উইচ হান্টিং এর শিকার হবে না তো নারীবাদ!

0

বৈশালী রহমান: বন্ধু নাজিয়া (Kazi Nazia Mustary)র সাথে প্রায়ই বিভিন্ন ব্যাপারে আলাপ আলোচনা হয়। গতকাল আলাপচারিতার এক পর্যায়ে সে একটা আশঙ্কা প্রকাশ করলো। সেটা হচ্ছে, ষোল শতকের উইচহান্টিং কি নতুন চেহারায় ফিরবে? যদি ফেরে, তবে এই উইচহান্টিং বা “ডাইনি শিকার” এর বলি হবে কারা?

আসুন, ব্যাপারটা একটু পর্যালোচনা করা যাক।

উইচ হান্টিংবলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা হচ্ছে, মধ্যযুগে ইউরোপে কিছু নির্দোষ মানুষকে ধর্মীয় গুরু বা সমাজের কিছু মানুষ “ডাইনি” উপাধি দিতেন। এই মানুষগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিলেন নিরীহ এবং এদের ৭০ শতাংশের বেশিই ছিলেন নারী। অধিকাংশ সময়েই এদের পরিণতি হতো ভয়াবহ। ধর্মীয় গুরুরা যাদের ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করতেন তাদের আগুনে পুড়িয়ে বা বিভিন্ন নৃশংস শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে হত্যা করা হতো। এভাবে নিরীহ কিছু মানুষকে খুঁজে খুঁজে বের করে ডাইনি বা “উইচ” বলে অভিযুক্ত করে হত্যা করাকেই বলা হয় উইচ হান্টিং।

আপনারা নিশ্চয় “জোয়ান অব আর্কের” জীবনী পড়েছেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া এই অসমসাহসী ফ্রেন্চ তরুণীকেও ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এই “উইচ হান্টিং” ব্যাপারটা মূলত শুরু হয় ১৪৮৪ খ্রিস্টাব্দে পোপ ইনোসেন্ট ৮ এর একটি বই প্রকাশের মাধ্যমে। বইটির নাম ছিল “Malleus Maleficarum” বা “The hammer of witches”. এই বইতে শুধুমাত্র ডাইনি সম্পর্কিত লোককাহিনী এবং মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ডাইনি সম্পর্কিত কিছু তথ্যপ্রমাণ এবং আধ্যাত্মিক বিতর্কের ওপর ভিত্তি করে কিভাবে ডাইনি চিহ্নিত এবং বিলুপ্ত করা যায় সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছিল। এই বইটিতে উল্লেখিত নিয়মকানুন অনুসারে বিভিন্ন মানুষকে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই।

এ প্রসঙ্গে “Hexen and Hexenprozesse (Witches and Witches Trial” নামক বইতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত হলে তার বিচার করা হতো শুধুমাত্র অভিযুক্তের মুখ থেকে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, কোনো শক্ত প্রমাণ দরকার হতো না।

আরো উল্লেখ্য যে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হতো অভিযুক্তের ওপর নানারকম অত্যাচার নির্যাতন করার মাধ্যমে।
“হ্যামার অব উইচেস” বইটির মাধ্যমেই মূলত উইচ হান্টিং নামক নৃশংস প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। আরো ইন্ধন জোগায় মিডিয়া, নানারকম প্রপাগান্ডা প্রচারের মাধ্যমে। প্রিন্টিং মিডিয়ার মাধ্যমে একসময় এই প্রক্রিয়াটি আটলান্টিক হয়ে আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। একে একে বলি হতে থাকে নিরপরাধ মানুষ, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী।

বিশেষত বিধবা এবং অসহায় নারী এবং যেসব নারী ভেষজ চিকিৎসা করতেন, তারাই ছিলেন উইচ হান্টিং এর মূল ভিক্টিম। ধনী দরিদ্র, নারী পুরুষ নির্বিশেষে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। যারা এসব মানুষকে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করতো, তারা মূলত দুটো কাজ করতো।

