ফেমিনিজমের বাস্তবিক চর্চা সত্যিই কঠিন

0

সাদিয়া নাসরিন: জেন্ডার সমতার লড়াইটা আক্ষরিক অর্থেই কঠিন লড়াই। ‘সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করো’- কথাটা বলতে যতো সহজ, করাটা ঠিক ততোটাই কঠিন। বিশেষ করে যে মা-বাবা নিজেরা সন্তানকে সমতার শিক্ষা দিতে চান, তাঁদের জন্য তো এটা প্রতি মুহুর্তের চ্যালেঞ্জ। আমি যা বললাম নিজে তা চর্চা করছি কিনা তা সন্তানরা খেয়াল রাখে। কথা আর কাজে অমিল দেখলেই ওরা চ্যালেঞ্জ করে।

ঘটনা -১: একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবো। নিজে সাজগোজ করলাম। ভারী শাড়ী, গয়না, সব পরলাম। মেয়েকে বললাম, একটু সাজো, একটা ছোট চেইন হলেও পরো। একটু হালকা লিপস্টিক দাও। মেয়ে রাজি না হলে জোর করেই পরালাম। ছেলে সব খেয়াল করলো। কিছুক্ষণ পর এসে বললো, মা, আমাকেও একটা চেইন দাও, পরি। আমাকেও একটু সাজতে দাও। আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি চেইন পরবে? সে নির্বিকারভাবে বলল, হ্যাঁ পরবো। আমি বলে ফেললাম, ছেলেরা কি চেইন পরে?

আর যাই কোথায়!! ভাই-বোন একসাথে তেড়ে আসলো, এ-ই তোমার জেন্ডার এডুকেশন, মা? মেয়ে হলে সাজবে, ছেলে হলে সাজবে না, এই কথা তুমি বলছো, মা? এরপর গাড়িতে যেতে যেতে দুজনেরই প্রশ্ন, “তুমিই তো বলো, সাজগোজ, গয়না এসব একটা মানুষকে আড়াল করে রাখে, ছেলে আর মেয়ে বানিয়ে রাখে। কিন্তু তুমি কেন এতো গয়না পরেছো? তুমি কেন বাইরে যাবার সময় সাজো? বাবা কেন সাজে না?

ঘটনা -২: মেয়ে চুল কাটবে। ওকে বললাম চুল ছোট করে ফেল। ও রাজী হয় না। একদিন মেয়েকে আর ছেলেকে একসাথে বসিয়ে বোঝালাম আমাদের সমাজ একটা মানুষকে ছেলে বা মেয়ে বানিয়ে ফেলার জন্য চুলকে কীভাবে ব্যবহার করেছে। লম্বা চুলের মেয়েদের ‘ভালো মেয়ে’ বলে, আবার সেই লম্বা চুল রাখলেই ছেলেদের ‘খারাপ’ বলে, কেন তাও বুঝিয়ে বললাম। লম্বা চুলের সাথে মেয়েদের সুন্দর, কোমল, মায়াময় হিসেবে বেঁধে রাখে এবং লম্বা চুলের যত্ন নিতে যে সময় নষ্ট হয় সেটিও যুক্তি দিয়ে বোঝালাম। ওরা জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তুমি কেন চুল কাটো না? আমি উত্তর দিলাম, কারণ আমি ভয় পাই। আমি তো তোমাদের মতো মা পাইনি। কেউ আমাকে এভাবে বুঝিয়ে বলেনি, সেই সাহসও দেয়নি।

কিছুদিন পর মেয়ে এসে বললো, “চলো পার্লারে যাই, চুল ছোট করবো”। আমি সাথে সাথে ওকে নিয়ে বেরুলাম। যখনই ওর চুলে কাঁচি চলতে শুরু করলো এবং নিচে পড়তে থাকলো, আমি দেখলাম আমার মেয়েটা কষ্টে ভেঙে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। সেই কষ্ট আমার বুকে বাজতে শুনলাম। তখন আমি ওর হাত ধরে পাশে দাঁড়ালাম, যেভাবে ওর দাঁত ফেলার সময় ধরে থাকতাম। আমি বুঝলাম আমার ছোট্ট মেয়েটা একলা লড়াই করছে।

