৯২ ভাগের দেশে আমরা কোন্ ছার!

0

সুমাইয়া নাসরিন সুমু: ও-তে ওড়না, হুমায়ুন আজাদ স্যারের কবিতা বাদ দেয়া, ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ গড়া’, কুসুম কুমারী দাশের কবিতা পরিবর্তন করার মতোন স্পর্ধা দেখানো সবকিছুই এতো অসহায় করে দিচ্ছিলো যে, কিছু বলতে ইচ্ছা করছিলো না।

বলে কী হবে? কে শুনবে, কী পরিবর্তন হবে? তর্ক করার জন্য অনেকে হাজির হয়ে যাবে, বোঝার মতো কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত এই দেশ ‘বিরানব্বই ভাগ’ মুসলমানেরই শুধু। আমরা কেউ না, কিছু না।

কিন্তু ‘বাংলাদেশের হৃদয়’ কবিতাটা বাদ দিয়েছে শুনে বুকের মধ্যে কোথায় যেন ধাক্কা লাগলো। কাউকে বলার জন্য না, বুঝানোর জন্য না, স্বগতোক্তির মতো লিখছি। এই গানটা যতবার শুনি, আমার চোখে জল আসে। ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’র থেকেও ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’র আবেদন আজীবন আমার কাছে বেশী মনে হয়েছে !

রূপক অর্থে লেখা একটা কবিতা দেবী দুর্গার সাথে সাদৃশ্য আছে দাবী করে বাদ দেয়া হচ্ছে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে এসে ! এই মাটিতে একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচেছিলেন, এই মাটিতেই একদিন রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন! যেই সাম্প্রদায়িক বিভাজন আমার সত্ত্বা থেকে রবীন্দ্রনাথকে বিচ্ছিন্ন করে, যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আমাকে বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, জীবনানন্দ দাশকে ‘পরদেশী’ ভাবতে বাধ্য করে, যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আমার কাছ থেকে শান্তিনিকেতন কেড়ে নিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে কফিহাউজ আর বসন্ত কেবিন, কেড়ে নিয়েছে জোড়াসাঁকো আর ডুয়ার্স, কেড়ে নিয়েছে সেই ট্রামলাইন যেখানে আত্মহত্যা করেছিলেন জীবনানন্দ সেই বিভাজন, সেই সাম্প্রদায়িকতাকে আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি আজীবন।

আমার দুর্ভাগ্য আমি এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ক্ষমতাধর সাম্প্রদায়িক শক্তি রবীন্দ্রনাথকে একটু একটু করে মুছে ফেলছে বাঙালির মানস থেকে , যেখানে লিঙ্গ বৈষম্য ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে ঠিক মতো কথা না বলতে শেখা শিশুর মগজে-মননে , যেখানে ‘ শতকরা বিরানব্বই ভাগ মুসলিম’ বসবাস করে বলে প্রতিনিয়ত মুর্তি ভাঙা হচ্ছে , প্রতিমা ভাঙা হচ্ছে , ভাঙা হচ্ছে ভাস্কর্য। আমার বড় দুর্ভাগ্য আমি এমন যুগে এই মাটিতে বাস করছি যখন পনেরো বছরের বাচ্চা মেয়েকে বিবাহ প্রথায় বলি দেয়া যায় আইননানুগভাবেই।

আমার দুর্ভাগ্য আমি বেঁচে আছি এমন এক সময়ে যখন আবার হিন্দু লেখকেরা নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছেন একটু একটু করে। খুবই সুচারুভাবে, সুচতুর ধুর্ততায় একটা কবিতা কিংবা একটা গল্প হয়ে তারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছেন মোল্লাদের দাড়ির নড়াচড়ার সাথে সাথে। আমার কিংবা আমাদের কিছু করবার ক্ষমতা নেই! আমার দুর্ভাগ্য হিংস্র সাম্প্রদায়িক ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আমার একটা ফেসবুক পোস্ট দেয়া ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। কিছুতেই কিছু যায় আসে না আসলেই! কিছুতেই না, কিছুতেই না।

লেখাটি ৭০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.