ক্ষমা চাইতে হবে আহমদ শফীকে

nipa
লুতফুন নাহার লতা

লুতফুন নাহার লতা: সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মহড়ায় একটি মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া সংগঠনের সংযোজন হয়েছে, তার নাম ‘হেফাজতে ইসলাম ।’ ধরে নেয়া হয়, বিএনপি’র মতই এটিও জামাতেরই একটি বর্ধিত অংশ ।

স্পেশাল ট্রাইবুনালে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার যথেষ্ট সাক্ষী প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তা না হয়ে যাবজ্জীবন সাজা হলে জনগণ তা কিছুতেই মেনে নেয় না । এসময় অনলাইন ব্লগার যারা দীর্ঘদিন ধরে সাইবার জগতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনার পক্ষে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে কাজ করে যাচ্ছিলেন তদের ডাকে সারা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ এক হয়ে ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে ঢাকার শাহবাগে সূচিত হয় এক অভুতপূর্ব শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর থেকেই জামাত-শিবির দেশের অগণিত হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির আগুন বা গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেবার পর এই সময় আবার শুরু করে তাদের সেই চিরাচরিত হত্যাযজ্ঞ! চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে, জবাই করে মানুষ হত্যা করতে থাকে ! ব্লগার রাজিব, দীপসহ বহু লোক তাদের হাতে জীবন দেয় ! জামাত কোটি কোটি টাকা টোপ দিয়ে কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামকে তাদের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে ! এই হেফাজতে ইসলামের প্রধান সাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী’ র সাম্প্রতিক একটি ওয়াজ বা বক্তৃতা নিয়েই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা!
ফেসবুকে আল্লামা শফির এই ওয়াজের বয়ান শুনবার পরে স্তব্ধ হয়ে গেলাম ! এই একবিংশ শতকে এসে এই হেন কুৎসিত ভাষায় নারী বিদ্বেষের এই পংকিল রূপ দেখতে হবে তা কল্পনাতেও আসেনি ! যা শুনলাম তার কন্ঠে তাতে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না ! কিছু লিখব যে সেও কেমন অরুচিকর মনে হল ! একধরনের বিবমিষা অনুভব করছি !

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী , যেদেশের স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সংসদ নেত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী সহ অসংখ্য মন্ত্রী সাংসদ ও দেশ নেত্রীবৃন্দরা অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রগতিশীল নারী, সে দেশের জন্য এই হেন অশিক্ষিত একজন আল্লামার এই ধৃষ্টতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেছে সাইবার জগতের প্রতিটি বাঙালী !
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে তিনি ইতোপুর্বেই ধর্মের উপরে সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ১৩ দফার নামে দেশ, সংবিধান ও নারী উন্নয়নের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন।

তিনি এই ওয়াজ মাহফিলের নামেও প্রচার করেন নারী বিদ্বেষ। এখানে তিনি নারীদের বিরুদ্ধে অশ্লীল ও ন্যাক্কারজনক মন্তব্য করতেও দ্বিধা বোধ করেননি !
এই বক্তৃতায় তিনি যা বলেন, তার সার সংক্ষেপ হল, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী উলঙ্গ চলাচল করে ও ছেলেদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে যা খুবই খারাপ। মেয়েদেরকে বলেছেন, তারা যেনো মার্কেটে এ না যায়, স্বামী ও ছেলেকে অর্ডার করতে বলেছেন তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করার জন্য । নারী কে বলেছেন, তাদের কাজ হল স্বামীর আসবাবপত্র হেফাজত করা ও পুত্র সন্তানকে লালন পালন করা।

মেয়েদের গার্মেন্টসে কাজের ব্যাপারে তিনি অকথ্য অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে বলেন, গার্মেন্টসে মেয়েরা অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘুরাফেরা করে আর তারা জ্বেনার মধ্যে মুফতালা করছে, জ্বেনা করে করে টাকা অর্জন করছে ‘ অর্থাৎ মেয়েরা গার্মেন্টসে গিয়ে জ্বেনা করে অর্থ উপার্জন করে। এর পরিস্কার অর্থ করলে দাঁড়ায় নারীরা দেহপসারিণী বা বেশ্যা ।

তিনি তার বক্তব্যের মাঝে মাঝেই কোরানের আয়াত থেকে পাঠ করেন, সে সকল আয়াতের কিয়দংশ তিনি পাঠ করেন, বলাই বাহুল্য যে সেসব আয়াতের সত্যিকার অর্থ কি তিনি তা খুলে বলেননি । নারী শিক্ষার ব্যাপারে তিনি বলেন, মেয়েদের বেশী লেখাপড়া করা ভাল নয় , কেবল মাত্র স্বামীর টাকা গোনা বা হিসাব নিকাশ করতে পারলেই চলবে এবং এর জন্য ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া করাতে হবে, তার বেশী নয় । এই মহিলারা যদি স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়ে তবে তারা, বাবা মার কথা না শুনে নিজের পছন্দ মত লাভ ম্যারেজ, বা কোর্ট ম্যারেজ করে চলে যাবে ।

