বুক নয়, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন

ভিকারুন নিসা: ওড়না, নারীর শরীর নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে ফেসবুক,অনলাইন পত্রিকায়। এসব পড়তে পড়তে কৈশোরে আমার ওড়না পরার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লো।

তখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি। বয়স বারো, কী তেরো। মাঠে পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে দারিয়া-বান্ধা, বুড়ি-ছি ইত্যাদি খেলি, গাছে উঠি, মাটিতে গর্ত করে ছোট্ট পুকুরে বাসা থেকে চুরি করা জীবন্ত মাছ ছাড়ি। দূরন্ত কৈশোর। সে সময়ও নারী-পুরুষের শরীরের পার্থক্য বুঝি না, বিভেদ বুঝি না।। কিন্তু একদিন বাসায় আম্মা একটি ওড়না এনে ধরিয়ে দিলেন।

বললেন-

-নে এখন থেকে এটা পরবি। বেশ গম্ভীর চেহারা আম্মার।

ভিকারুন নিসা

আমি প্রতিবাদ করলাম। বললাম -না আমি এটা পরবো না। কেন এটা পরবো? কান্না কান্না কন্ঠে, ভীষণ মিন মিনে গলায় আমি প্রশ্ন করলাম।

– এটা মেয়েদের পরতে হয়। ওড়না না পরলে আশে-পাশের মানুষ খারাপ বলবে।

– না আমি এটি চাই না। গলায় কষ্টরা আটকে গেল চোরা কাঁটার মতো।

আম্মা ততোধিক গম্ভীর হয়ে জোর করে আমার গলায় সেই ওড়নাটা পরিয়ে দিলেন। সেদিন প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে অনাকাংখিত কাপড়টি গলায় জড়াতে বাধ্য হলাম। সেদিন জানলাম, আমার শরীরের বুকের অংশটি আমার জন্য ভীষণ লজ্জার একটি বিষয়। শুধু তাই নয়, আমার নিজের শরীর লজ্জা এবং জড়তার সংস্কৃতিতে ঢেকে রাখতে হবে, কারণ একজন নারী হিসেবে এটাই আমার দায়িত্ব।

সবচেয়ে বড় কথা, সমাজ তো আমাকে এভাবেই দেখতে পছন্দ করে। তাই শরীর ঢেকে রাখাই হচ্ছে আমার জন্য উত্তম। যত দিন যেতে লাগলো, ততই মনে হতে লাগলো আমারের শরীরটা কিছু লোলুপ পুরুষের কুৎসিত দৃষ্টি থেকে আড়াল রাখা ভীষণ প্রয়োজন। না হলে সমূহ বিপদ।

সত্যি বলতে কী-সব সময় শরীরটাকে নিয়ে বিব্রত জীবনই কাটিয়ে দিলাম। কিছু কিছু আগ্রাসি, ক্ষুধার্ত পুরুষ কখনো দূর থেকে চোখ দিয়ে নোংরা দৃষ্টিতে চেয়েছে, কখনো সুযোগ পেলেই অশ্লীল হাতে স্পর্শ করেছে ,জঘন্য মন্তব্য করেছে। সে সময় যে চরম অস্বস্তি, জড়তা, লজ্জা, এবং অপমানিত বোধ করেছি, তা কোনো পুরুষকে কখনো বলতে পারিনি। শরীরটাকে সব সময়ই ঢাকতে গিয়ে এই অতিরিক্ত কাপড়গুলোকে  উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি কখনো। সারাক্ষণ নিজের শরীরটাকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে, বিব্রত হয়ে, লজ্জিত হয়েই জীবনের বেশীরভাগ সময়টা কাটিয়ে দিয়েছি।

এখনো, আমাদের দেশের মতো পশ্চাৎপদ সমাজেই শরীর নিয়ে বিব্রত হওয়া স্বাভাবিক মনে হয়, যদিও আমরা বাস করছি ২০১৭ সালে। শালীনতা, সংস্কৃতি, ধর্মের নামে নারীর শরীর (sexualise) যৌনতার আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখছে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। পোশাকের উপরে অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে মাথার চুল, শরীর ঢেকে রাখা শুধু আমাদের নারীদের দাায়িত্ব।  

