অক্ষমের সান্ত্বনা হলো কটু কথা, অতএব…

0

ইশরাত জাহান ঊর্মি: উইমেন চ্যাপ্টার কী করে, কী লেখে, কারা কীভাবে লেখেন, সে বিষয়ে চ্যাপ্টার সম্পাদক স্পষ্ট করেছেন। এখানে টাকার বিনিময়ে কেউ লেখেন না। টাকা দেয়ার সামর্থ্য চ্যাপ্টারের নাই। সম্পাদক বা অন্য এডমিনরা কেউ এ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে কিছু লেখান না।

টাকা দেন না তবু এতো নারী এখানে লেখেন কেন? “ফেইম” কামাতে? প্রশ্ন করতে পারেন। অনেকে ফেইম কামান এবং কামিয়ে টাকা দেয় এমন পোর্টালে লিখতে শুরু করেন। সম্পাদক কিছুদিন লেখকদের সাথে মান-অভিমান করেন, তারপর বলেন, “আচ্ছা যা”!

লেখকরা লেখেন অন্য জায়গায় এবং উইমেন চ্যাপ্টারেও। কারণ এইটা ভালোবাসা আর নিজের কথা মন খুলে বলার একটা প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য। নতুন নতুন অনেক নারী যুক্ত হতে থাকেন লেখা নিয়ে। কী লেখেন তারা? তাদের যন্ত্রণা, বঞ্চনা, প্রতিদিনের প্রতিবন্ধকতা, অবমান, অপমান, ক্ষোভ আর বেদনার কথা।

এখন এই লেখালেখিতে কাদের গায়ে জ্বালা ধরে? অবশ্যই পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের। নারীকে এইভাবে দেখে তারা অভ্যস্ত নয়। নারী হলো মা বা বোন, বড়জোর নেকু-পুষু-মুনু আদুরে প্রেমিকা। সেই নারী বলবে, “আমার ইচ্ছা হলে ওড়না পরবো, না হলে না, আপনি আপনার চোখের ভিতরের লোলুপ জিহ্বা সামলান”; সেই নারী বলবে, “পিরিয়ড একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, এইটা নিয়ে এতো লজ্জার কিছু নাই”; সেই নারী বলবে, “হ্যাঁ, একসময় তোমার সাথে প্রেম ছিল, এখন আর প্রেমবোধ করছি না”; সেই নারী বলবে, “বিয়ে হয়েছে, কিন্তু আরেক জনরে আমার ভালো লাগে”; সেই নারী বলবে, “অফিসের কাজ শেষে ঘরে এসে আবার সংসার দেখতে হবে নিখুঁতভাবে, পারবো না”; সেই নারী তার জীবনের চাবি নিজের হাতে রাখতে চাইবে, ছদ্ম প্রগতিশীলরা মেনে নেবে তা ভাবার কারণ নাই।

তবে উইমেন চ্যাপ্টারকে আক্রমণের ধরনটা এবারে একেবারেই ইনোভেটিভ না। নারীরা জঙ্গি হচ্ছে, উইমেন চ্যাপ্টার কিছু বলে না কেন? এই যে আদারিং করা এইটার বিরুদ্ধে বলতে বলতে গলায় রক্ত তুলে ফেললাম।

নারী হয়েও খুন কেন করবে, নারী হয়েও জঙ্গি কেন হবে, এইসব আবালীয় প্রশ্নের উত্তর আমরা দেবো না। কিন্তু যারা আবাল না, অথচ যাদের মনের ভেতর একটু প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে, তাদের জন্য বলি, নারীকে আগে মানুষ ভাবেন। এইসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। নারী যদি মানুষ হয় তাইলে সে খুনি, জঙ্গি, অপরাধী, নৃশংস, নির্মম, সবই হতে পারে।

তার অপরাধের বিচার করেন। মানুষ হিসেবে। নারী হিসেবে তারে কোমল, নরম এইসব ভাবলে তারে রেইপ করা যেমন সহজ হয়, তার অপরাধও তেমন বিস্ময়ের বস্তু হয়।

এখন আসেন বাংলাদেশের নারী কেন জঙ্গি হচ্ছে! আশকোনা থেকে ধরা পড়া দুই নারী উচ্চশিক্ষিত। একজন এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো বিতর্ক করতেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ ছিল। এখন এই নারী কেন জঙ্গি হলেন? তার ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছিল? কে করেছিল? স্বামী? তাইলে সে যে লেখাপড়া শিখলো, বিতর্ক করলো, সেসবের কী হলো? তার ব্রেইন ওয়াশ এতো সহজ হলো কেমনে? সে তো গ্রামের অশিক্ষিত কোন নারী না। তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ আছে বা ছিল?

আর শুধু বাংলাদেশে কেন? আজকেই অধ্যাপক আলী রীয়াজ এর লেখায় পড়লাম, ইসরায়েল, শ্রীলংকা, চেচনিয়া, রাশিয়া এবং এখন নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের হয়ে শত শত নারী আত্মঘাতী জঙ্গি হচ্ছে।

তো, এইখানে আমাদের উইমেন চ্যাপ্টার কী করবে? এটা তো গ্লোবাল ফেনোমেনা।
তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট আসলেই এক বিষ্ময়। এইখানে পুরুষতন্ত্র বিষয়টাই কারোর মাথায় ঢোকানো গেল না। নারী হলেই সে নারীবাদী হবে, পুরুষতন্ত্রের ধারক হবে না-এইটা তো কেউ বলে নাই।

আর যাদের গায়ে উইমেন চ্যাপ্টার জ্বালা ধরাচ্ছে, তাদের মধ্যে জ্ঞানী-গুণীরা বলছেন, চ্যাপ্টার যে নারীবাদ প্রচার করছে, তা কোনো নারীবাদের মধ্যেই পড়ে না। এতোই ফালতু এসব লেখা। তো, পড়ে না যখন, তখন ইগনোর করলেই হয়। আপনারা সহী-শুদ্ধ নারীবাদ প্রচার করেন, মানা তো কেউ করে নাই!
এইসব গা জ্বালা দেখে আমার এবং উইমেন চ্যাপ্টারে যারা লেখেন, তারা সকলেই একটা কথাই ভাবি, সেই পুরনো কথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর পত্রে মৃণালিনী লিখেছিল,
“অক্ষমের সান্ত্বনা হলো কটু কথা, অতএব উহা আমি ক্ষমা করিলাম।”

এদের এইসব বলায়-টলায় আমাদের নিট ক্ষতি হলো পাঁচশ টাকা! একটু ব্যাখ্যা করি। উইমেন চ্যাপ্টারের নারী লেখকরা (কখনও পুরুষরাও থাকেন) মাঝে মাঝে মাঝারি মানের কোন রেস্টুরেন্টে বসি আমরা। খাই-দাই। গপ-সপ করি। তারপর যার যার ঝোলা থেকে টাকা বের করে একসাথে বিল মেটাই। প্রায়ই টাকার পরিমাণটা একেক জনের ৫০০ করে হয়। এখন এইসব আবালদের বক্তব্য এবং গা চুলকানিরে সেলিব্রেট করতে আমরা শিগগিরই হয়তো বসবো, খাবো-দাবো এবং আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের লেখা অব্যাহত রাখার শপথটারে নতুন করে চাঙ্গা করবো!

লেখাটি ২,০৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.