তিনি নারীর মোবাইল ফোন ব্যবহারের পক্ষপাতী নন, তিনি মনে করেন মেয়েরা মোবাইল ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করে ছেলেদের সাথে কথা বলে, যা কিনা মোটেই ভাল নয় , তার ভাষ্য মতে, মেয়েরা তেঁতুলের মত (৩ বার ), কখনো কখনো তেঁতুলের থেকেও বেশী খারাপ! তাদের দেখলে ছেলেদের মুখ থেকে লালা বের হয় , ছেলেদের দিলের মধ্যে লালা বের হয় এবং যাকেই তারা দেখে তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছা হয়, লাভ ম্যারেজ করতে ইচ্ছা হয় ! মেয়েরা বাইশ তাল জানে তারা পুরুষ কে জ্বেনা করতে বাধ্য করে , তাই পুরুষ তা সে যতই বুজুর্গ হোক না কেন, মহিলাদের কে দেখলেই তাদের মনের জ্বেনা , দিলের জ্বেনা শুরু হয় ! এদের সাথে লেখাপড়া করা , রাস্তা-ঘাটে হাঁটা-চলা করা যাবে না । আর যদি কোন পুরুষের মনে কোন খারাপ চিন্তা না আসে তাহলে ঐ পুরুষ একেবারেই সুস্থ পুরুষ নয়, ধরে নিতে হবে যে তার একটি বিশেষ বিমার আছে, বলে তিনি উল্লেখ করেন !

বিয়ের পাত্রী হিসেবে দরকার মেয়ে নামাজ ও কোরান পড়তে পারে কিনা এটুকুই ! এ ছাড়াও মেয়ের মা ও নানীকে দেখতে হবে এবং যে মেয়ের পুত্র সন্তান বেশী হবে তাকে বিয়ে করতে হবে, পুত্র সন্তান কম হবার কারণ হিসেবে তিনি নারীদেরকেই দায়ী করেন এবং বলেন, স্কুল-কলেজে গেলে মেয়েরা ছেলেদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে বলে তারা আর পুত্রবতী হতে পারে না ! পুত্র সন্তান কম হলে বা একেবারেই না হলে পুরুষ একে একে চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে পারবে !

এর পর তিনি অতি অশ্লীল ভাষায় বর্ণনা করেন বার্থ কন্ট্রোল পদ্ধতি সমূহ যা মানুষ ব্যবহার করলে বড় গুনা ( তিন বার ) যদি অন্ধ , লেংড়া , ছেলে জন্ম নেয় বা অসুস্থ সন্তানের জন্ম হয় তবে আবার সুস্থ পুত্র সন্তান জন্ম দিতে হবে ! এবং ‘ হে জোয়ান– যুবক– যুবতী’ বলে বলে জোরে জোরে ডাকতে থাকেন এবং এদের যৌবনকাল এবাদত তেলায়াতে কাটাতে হবে বলেন !
ভিডিওটি দেখার পরে অসম্ভব ঘৃণায় আর ভয়ংকর দ্রোহে ফেটে পড়তে চাইল মন। সেলুকাস! সত্যি কি বিচিত্র আমার দেশ !
অবাস্তব , সভ্যতাহীন বর্বর এক মনোজগতে বাস করেন এই ৯৩ বছরের বৃদ্ধ আল্লামা শাহ আহমেদ শফি । পৃথিবীর যেকোনো দেশ হলেই এই ধরনের কথার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হত আদালতের কাছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করার দায়ে, মানুষকে ভুল বলার দায়ে, এবং নারী-পুরুষ উভয়কে অবমাননার দায়ে, এবং কোর্ট সিদ্ধান্ত নিত বিচারের আগে তার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন কিনা ! ভাবতে লজ্জা হচ্ছে তিনি বীরপ্রসু চট্টলার বিপ্লবী সূর্যসেন আর প্রীতিলতার প্রত্যয়ী মাটিতে জন্মেছেন !

ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডে পুত্র সন্তান জন্ম না দিতে পারায় রানীকে টাওয়ার অব লন্ডনে বন্দী ও পরে হত্যা করা হয়েছিল শুনেছি। শুনেছি ‘অনেক অনেক বছর আগের কথা তখন আরবের লোকেরা আল্লাহকে ভুলিয়া গিয়াছিল ‘ সে সময় কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হত । কিন্তু আজ এই প্রায় চারশ বছরের বিবর্তন শেষে তিনি কি আবার নারী জাতিকে সেই অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছেন না !
তিনি প্রকৃত ইসলামের শত্রু ! তিনি শান্তির ধর্ম ইসলামে যেখানে নারীকে দেয়া হয়েছে সম্মান তার বিরোধিতাকারী ! কোন দুঃসাহসে তিনি নারীকে অপমান করছেন ! কোন শক্তিতে তিনি নারীর সকল কর্মকাণ্ডকে হেয় আর কলংকিত করে দেখছেন ! কোন ঔদ্ধত্য তাকে আল্লাহর রসুলের বানী থেকে মিথ্যা ভাষণ দিতে উদ্বুদ্ধ করছে ! সকল নারীর পক্ষ থেকে আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই ! আমি অচিরেই তার মুখ থেকে সকল নারীর প্রতি ক্ষমা প্রার্থনা শুনতে চাই !!!

শেয়ার করুন:
  • 180
  •  
  •  
  •  
  •  
    180
    Shares

Shafi’s religious knowledge about Islam is questionable. If
the Lord of the Universe sees no difference between man and woman, who is he to
talk about the rights of Muslim women? The funniest part of his speech was women should restrict their education to madrasa and Quran where he himself lacks proper knowledge of the Holy Book.

Ms. Lata you could also bolster your argument by quoting ayats from
Quran pertaining to men and women and their rights to silent him and his uneducated followers.

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.