শিশু যৌন নির্যাতন: বিহাইন্ড দ্য স্টোরি

0

বৈশালী রহমান: প্রথমেই একটা বাস্তব ঘটনা দিয়ে শুরু করি। একটা মেয়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সে বিড়ালের বাচ্চা খুব পছন্দ করতো। একদিন সে মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলছিল। মাঠের পাশেই ছিল একটা গ্যারেজ। খেলতে খেলতে সে গ্যারেজের কাছে গেলে পরিচিত এক “কাকু” তাকে বলে, আমার সাথে এসো, তোমাকে বিড়ালের বাচ্চা দেবো একটা। মেয়েটা সরল বিশ্বাসে লোকটার সাথে গ্যারেজের ভেতরে যায়। সেই “কাকু” বাচ্চাটার বুকে এবং যৌনাঙ্গে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করে। মেয়েটা ব্যথা পায়, চিৎকার করে, সেই চিৎকারে তার এক বন্ধু ছুটে আসে। মেয়েটা বেঁচে যায়। যদি সেদিন বন্ধু ছুটে না আসতো, মেয়েটার ভাগ্যে যে কী হতো কেউ জানে না। মেয়েটা আজও বিড়াল দেখলে ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। এটা সে বিভিন্নভাবে গোপন করতে চেষ্টা করে। বিড়াল ভয় পায় শুনলে লোকে বলবে কী!

এই তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বাচ্চা মেয়েটার শরীরে কোনো “যৌন আবেদন” ছিল না। তাহলে কী সে কারণ যার জন্য সেই “কাকু” তার শরীর আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করেছিল? কী সে কারণ যার জন্য ছেলে বাচ্চারাও ধর্ষিত হয় পূর্ণবয়স্ক নারী এবং বালিকাদের পাশাপাশি? কী সে কারণ যার জন্য পতিতালয়ে গিয়েও বাচ্চা মেয়ে খোঁজে কিছু বিকৃতমনস্ক? আসুন, ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা করি।

একটা মানুষ (পড়ুন দানব) বিভিন্ন কারণে চাইল্ড এবিউজার এবং পিডোফাইল হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানীর বিভিন্ন মতামত রয়েছে। আমি শুধু একটা বিশেষ দিকের প্রতিই আলোকপাত করবো।

Kamphuis, De Ruiter, Janssen and Spiering ২০০৫ সালে চাইল্ড এবিউজারদের মানসিকতার উপর চমৎকার একটি গবেষণা চালান। তারা চাইল্ড এবিউজের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কিছু “পাওয়ার” বা ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত শব্দের রেসপন্সে কিছু বলতে বলেন, এবং কিছু “সেক্স” সম্পর্কিত শব্দের রেসপন্স করতে বলেন। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, তাঁরা “নন-সেক্সুয়াল” অপরাধী যেমন চোর, ডাকাত ইত্যাদি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তুলনায় “পাওয়ার” বা ক্ষমতা” সম্পর্কিত শব্দের দ্রুত রেসপন্স করছে।

এই স্টাডির উপরে বিভিন্ন টেকনিক প্রয়োগ এবং টেস্ট অব হাইপোথিসিস করে দেখেন যে চাইল্ড এবিউজাররা মূলত যৌনতাকে ক্ষমতার সাথে রিলেট করে। সোজা কথায় বলতে গেলে তারা মনে করে কারো যৌনতার ক্ষেত্রে জোর করা, কারো অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার গায়ে হাত দেওয়া এবং তাকে জোরপূর্বক যৌন সমর্পণে বাধ্য করা, এটার মধ্যে তারা ক্ষমতা প্রয়োগের সুখ খুঁজে পায়। কী, আমাদের দেশের বহুল প্রচলিত “প্রথম রাতেই বিড়াল মারা” বা কোনো মেয়েকে “সাইজ” করার জন্য তাকে “খেয়ে দেওয়া” বা কোনো মেয়েকে ধর্ষণ করার পর বন্ধু-বান্ধবের ধর্ষণকারীকে “আসল পুরুষ” বলে বাহবা দেওয়া এর সাথে কোথায় যেন মিল পাওয়া যাচ্ছে না?

