একটি ওড়নার আত্মকাহিনী

0

জেসমিন চৌধুরী: আমি কাপড় জাতির ওড়না সম্প্রদায়ের একজন নগণ্য সদস্য, যদিও সম্প্রতি বিভিন্নমুখী আলাপ আলোচনার বদৌলতে আমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছি বলে মনে হচ্ছে। আমার জন্ম বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার এক অখ্যাত গ্রামের একটি ক্ষুদ্র তাঁত কারখানায়, যেখানে একজন দক্ষ তাঁতি তার মনের মাধুরী মিশিয়ে পরম যত্নে নীল আর সাদা সূতা দিয়ে আমাকে বুনেছিলেন। সূতার ফাঁকে ফাঁকে রূপালী জরি বুনে আমাকে রূপে-মাধুর্যে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন তিনি।

আমাকে দেখতে মনে হতো মুক্ত আকাশে এক টুকরো সাদা মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলা যেন। আমাকে এমন করে সাজিয়ে নেবার সময় তার হয়তো ধারণাই ছিল না এ জীবনে কতোটা কদর্যতা আমাকে দেখতে হবে।

জন্মের পর কিছুদিন আমি সেই তাঁত ঘরেই বসবাস করি। তারপর নানান ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে আমি এসে পড়ি লাল নীল বাত্তির ঢাকা শহরের একটি বহুতল মার্কেটে। সেখানে একটা আলোক-সজ্জিত দোকানের দরজার ঠিক পাশটিতে আরো নানান রঙের ওড়নার সাথে আমাকে বিক্রির জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়।

এই দোকানেও খুব বেশিদিন থাকা হয়নি আমার, নিজের চোখ ধাঁধানো রূপের কল্যাণে কিছুদিনের মধ্যেই আমি বিক্রিত হয়ে যাই, কিন্তু সেই অল্পদিনের মধ্যেই নিজের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতার সাথে সাথে মানব চরিত্রের নানান দিক সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ ঘটে আমার। নিজের চিকচিক করা শরীর নিয়ে দরজার পাশে লোভনীয়ভাবে ঝুলে থেকে থেকে আমি দেখতাম বাজার করতে আসা নারী-পুরুষ আর শিশুদের ভিড়, তাদের পোষাক আশাক, আচার ব্যবহার, দ্রব্যমূল্য নিয়ে দর কষাকষি।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম বাজারীদের ভিড়ে বেশির ভাগ মেয়ের গায়েই একটা করে ওড়না ঝুলে থাকে- নানান রঙ আর ডিজাইনের ওড়না, নানান ঢঙে পরা। কারোটা জামার উপরের দিকটা পুরোপুরি ঢেকে দিয়ে বুকের উপর নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে রাখা, কারোটা পাট পাট করে এক কাঁধের উপর ঝুলিয়ে রাখা, আবার কারোটা গলা থেকে পেছন অথবা সামনা দিয়ে দু’পাশে ঝুলানো, কিন্তু একজন পুরুষের পরনেও কোন ওড়না দেখতে পেলাম না। ঘটনাটা কী?

কিছুদিন যেতে না যেতেই বিষয়টা বোধগম্য হলো। একদিন জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা একটা মেয়ে এলো বাজার করতে। তার পরনে কোনো ওড়না ছিল না। সে চলে যাবার পর শুনলাম দোকানের লোকগুলো বলাবলি করছে, ‘ফিগার দেখেছিস? তার উপর ওড়না পরেনি। কী বেহায়া মেয়ে! লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই’।

বুঝলাম লজ্জা ঢাকতে মেয়েদেরকে ওড়না পরতে হয়, কিন্তু সেই লজ্জাটা কী, কোথায়, বা কেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। যাক গে, আমি সামান্য একটা কাপড়ের টুকরা, আমি আর কীইবা বুঝবো?

একসময় আমার নিজেরই লজ্জা লাগতে শুরু করলো, যখন দেখলাম দোকানের লোকগুলো বাজার করতে আসা মেয়েদের শরীর নিয়ে বিশ্রী ভাষায় কথা বলে,

‘দেখেছিস মেয়েটার দুধগুলো কী বিশাল?’

‘আরে, এই মেয়েটার তো কিছুই নাই রে, ধানকাটা জমির মতই সমতল!’

মজার ব্যাপার হলো তারা ওড়না পরা মেয়েদের নিয়েও এসব কথা বলতো। আরেকদিন আরেকটা মেয়ে এলো দোকানে ওড়না ছাড়া। সে চলে যাবার পর তারা বলাবলি করছিল, ‘এতো বড়বড় বুক নিয়ে ওড়না ছাড়া ঘুরাঘুরি করছে। নিশ্চয়ই চরিত্র খারাপ, চুটকি বাজালেই ছুটে আসবে’।

সব দেখে-শুনে যা বুঝলাম তার সারমর্ম হলো, মেয়েদেরকে বুক ঢেকে রাখার জন্য ওড়না পরতে হয়, না পরলে তাকে খারাপ বা সস্তা মেয়ে ভাবা হয়, কিন্তু একটা মেয়ে ওড়না পরুক আর না পরুক পুরুষ চোখ দিয়ে তার শরীর মেপে নেবেই নেবে এবং কুৎসিত মন্তব্য করতেও ছাড়বে না।

