গণপরিবহনে নারী: প্রতিদিনের আতংক

0

ইশরাত জাহান ঊর্মি: মেয়েটির পোশাক আমাকে আকৃষ্ট করে। কালো রঙ-এর সিল্ক শাড়ি পরেছেন। ব্লাউজের রূপালি পাথর আর কানে রূপোর ঝুমকো। টেনে বাঁধা চুল। মহাখালি রেলগেটে একটা হিউম্যান হলারে উঠতে গিয়ে পারলেন না। আমি তার কাছে যাই।

জানতে চাই, প্রতিদিন এভাবে য্তায়াত করেন? আমার হাতে বুম আর সাথে ক্যামেরা। মেয়েটা বিব্রত হয়। সে এড়িয়ে গিয়ে বলে, না না, আমি আসলে লোকাল বাসে উঠি না, আমি যে বাসে উঠি, সেখানে কোন সমস্যা হয় না। আমি বুঝতে পারি, তিনি কিছু বলতে চান না।

তাছাড়া মোটামুটি সুশ্রী-সুবেশী একজন নারীর সামনে মাইক্রোফোন ধরেছি, এতোক্ষণ বিভিন্ন গাড়িতে উঠা পুরুষরাও সব ব্যস্ততা ভুলে হা করে মেয়েটিকে দেখছে। ফলে আর কোনো কথা হয় না।
আরেকজন নারীও ঠিক একইভাবে হিউম্যান হলারে উঠতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। আমি তার কাছে যাই এবং একইভাবে জানতে চাই, গণপরিবহনে  নারীর হেনস্থা হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। তিনিও একইভাবে জানান যে, কোন অসুবিধাই হয় না। সুশ্রী হাসিমুখ নারীটি।

আমি একটু বিস্মিত হই। তবে যে পাবলিক বাসে মেয়েদের হ্যারেসড হওয়ার এতো এতো ঘটনা শুনি! একই জায়গায় অনেকক্ষণ ক্যামেরা আর বুম নিয়ে ঘুরাঘুরি করতে দেখে থামিয়ে রাখা হিউম্যান হলার এর চালক এগিয়ে আসে।

তার কাছে তখন জানতে চাই,
” ভাই, মেয়েদের নানান ধরনের সমস্যার মুখে যে পড়তে হয়…
কথা শেষ করার আগেই লোকটি বলতে থাকেন…
: আপা কথা সত্য। আপনি শিক্ষিত মানুষ, কী বলবো! অনেক ঘটনাই ঘটে। গায়ে-টায়ে হাত দ্যায়। অনেক মহিলারাও ধরেন যে মান-সম্মানের ভয়ে কিছু বলে না।
আমি বলি,
: মান-সম্মানের ভয়টা কী ভাই? কার মান-সম্মানের ভয়? লোকটা সম্ভবত আমার প্রশ্ন বুঝতে পারেন না।
যাই হোক, আমি ফার্মগেটে আসি। কারওয়ান বাজার, শাহবাগ আর প্রেসক্লাব যাই, যেসব জায়গা থেকে ধাক্কাধাক্কি করে মেয়েরা ওঠে পাবলিক পরিবহনে প্রতিদিন।

এমনিতে তাকালে এই মুখগুলো অচেনা লাগে আমার কাছে। মহাখালি রেলগেটের দুজন নারীর মতো নয়, এদের নব্বই ভাগের মাথা-মুখ ঢাকা হিজাব নামে একটা বস্ত্রখণ্ড দিয়ে। চট করে মনেই হয় না যে এরা আমার স্বগোত্রীয়। বা এটা ঠিক বাংলাদেশ বা রাজধানী ঢাকা তা-ও মনে হয় না।

মনে হয়, এদের মাঝে আমি যেন কোন আগন্তুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি এই শহরেই। এই শহরের ভিড়ের বাসেই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠেছি। পত্রিকায় কনট্রিবিউশনের কাজ করেছি, ঢাকার আনাচে-কানাচে গিয়েছি, পুরুষের চোখের লোলুপ জিহ্বা সহ্য করেছি, তবে তা অসহনীয় মাত্রার কিছু ছিল না।