Thijs Kanters এবং অন্যরা এই রিসার্চকে সমর্থন করেছেন তাঁদের গবেষণাপত্রে। সেই সাথে তাঁরা আরো যুক্ত করেছেন যে যারা পিডোফাইল এবং চাইল্ড এবিউজার, তারা যে শুধু শিশু পেলেই ধর্ষণ করবে তা না, তারা পূর্ণবয়স্ক নারীকেও সুযোগ পেলে ধর্ষণ করবে। এমনকি শিশু বা অল্পবয়স্ক ছেলে পেলেও। কারণ তাদের কাছে যৌনতা কোনো বিষয় না। তারা যে বিষয়টার প্রতি আকৃষ্ট হয় সেটা হলো সাবমিসিভনেস অর্থাৎ কারো ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করা। সোজা কথায় ধর্ষণের সময় তারা কার যৌন আবেদন বেশি কার কম এইটা বিবেচনা করে না। তারা বিবেচনা করে কাকে তারা সহজে তাদের “ক্ষমতার” কাছে পরাভূত করতে পারবে। একই সাথে তারা ভীতু। তাই তারা বেশিরভাগ সময় “সহজ শিকার” বা শিশুকে বেছে নেয়। এই যে ৩৫ বছরের বুড়া ধামড়া লোক বিয়ের জন্য ১৭-১৮ বছরের মেয়ে খুঁজে, এর পিছনেও এই মনোভাবই কাজ করে। বাল্যবিবাহ যারা সমর্থন করে, পুরুষ হোক বা নারী, তারা সবাই এই মানসিকতার সমর্থক। তারা সবাই এটাই মনে করে যে নারীমাত্রেরই উচিত যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষের ইচ্ছার বশীভূত হওয়া। এ কারণেই তারা ভাবে অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েরা খুব সহজেই আত্মসমর্পণ করতে পারে। এবং পুরুষেও তাদের “ক্ষমতার” চর্চাটা ভালোমতোই করতে পারে। এককথায়, যে মূহুর্তে আপনি বাল্য বিবাহ সমর্থন করছেন, ঠিক সেই মূহুর্তে আপনি শিশু যৌন নির্যাতনও সমর্থন করছেন। সেটা জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারে।

মোদ্দা কথা, যতোদিন সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মনের মধ্যে (নারী মলেস্টেটরের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য পুরুষদের তুলনায়, তাই এ আলোচনায় আনছি না, তবে তাদের ক্ষেত্রেও মানসিকতাটা “ক্ষমতা” থেকেই আসে) এই মনোভাব থাকবে যে শুধুমাত্র “পুরুষ” হিসেবে জন্মগ্রহণ করার কারণে পুরুষেরা সুপিরিয়র, যতোদিন পর্যন্ত তারা এটা মনে করবে যে যৌনতা ব্যাপারটা পুরুষের “ক্ষমতা” চর্চার জায়গা মাত্র, যতোদিন পর্যন্ত তারা যৌনতাকে নারীর “আত্মসমর্পণ” বা একতরফাভাবে “নারীর দেহভোগ” হিসেবে ভাববে, ততোদিন পর্যন্ত নারী ধর্ষণ এবং শিশু ধর্ষণ চলতেই থাকবে। যতোই মেয়েরা শরীর ঢেকে রাখুক না কেন, এমনকি বস্তা পরেই চলুক না কেন, ধর্ষণ, শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধ হবে না। “মেয়েরা “শালীন” ভাবে চললে পুরুষরা সংযত থাকবে এইসব …ল ছাল মতবাদ কিছু লিঙ্গসর্বস্ব আবর্জনার মস্তিস্কপ্রসূত বর্জ্য পদার্থ মাত্র। রিসার্চ দ্বারা সমর্থিত নয়।

পরিবারের মেয়েদের উপর সান্ধ্য আইন জারি, স্তরের পর স্তর পোশাক চাপিয়ে, তিন চার বছরের বাচ্চা মেয়ের উপরও হিজাব চাপিয়ে তো বহু বছর ধরে আমরা একেবারে গুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলেছি। এবার পরিবারের ছেলেগুলোকেও শেখাই তারা যেন ছেলে হয়ে জন্মেছে বলেই নিজেকে সুপিরিয়র, মেয়েদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, মেয়েদের হর্তাকর্তা এইসব না ভাবে। “ক্ষমতা” “পুরুষত্ব” যেন যৌনতার বদলে মেধা, যোগ্যতা, জ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করে। “পুরুষ” হওয়ার আগে যেন “মানুষ” হয়। একটা মেয়ে খোলামেলা পোশাক পরে চললেই বা রাতবিরাতে রাস্তায় বের হলেই তাকে নিয়ে যা খুশি বলা যায়, যা ইচ্ছা করা যায় এই মনোভাব যেন তারা না রাখে। ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য দ্বিতীয়টাই জরুরি। প্রথমটা নয়।

পোস্টের প্রথমে যে মেয়েটার কথা বলা হয়েছে সে আর কেউ নয়। আমি নিজে। আমার পরিণতি পূজার মতো হতে পারতো। পৃথিবীর যে কোনো বাচ্চার পরিণতি, যে কোনো মেয়ের পরিণতি যে কোনো সময় পূজার মতো হতে পারে। অতএব, জাগুন, সমস্যার আগা ধরে টানাটানি না করে গোড়াটাই কেটে দিন।

লেখাটি ১,৬৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.