১. নিরীহ মানুষের ওপর কাল্পনিক হিংস্রতা আরোপ করা, যেমন, শরীরের সামান্য কোনো তিল বা চিহ্নকে শয়তানের চিহ্ন বলে প্রচার করা, নিরীহ মানুষটার সামান্য কোনো ভুল বা অস্বাভাবিক আচরণকে অলৌকিক বা ভৌতিক আচরণ বলে গুজব ছড়ানো। ২. নিরীহ নিরপরাধ মানুষজনকে সাধারণ মানুষের সামনে হিংস্র প্রাণী হিসেবে উপস্থাপন করে “মব সাইকোলজি” এর অপব্যবহার করা। যার ফলে সাধারণ মানুষই এসব নিরপরাধ মানুষকে ডাইনি বা সমাজের জন্য ক্ষতিকর ভেবে তাদের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠতো।
এখন আসি বর্তমান সময়ের “উইচহান্টিং” এর কথায়। আমি দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করছি কিছু মানুষ নারীবাদীদের সম্পর্কে নানারকম প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা যে “অস্ত্র”টাকে ব্যবহার করছে সেটা হচ্ছে “মানবতাবাদ”।

নারী পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ এবং সেই কারণে “মানবতাবাদ” নিজেদের মধ্যে ধারণ করি। নারীবাদও কিন্তু মানবতাবাদের কথাই বলে। কিন্তু বহু হাজার বছর ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি যে দমন পীড়ন চলছে, সে জায়গা থেকে যদি নারীর উত্তরণ ঘটাতে হয়, তবে সবার আগে নারী পুরুষের এই বৈষম্য দূরীকরণ প্রয়োজন। নারীবাদ যুগে যুগে এই বৈষম্য দূরীকরণের কথাই বলেছে। নারী পুরুষের অধিকার ও মর্যাদার সমতার কথাই বলেছে। সে হিসেবে নারীবাদ মানবতাবাদেরই পরিপূরক।

কিন্তু বর্তমান যুগের “উইচ হান্টার”রা ঠিক আগের যুগের ধর্মগুরু ও সমাজপতিদের মতোই নারীবাদকে ক্রমশই মানবতাবাদের বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছে, কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়াই, শুধু নিজস্ব কিছু ভাবনা বা কোয়ালিটেটিভ জাজমেন্টের ভিত্তিতেই। ষোড়শ শতকের ইউরোপের ধর্মগুরুদের মতোই তারা খুঁজে খুঁজে ফেমিনিস্টদের দোষ ত্রুটি বের করছে, তাদের নারী অধিকার শীর্ষক আন্দোলনকে “কিটিবাদ” বলে তুচ্ছ করছে।

নারীবাদীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে এই বলে যে তারা পুরুষকে দমন করে নারীতন্ত্র চালু করতে চায় এবং “ডাইনি” উপাধির মতোই কৌশলে তারা নারীবাদীদের “পুরুষবিদ্বেষী” বলে অভিযুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা খুব সুকৌশলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভাবনা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে যে নারীবাদ সমাজ এবং পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর এই ভাবনা ছড়ানোর মাধ্যমেই তারা খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে “মব সাইকোলজি” কে ব্যবহার করছে, যাতে করে নারীবাদীদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে হিংস্র করে তোলা যায়।

সাধারণ জনগণই তখন যেন নারীবাদীদের “উইচ হান্টিং” এর মতো “উপযুক্ত শিক্ষা” দিতে কোমর বেঁধে প্রস্তুত হয়। ফেমিনিস্টদের হিটলারের নাজি বাহিনীর সাথে তুলনা করে “ফেমিনাজি” বলে চালানোর মাধ্যমে নারীবাদীদের উপর কাল্পনিক হিংস্রতা আরোপ করা এই প্রক্রিয়ার একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ।
অতএব, একবিংশ শতাব্দীর “উইচ হান্টিং” এর শিকার কি ফেমিনিস্টরা হতে যাচ্ছে? বিচারের ভার আপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৪৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.