শুধু ফেমিনিস্ট না, প্র্যাক্টিসিং ফেমিনিস্ট চাই

0

বিথী হক: যেকোনো জিনিস চর্চা ছাড়া শুধুমাত্র জ্ঞান দেওয়ার উদ্দেশ্যে হলে সেটা ভয়াবহ। তাতে মানুষের কয়েকটা ব্যক্তিত্বের তৈরি হয়। যারা সেই ব্যক্তির সাথে পরিচিত তারা দ্বিধায় পড়ে যান আসলে কোন ব্যক্তিত্বটি নিখুঁত, কোনটি শাশ্বত সত্য, কোনটির সাথে তারা নিজেরা পরিচিত।

মানুষ হিসেবে আমরাই সম্ভবত এই বদগুণটি পেয়েছি, আমরা নিজের মতো করে আমাদের ব্যক্তিত্ব বদলাতে পারি।

আমরা বলি আমরা আধুনিক, আধুনিকতা আসলে কী? কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে আমরা কোন একজনকে আধুনিক বলতে পারবো? বন্ধুদের আড্ডায় বসে দামি চাকরি করা কেউ যখন সহকর্মীর চরিত্র বিচার করে, সেটা কি আধুনিকতার অংশ? বিয়ের পরেও কোনো মেয়ে ছেলে বন্ধুদের সাথে ভ্রমণে বের হলে তার চরিত্র নিশ্চয়ই খারাপ এই আধুনিক মানসিকতার জন্ম তো সমাজেরই দেওয়া। সকালবেলা বিপরীত ফ্ল্যাটের বারান্দায় শুকোতে দেওয়া অন্তর্বাস দেখে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় আসলে আধুনিক সমাজ কাকে দোষ দেয়? নারীকে? নারীর অন্তর্বাসকে? নাকি পুরুষের অতি উত্তেজিত শরীরকে?

উত্তরগুলো সবারই জানা।  

“ফেমিনিস্ট” শব্দটা এখন বেশিরভাগ সময়ই লেখালেখির সঙ্গে জড়িত এমনদের বোঝায়। আসলে ফেমিনিজমের সাথে লেখালেখির সম্পর্ক কী আছে? এটা তো চর্চার জিনিস। আমি যা বিশ্বাস করি, যেটা বলি, যেটা বুঝি, সেটা ঘরে বা বাইরে চর্চা করছি কী না সেটাই তো ফেমিনিজম। কেউ যদি মনে করে তার লেখার হাত ভালো, লিখলে আরো কয়েকটা মানুষও যদি বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করে তো তাদেরই সুবিধা তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু সেটার জন্যও কিন্তু ব্যক্তিজীবনে এর চর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য যারা অধিকার ছাড়াও তত্ত্বীয় ফেমিনিজম নিয়ে লেখেন তাদের কথা ভিন্ন।

বাসে উঠে সংরক্ষিত আসনে বসে, ছুটির দিনেও ওভারটাইম করে ঘরে এসে বরকে পায়ের উপর পা তুলে খেলা দেখতে বসিয়ে নিজে হেঁসেল সামলানো, আর সবার খাওয়ার পরে কোমর বেঁধে বাসন-কোসন মাজতে বসাটা কোনভাবেই ফেমিনিজমের চর্চা না, এটা বুঝতে হবে।  

বাড়ির আধুনিক পুরুষ সদস্যরাও নারী অধিকার বলতে মামুলি বিষয় ছাড়া কিছু বোঝেন না। তারা মনে করেন, নারীরা শুধু চাকরি করলে, বছরান্তে বিদেশে গিয়ে টাইট জিন্স পরলেই ল্যাঠা চুকে গেল। আর কোথায় কী হচ্ছে, না হচ্ছে তা জানার আগ্রহ বোধ করেন না তারা।

আমার এক বন্ধু আছে। ছবি তোলে, একা থাকে, সারা মাস দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। কোনদিন কোনো বিষয় নিয়ে লেখে না কিন্তু ও যা করে, তা আমার মতো পাতি প্রতিবাদী লেখক বা আমার চেয়ে অনেক ভালো এবং নামকরা লেখকদের চেয়েও বেশ কাজের। ও রাস্তা দিয়ে গেলে এলাকার ছেলেরা তো টুঁ করে শব্দ করা দূরের কথা, কেউ ফিরেও তাকায় না। ওকে কারও কিছু বলার সাহস নেই। কিন্তু আমি এখনো সে অবস্থানটা তৈরি করে নিতে পারিনি, এতোদিনেও। নিউ-মার্কেটের এক দোকানদার একদিন বলেছিল “আহা, এতো বড়, কেমনে সামলায়!” সে মুচকি হেসে বললো, “আপনাদের দোকান মালিক সমিতির অফিসটা যেন কোথায়?” বাকিটা বলা নিষ্প্রয়োজন। দেখতে সুন্দর একটা মেয়েকে মানুষ যেমন করে ভাবে, ও সে ভাবনার চারপাশ দিয়েও যায় না। আমি অবাক হই, বড় বড় কথা বলা মানুষগুলো তো রাস্তায় নামলেই বেড়ালছানা হয়ে যায়। আর ও কী-বোর্ডে নয়, চর্চা করে মাঠে নেমে।