পুরুষের যৌন লালসা নিবৃত্ত করাও নারীদেরই কর্তব্য। কারণ লোভী নেকড়ে পুরুষের চোখ যাবে শরীরের বিশেষ বিশেষ স্থানে। তা থেকে নিজেকে রক্ষা করার শিক্ষাটা আমরা ছোটবেলাতে মা বা বড় বোনদের কাছ থেকে পাই। আর ছেলেরা শিক্ষা পায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে, নারীর শরীরের অংশগুলো ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে।

অথচ আধুনিক বাইরের দুনিয়ায় নারীরা এখন মঙ্গলগ্রহে গিয়ে থাকার জন্য তাদের শরীর-মন তৈরি করছে। তারা তাদের শরীর নিয়ে বিব্রত নয়। কারণ তারা তাদের শরীরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তারা পরিবার, স্কুল থেকে শিখে আসছে শরীর নিয়ে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। এটা শুধুমাত্রই শরীর। এটাকে যৌনপিণ্ড মনে না করাটাই সমীচীন। তারা মনে করে, আমার পোশাক আমি নির্ধারণ করবো। এটা আমার শরীরের অধিকার। তাতে কেউ চাপিয়ে দিতে পারবে না অন্যের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ। তাই শরীর নিয়ে লজ্জা নয়, শরীরের অধিকার সম্পর্কে তারা জানে এবং শ্রদ্ধা করতে শিখে, সেটা নারী-কিংবা পুরুষ যার শরীরই হোক না কেন।

পাশ্চাত্যে ড্রেসকোড আছে কর্মক্ষেত্রের জন্য। যখন সবাই অফিসে যায়, আনুষ্ঠানিক পোশাক পরবে, যা তাদের চোখে শালীন,এবং ভদ্রস্থ। নারীরা কর্মক্ষেত্রে শার্ট,প্যান্ট,কিংবা স্কার্ট পরে, আর বিচে গেলে বিকিনি,এটাই স্বাভাবিক তাদের কাছে। পরিবেশ-পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে একজন মানুষ কী পোশাক পরবে। সবচেয়ে বড় কথা, কোন পোশাক পরে একজন মানুষ সাচ্ছন্দ্যবোধ করে সেটাই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই অংশ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই এই শিক্ষা ব্যবস্থা নারীদের ওড়নায় বুক লুকিয়ে, মাথার চুল ঢেকে জড়সরো হয়ে নিজেকে একজন যৌনপুত্তলি হিসেবে তৈরি করার শিক্ষা দেয়।  আমাদের পরিবার, কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিন্তু ছেলেদের শেখানো হয় না, মেয়েদের শরীর আর ছেলেদের শরীর, কেবলমাত্র শরীরই। অঙ্গ। এটাকে আলাদা করে সেক্সচুয়ালাইজ করাটা সঠিক নয়।

আমার কাছে তাই মনে হয়, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক এবং অনগ্রসর শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে দরকার আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে ওড়নায় শরীর লুকিয়ে না রেখে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা দানটা জরুরি। যেখানে বয়ো:সন্ধিকালে ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে পারবে মানব শরীর সম্পর্কে। শরীর সম্পর্কে অতিরিক্ত কৌতুহল মানুষের মনে তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক বিকৃতি। তাই নারী-পুরুষ শরীর, শারীরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। ফলে অনাকাঙ্খিত যৌনতা বোধ না নিয়ে, শরীর সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ নিয়েই বড় হবে পুরুষেরা। নারী শরীরকে সেক্সসুয়ালাইজ না করে, স্বাভাবিক মানব শরীর মনে করবে তারা। তারা শিখবে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, এটাই শালীনতা, এটাই ভদ্রতা, এবং আমাদের সংস্কৃতি হওয়া উচিত।

অশালীন দৃষ্টিতে না তাকিয়ে, ভদ্র দৃষ্টিতে চোখে চোখ রেখে কথা বলবে নারী-পুরুষ সবাই। পুরুষেরা সবাই সম্মানজনক মনোভাব নিয়েই ঘরের বাইরে অন্য নারীর সাথে আচরণ করবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.