আমি একটা সামান্য কাপড়ের টুকরা হয়েও বুঝলাম সমস্যা বুকে বা ওড়নায় নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতায়। যে লোকগুলো একটা মেয়ে ওড়না না পরাতে তাকে নির্লজ্জ বলে গালি দেয়, সেই পুরুষগুলোই একটা ওড়না পরা মেয়ের বুকের সাইজ নিয়েও কথা বলে। অবশ্য দোকানে একজন ভদ্রলোক ছিলেন যিনি প্রায়ই বলতেন, ‘তোমারা এসব ফালতু আলাপ বাদ দাও, মেয়েদেরকে সম্মান করতে শেখো। মনে রেখো তোমাদের প্রত্যেকের মাও একজন নারী যার ঠিক এরকমই একটা শরীর আছে’।

তার কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম সব পুরুষই একরকম নয়, কারো কারো বিবেক আছে। যাই হোক, একদিন একজন পুরুষ আমাকে কিনে নিয়ে গেলেন তার মেয়েবন্ধুর জন্মদিনে উপহার দিতে। শুরু হলো আমার নতুন জীবন, একটি মেয়ের গলায় পরম আদরে ঝুলে থাকার জীবন। সে আমাকে খুব যত্ন করতো, প্রতিবার পরার পর সুন্দর করে ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখতো। অবশ্য ইস্ত্রি দেবার সময় অনেক কষ্ট লাগতো আমার, কিন্তু সহ্য করা ছাড়া কিছু করার ছিল না।

একদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। মেয়েটি রিক্সা করে বেড়াতে যাচ্ছিল। অসতর্কভাবে ঘাড়ে ফেলে রাখা আমি রিক্সার ঝাঁকুনিতে ঝুলতে ঝুলতে এক সময় চাকার মধ্যে পেঁচিয়ে গেলাম। আশেপাশের লোকজন চেঁচিয়ে উঠলো, মেয়েটা তবু আমাকে ছাড়তে নারাজ। আমাকে বুকের উপর ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে তার নিজের হাতটাই চাকার সাথে ঘষে গিয়ে চামড়া ছড়ে গেল খানিকটা। আমার শরীরও বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেল, কিন্তু সে কিছুতেই আমাকে ফেলবে না। বাসায় গিয়ে আমার ছেঁড়া জায়গাগুলো কোথাও সেলাই, কোথাও রিফু করে নিয়ে আমাকে আবারও ব্যবহারযোগ্য করে তুললো সে। আমরা দু’জন মনের সুখে গলাগলি করে দিন কাটাতে লাগলাম।

কিন্তু এই সুখ আমাদের কপালে সইলো না। একদিন একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল। মেয়েটি তার ছেলেবন্ধুর সাথে সন্ধ্যার পর পার্কে ঘুরছিল। হঠাৎ কোথা থেকে কয়েকটি পুরুষ এসে হাজির হলো। তারা ছেলেটিকে বেঁধে ফেললো, মেয়েটির ওড়না কেড়ে নিল। তারপর তার উপরে চালালো অমানবিক নির্যাতন। আমি মেয়েটির লজ্জা সম্ভ্রম কিছুই বাঁচাতে পারলাম না। নিজের ব্যর্থতায় নিজের মাঝেই মুখ লুকালাম।

তারপর মেয়েটার কী হলো আমি জানি না। তাকে ছেলেগুলো তুলে নিয়ে চলে যাবার পর আমি পড়ে রইলাম শিশির ভেজা ঠাণ্ডা ঘাসের উপরে। পরদিন সকালে একটা পাতাকুড়ানি মেয়ে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে বাড়ি নিয়ে গেল।

ছোট্ট মেয়েটা তার ফ্রকের উপর আমাকে জড়িয়ে তাদের ভাঙ্গা ঘরের দেয়ালে সাঁটা ফাটা আয়নায় নিজেকে গর্বিত চোখে দেখতো। তার ভাই মাঝে মধ্যে আমাকে মাথায় পাগড়ির মত জড়িয়ে নিত, কখনো বা গামছার মত কোমরে বেঁধে খেলতে যেত, কিন্তু কখনোই বুকের উপর পরতো না। আমি ভেবেই পেতাম না এই ছোট বাচ্চাগুলো কী করে জানলো যে ওড়না শুধু মেয়েদেরকেই বুকের উপর পরতে হয়? তারপর একদিন রাতে দেখলাম তারা বইতে পড়ছে, ও-তে ওড়না, পাশেই একটা ওড়না পরা মেয়ের ছবি। বাহ, কী সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা! ছোটবেলা থেকেই সব ঠিকমতো শিখিয়ে দিচ্ছে।

আমার জীবনে এই সুখও বেশীদিন টেকেনি। এক কালবৈশাখী ঝড় আমাকে উড়িয়ে এনে ফেলেছে এক নর্দমায়। এখানেই তিলে তিলে পচে মরছি আমি। আমাকে মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য বানানো হয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের কোনো কাজেই আসতে পারিনি। নর্দমাই আমার জন্য উপযুক্ত স্থান। এই-ই আমার উপযুক্ত শাস্তি।

লেখাটি ১,৩৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.