চারপাশের অনেক নারীই বলেন, “আমি রান্না করি ভালবেসে, ওর নামের শেষ অংশও নিয়েছি ভালবেসে।” নিতেই পারেন, তবে সমান অধিকারের চর্চাটা সেখানে কোথায় হচ্ছে তা কি একবারও ভেবেছেন? আবার বেশিরভাগ নারীবাদীদের বাচ্চা-কাচ্চার নামের শেষ অংশও বাপের। আহা! ভালবাসা তো আপনার একার ঠেকা নয়, তারও আপনার প্রতি একইরকম ভালবাসা থাকবার কথা।

এই ভালবাসাই এখন নারীকে প্রতিদিন আরো দুর্বল করে তুলছে, পায়ে শিকল বেঁধে চুমু খেলেও নারীরা বুঝতেই পারেন না তার পায়ে দগদগে ক্ষত হয়ে গেছে। শিকল আঁকড়ে ধরে রেখেছে পা-জোড়া। ভালবাসাকে এমন দুর্বলতা বানিয়ে ফেললে সমান অধিকারের স্বপ্ন শুধু কাগজের পর কাগজে সেঁটে থেকে যাবে।

ভালবাসবেন না কেন? অবশ্যই বাসবেন তবে সেটা শক্তি হিসেবে ব্যবহার না করলে আপনি চিরতরে হারিয়ে যাবেন এর শক্ত প্রমাণ কিন্তু শতাব্দী ধরে রেখেছে, একটু খুঁজে নিলেই চলবে।

বলার জন্য বললাম, লেখার জন্য লিখলাম এমন মনোভাব দ্রুত বানের জলে ভাসাতে হবে লেখকদেরবন্ধুদের আড্ডায় যখন নারী সহকর্মীর চারিত্রিক বিশ্লেষণ চলছে তখনই প্রতিবাদ না করলে সে দায় আপনারও কম নয়। আপনার অন্তরালেও এমন অনেক কথা অনেকেই বলে। আপনি তুখোড়, আপনি স্বাধীনচেতা, আপনি খোলা মনের অধিকারী বলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন নারীকে নিয়ে যখন মন্তব্য করা হচ্ছে এবং তাতে অংশগ্রহণ করে নিজের খোলা মনের পরিচয় দিচ্ছেন, তখন একবার হলেও ভাববেন ওই নারী হতে পারতেন আপনিও। হলো না হয় কারো মুখে বেশি মেইক-আপ, কারো বুক খোলা, কারো হিল বেশি উঁচু, তাতে আপনার কী? আপনার বন্ধুদেরই বা কী?

চারপাশে এমন প্রচুর নারীবাদী আছেন যাদের নিয়ে রাস্তায় চলতে গেলে খুব বিরক্ত হই, বসে আড্ডা দেওয়ার সময় করুণা হয়। তারা বলেন “হয় না!” কী হয় না? কেন হয় না? এই হয় না’র জন্য দায়ী কে, একবারও ভাবেন না তারানিজের মুখের গ্রাস নিজের হাতেই তুলে নেওয়ার মানসিকতা যতদিন না নারীদের তৈরি হবে, ততদিন এসব লিখে পৃথিবী উদ্ধার করে ফেললেও কিন্তু আসলে লবডঙ্কা।

শুধু ফেমিনিস্ট দিয়ে আর এ আন্দোলন সফল করা যাবে না, দরকার প্র্যাক্টিসিং ফেমিনিস্ট। বুঝতে হবে কথা আর কাজের মিল থাকাটাই যে কোন আন্দোলন সফলতার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কথা তো সবাই বলতে পারে, হাত-পা-চোখ-মুখ তথা স্বরযন্ত্র ব্যবহার না করলে সে কথা কোনো কথাই নয়। আধুনিক বলতে আমরা যা বুঝি, সমাজ নিশ্চয়ই সে অর্থে আধুনিক, তবে তা নারীর জন্য নয়নারীর আধুনিক সমাজ নারীকেই তৈরি করে নিতে হবে, বিকল্প কোন রাস্তা নেই।

লেখাটি ৭২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.