তবে কী এখন এমনকিছু পাল্টে গেছে, যাতে মেয়েদের এরকম আগাগোড়া প্যাকেট হতে হচ্ছে?
ফার্মগেটে আমি পেয়ে যাই দুই নারীকে। একজন ৩০/৩৫, আরেকজন ২৫/২৬। দুজনই বাসে ওঠার অপেক্ষায়। প্রথমজনের চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি-রাগ। বললেন, এইটা তো বিগ প্রবলেম। প্রত্যেকদিন সকালবেলা আতংক নিয়ে বের হই, কী জানি কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়!
আমি বলি, হ্যারেসড হলে প্রতিবাদ করেন? বা প্রতিবাদ করলে উল্টো কোন সমস্যার মুখে পড়েন?
মুখের রেখা একটুও না কাঁপিয়ে, আমার মতো নারীবাদী নয়, অথচ নারীটি খুব শান্তস্বরে বলেন,
: তা তো হতেই হয়। বাসগুলোও তো পুরুষেরই। তো একজন পুরুষের অসভ্যতার প্রতিবাদ করলে তারা উল্টো তেড়ে আসবে, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?
ইন্টারভিউ শেষ হয়। আমার কানে বাজতে থাকে, বাসগুলোও তো পুরুষদেরই…
আর দ্বিতীয় নারীটি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে তার একটা এক্সপেরিয়েন্সের কথা বললেন।

: কদিন আগেও বনানীতে একটা মধ্যবয়স্ক লোক একটা মেয়েকে আন-অ্যাপ্রোপ্রিয়েটলি টাচ করছে, পরে মেয়েটা প্রতিবাদ করায় বাসের পুরুষরা একাট্টা হয়ে এমন সব কথা মেয়েটাকে বলতে শুরু করলো, মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে মাঝপথে নেমে গেল। আর আমরা মেয়েরা চুপ করে ছিলাম। কেন চুপ করে ছিলাম জানি না!
মহাখালিতে দুই নারীর গণপরিবহনে কোন সমস্যা হয় না বলার কারণটা বুঝতে পারলাম। প্রতিবাদ করলে কাঁদতে কাঁদতে নেমে যেতে হবে।

রিপোর্ট প্রচারের পর মেকাপ রুমের রহিমা প্রায় কান্না অবরুদ্ধ কণ্ঠে অনেকগুলো ঘটনা বললো। প্রয়োজন না থাকলেও শরীরের কোন কোন জায়গায় হাত দিয়ে হেলপাররা বাসে উঠায়, উঠার পর ভিড়ের বাসে পুরুষরা কোন কোন জায়গা দিয়ে চেপে ধরে এইসব।

বললো, বাসে কিছু বলাই যায় না আপা, সবাই খা খা করে ওঠে। আর ‘বেশি কথা কইলে লেডিস তুলুম না’ একথা তো নিয়মিতই শুনতে হয়।    
আমি ভাবি, প্রতিদিন মেয়েগুলো এইসব পার হয়ে অফিসে যায়। কাজের জায়গায় যায়। তাদের পরফরমেন্সও পুরুষদের সাথেই মাপাঝোকা হয়। তারা কতোটা কাজে মনোযোগী অথবা অমনোযোগী সেসবের খতিয়ান হয়।

বিকৃতকাম, অবসেসড পুরুষদের এই শহরে নারীরা এভাবেই বাঁচে প্রতিদিন। এবং তারপরও তাদের যৌন সহিংসতা নিয়ে কথা বললে গালি খেতে হয় নারীদের। না কোনো কর্তৃপক্ষের দায় পড়েনি এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর। মেয়েদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে, পড়াশোনার হার বেড়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে কর্তৃপক্ষ আর দেশের “মালিক”রা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন দিবসে দিবসে।
তবে কি কিছুই করার নেই? নারীদের কেউ কেউ দাবি তুললেন আলাদা বাসের। কিন্তু একজন বললেন জরুরি কথাটা। না আলাদা বাস, আলাদা আসন এইসব কোনো সমাধান নয়। এইসব আদারিং এ কোন লাভ নেই ইন দ্য লং রান।

সমাধান হলো, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো। মেয়েদেরকে দেখলেই হাতানোর বস্তু, যৌনবস্তু মনে করলে এই সমস্যার সমাধান কোনদিনই হবে না।

না, সব পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি একসাথে, একবারে পাল্টে যাবে, তা না, পৃথিবীর কোথায়ই বা পাল্টায়! কিন্তু পাল্টানোর চেষ্টাটা তো শুরু করা উচিত!
আর মেয়েরা? একটা মেয়ের হ্যারেসমেন্ট দেখে চুপ করে থাকবেন না। যে মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে নেমে গেল, তাকে থামান। এবং তার পাশে দাঁড়ান। “মান-সম্মান” নামে বায়বীয় জিনিসটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্লিজ সমস্বরে প্রতিবাদটা করেন। আমি আপাতত আর তো কোন উপায় দেখি না!

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.