নিজের কাছাটা আগে সামলান পীর সাহেব!

0

শারমিন জান্নাত ভুট্টো: শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে যা যা ভুল হয়েছে আর আপত্তিকর, তা ইতিমধ্যে সবারই জানা। নতুন কাহিনী হচ্ছে, ভুল-ভ্রান্তি ধরিয়ে দিয়ে যত ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাকে “নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম ওরফে চরমোনাই পীর।

শুধু তাই নয়, নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শ রুখতে রাস্তায় নেমে আসারও হুংকার দিয়েছেন এ পীর সাহেব। শুনে বেশ ভালো লাগলো। যাক অবশেষে লোকটা, মঞ্চের কেদারা ছেড়ে নিচে নামতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মঞ্চে তার আশেপাশে ও পায়ের সামনে যতই বয়ষ্ক আর বৃদ্ধ লোক থাকুক না কেনো, পীর সাহেব তাতে দৃষ্টিপাত না করে চেয়ারে বসেই তার ওয়াজ শেষ করেন।

সে যাক গে, দীর্ঘসময় বক্তব্য রাখতে গেলে হয়তো চেয়ারের দরকার হতে পারে। তবে লোকটার একটা গুণে আমি বেশ মুগ্ধ। আর তা হলো, যেভাবে তিনি ওয়াজ মাহফিলে প্রতিটি শব্দ বলার সময় ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠেন কোন ধরনের চোখের জল ব্যয় না করে, তা এক কথায় অসাধারণ। এই পীরকে অস্কার দেয়ার দাবি জানালাম তার প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলের সুনিপুণ অভিনয় দেখে।

এবার আসি আসল পয়েন্ট ভুল-ভ্রান্তিতে। পীর সাহেবের একটা ওয়াজ দেখলাম ও শুনলাম ইউটিউবের কল্যাণে। যেখানে এই পীর বলছেন, তার বাবা মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ ইসহাক ও ভাই মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ ফজলুল করীম নাকি বড় বড় জাহাজে চেপে কেয়ামতের দিন জান্নাতের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবেন, তবে তারা নাকি তাদের মুরিদদের না নিয়ে কখনোই জান্নাতে যাবেন না। বাহ, চমৎকার…….তাই নাকি? এত্তোবড় ব্রেকিং নিউজ পীর সাহেব আপনি পেয়ে গেলেন, তো ভাই আপনার সোর্স একদম খাঁটি তো, শিওর তো আপনি? এখন মুরিদদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার যে টেন্ডার পীর সাহেব পেলেন, তা অন্য কোন দলকে না দিয়ে সৃষ্টিকর্তা কেনো শুধু তাদেরকেই দিলেন, এ প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করবো যদি কোন সময় পীর সাহেবকে সামনে পাই।

পীর সাহেব জান্নাতের আদম ব্যাপারি হয়ে এই যে মুরিদের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন আর মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন তার কী হবে! চরমোনাই পীর যেভাবে ভুল তথ্য দিচ্ছেন আর প্রতারণা করছেন তার কী হবে? অবশ্য মুরিদদের সাথে এভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েই তো পীর সাহেবরা তাদের ধর্ম-ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন সেই আদিকাল থেকে আর এর বদৌলতে ভালোই মালপানি কামাচ্ছেন।

শিশুদের বইয়ে অ- তে অজ (ছাগল) লেখা ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ছাগল গাছে ওঠে আম খাচ্ছে। এই লাইনের সাথে অবশ্য পীর সাহেবের মুরিদদের বেশ মিল পাওয়া যায়। কারণ তারা তাদের পীরের নির্দেশে সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার আশায় যিকির করতে করতে বাঁশে চড়া শুরু করে। ওড়না নিয়ে আপত্তি তোলায় সবাইকে নাস্তিক উপাধি খুব সহজেই দিয়ে দিলেন চরমোনাই পীর। কিন্তু তাকে এই ছাগল নিয়ে তেমন কিছু বলতে শোনা যায়নি। বোধহয় ছাগলের গাছে উঠে আম খাওয়ার সাথে তিনি একমত।

তিনি তো তার আরেক ওয়াজ মাহফিলে বলেছেন, এক রাখাল নাকি আল্লাহকে ছাগলের দুধ খাওয়াবেন আর সুরমা লাগিয়ে দেবেন। এখন পীর সাহেব এই যে ডাঁহা ডাঁহা মিথ্যা কথা আর ভ্রান্ত ধারণা সহজ-সরল মানুষদের মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত ঢোকাচ্ছেন, তার কারণে তো আপনার বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষজন রাস্তায় নেমে যেতে পারে।

চরমোনাই পীর তার কিতাবে যেভাবে ভুল তথ্য দিয়ে দাবি করেছেন যে তাদের হুজুরের হুকুমে নাকি মৃত মানুষও জীবিত হয়ে উঠে, সেখানে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকের এসব ছোটখাটো ভুল তো পীরের চোখে আটকানোরই কথা না।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম নিয়ে এতো অনুভূতিপ্রবণ অথচ একজন পীর দিনের পর দিন নিজেকে নবীর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বানিয়ে যাচ্ছেন, আর পবিত্রগ্রন্থের কথা পরিবর্তন করে নিজের মনগড়া কাহিনী তার মুরিদদের শুনিয়ে যাচ্ছেন রূপকথার গল্পের মতোন, অথচ সেটা নিয়ে কেউ প্রতিবাদও করছে না, কিংবা মুখও খুলছে না।

অবশ্য এর পেছনে কারণও রয়েছে। ধর্ম, ধর্মীয় নেতা কিংবা দল এদের নিয়ে কেউ প্রতিবাদ জানালেই তার গায়ে খুব সহজেই নাস্তিকের তকমা লাগানো হয়। আর তারপর সময়-সুযোগ বুঝে কেড়ে নেয়া হয় প্রাণ। সেইসাথে ধর্মের দোহাই দিয়ে মাইক দিয়ে ছড়ানো হয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ।

খুব বেশি দূরে নয় সেইদিন, যেদিন এসব ভণ্ড পীরের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর জনকণ্ঠ সোচ্চার হয়ে উঠবে। যেমনটি হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে। আর ধর্মকে ঢাল-তলোয়ার বানানোর কৌশলও হয়তো ভেস্তে যাবে একদিন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৭৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.