাবার চেয়ে একলা হবার যন্ত্রণাটা অনেক বেশি। একলা থাকার ভয় না থাকলে হৃদয় ভাঙার কষ্টটা এতো তীব্র হতো না”। হবে হয়তো। তোমারও হৃদয় ভাঙবে, এ থেকে মুক্তির পথ আমার জানা নেই। তারপরও বলি, ফারজাতশূন্য জীবনে একটু একটু করে ফিরে এসো তুমি। 

শেয়ার করুন:
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.