হঠাৎ কী হলো, আমি গিয়ে একটা নতুন স্লিপ কেটে পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম। সার্ভিস প্রোভাইডারকে বললাম আমাকে ঠিক ওর মতো ছোট করে চুল কেটে দিন। এটা শোনার সাথে সাথেই আমার মেয়েটার সারা মুখ আলোয় ভরে গেল। আমার গোছা গোছা চুল মাটিতে পড়তে লাগলো। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার নারীময়তা, কমনীয়তা, সৌন্দর্য, কোমলতা সব নিচে পড়ে থাকছে। আমি বুঝতে পারলাম “নারী সুন্দর কেশে, পুরুষ সুন্দর বেশে “এই শিক্ষা থেকে মুক্ত হওয়া আসলেই কী বেদনার! এ ও নাড়ী ছেড়ার মতোই কষ্টের।

এর আগেও চুল কেটেছি। সেসব ছিল ফ্যশনের বিভিন্ন রকম মেয়েলী(?) কাট… কিন্তু এ তো শুধু চুল কাটা নয়, এটা মুক্ত হওয়াও। পুরুষতন্ত্র মানুষকে নারী বানানোর জন্য পেতে রেখেছে চুলের মতো মসৃণ, শাড়ীর মতো মিহি আর লিপস্টিকের মতো রঙিন কোমল নিউট্রন বোমা, যে বোমাতেই সাজাতে জীবন যায় মেয়েদের। আমি বলছি না, সবাইকে চুল ছোট করতে হবে। তবে এটা বুঝলাম যে, লম্বা চুলের ফাঁদ কেটে বেরুতে পারলেই মেয়েরা অর্ধেক মুক্ত হয়ে যায়। তবু আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল, গুড়িয়ে যাচ্ছিলাম আমি। বদলে যাচ্ছি চোখের পলকে।

আমার মা-বাবা কী ভয়ানক রিঅ্যাক্ট করবে ভাবতেই আমি হিম হয়ে যাচ্ছিলাম। এক সময় আমার মেয়ে এসে আমার হাত ধরলো। ও বুঝতে পারলো আমি ওর হয়ে লড়াই করছি। ও জানে, চুল ছোট করে ফেলার মতো একটা সিদ্ধান্ত আমার নিজের জন্য কতো কঠিন। কারণ, আমি কাল বাড়ি যাবো এবং ভয়ঙ্কর এক সময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে সেখানে। তবু সব কিছু ভুলে আমি শুধু আমার মেয়েটির হাত ধরে রইলাম। সারারাত আমরা একজন একজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলাম।

যারা মনে করছেন, সামান্য চুল কাটা নিয়ে এতো কী বলার আছে, তাদের বলি, এ যে কী অসম্ভব কষ্ট তা আমি নিজে না বুঝলে সত্যিই মেয়েটার উপর অবিচার করা হতো। আমার এক বন্ধু Bithy Haque কিছুদিন আগে (https://womenchapter.com/views/18046) লিখেছিল, প্র‍্যাক্টিসিং ফেমিনিজমের কথা। আমি তো প্রতিদিনই বুঝতে পারি, অ্যাপ্লাইড ফেমিনিজম এর জন্য নিজের ভেতরে জমে থাকা হাজার বছরের সংস্কার আর পুরুষতান্ত্রিক স্টেরিওটাইপগুলোকে অতিক্রম করতে হয় সবার আগে।

এটা ভয়ংকর এক যুদ্ধ। রান্নার সময় চিকেনের লেগ পিসের হিসাব থেকে হেয়ার কাট, সাজ, পোষাক,বা লিপস্টিক ইত্যাদি আপাত তুচ্ছ বিষয় নিয়েও নিজের সাথে লড়াই করতে হয়। আদর্শ আর বাস্তবতার মাঝে নিরন্তর সংঘর্ষ হয়। কখনও আপোস করতে হয়, সেই আপোসের কারণটাও যুক্তিগ্রাহ্য করে বুঝিয়ে দিতে হয়।

কারণ আমাদের সন্তানরা বিশ্বাস করে আমরা ওদের যা বলি, তাই সত্যি। আমাদের সন্তানরা মুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত। ওরা বোঝে, সমান মানে সমান। সন্তানের সামনে আদর্শ না তৈরি করতে পারলে সব শিক্ষাই যে প্রশ্নবিদ্ধ হবে ওদের কাছে। সুতরাং আমার না হয় গেলই একটু, আমাদের সন্তান যেন সব পায়। আমার যা হবে হোক, আমার সন্তানরা মুক্ত হোক, শেকল কাটুক, মানুষ হোক।

লেখাটি ৬১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.