‘প্রাক্তন’ নিয়ে একটি নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণ

শিল্পী জলি: কিছুদিন যাবত অনেকেই একে-অপরকে প্রাক্তন মুভিটি দেখার পরামর্শ দিচ্ছে। এতে কেউ কেউ অফেন্ডেড ফিল করছেন– প্রশ্ন তুলছেন, এর মানে কী?

সামান্য মুভি দেখার পরামর্শে কেন মেয়েরা অফেন্ডেড ফিল করছে বোঝার চেষ্টায় আমিও মুভিটি দেখলাম। দেখতেই বাঁকা হাসিটি খেলে গেল ঠোঁটের কোণে। মুভিটি যেন বাঙালী সমাজের নব্বইভাগ নারীরই বিবাহিত জীবনের গল্প। যেই দেখে সেই হয়তো ভাবেন, এই রে, আমার কথা বলছে নাতো?

আমি যে অহরহ গাল আর মারের উপরেই টিকে আছি অথচ…।

মুভিটিতে জোরালোভাবে মেয়েদের নিজ থেকে ঘর ছেড়ে না যাবার বার্তা দেয়া হয়েছে। ভাসা ভাসা ভাবে দেখানো হয়েছে, নারীর সবুরে মেওয়া ফলে, আর ঘর ছেড়ে গেলে সেই নারীর মনের হাহাকার, আকুতি-বিকুতি-কান্নার কূল-কিনারা থাকে না।

একটি নেড়ি কুকুরের সাথে থাকলেও মানুষ মায়ায় জড়িয়ে পড়ে, সেখানে যাকে একদিন ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, যার সাথে কাপড় খুলে শরীর শেয়ার করেছে, যার সাথে আজীবন থাকার প্লান ছিল, তাকে দেখে পুরোনো দিনের কিছু স্মৃতি, কিছু অবহেলার কথা, কিছু কান্না, বা কয়েকবার পেছন ফিরে তাকানো, আর মনে মনে হয়ত বলা শালার বেটা ! আগে যদি বুঝতাম তাহলে…! আসলেই কি খুব বেশী কিছু মিন করে?

নাকি, শুধু ক্ষণিকের তরে জীবনের কিছু ভুল, ক্ষতি বা ব্যর্থতার কথা মনে করে চোখ ভিজে যাওয়াকে বোঝায়?

শুনেছিলাম, বিয়ের পরও শো’বিজনেসের সাথে থাকায় মায়ের কথায় তারানা হালিমকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন তাঁর বর। ছেলের মায়ের বায়নায় ডিভোর্স হতেই তারানা হালিম কথা না বাড়িয়ে ‘যারে ভাই, মায়ের কোলে ফিরে যা’ বলে আইন মোতাবেক দু’লক্ষ টাকা পাওনা বুঝে নেন।

যদিও তাঁর কাছে ঐ টাকা তেমন কিছুই ছিল না, তারপরও সেটা তার পাওনা ভেবে তিনি নিয়েছেন। কেননা তিনি উকিল মানুষ হওয়ায় বেশ ভালোই জানতেন, ছেলেরা বউয়ের কদর না বুঝলেও টাকা হারাবার লোকশান খুব ভালোই কষে। আর ঘরে ঘরে মেয়েরা ঐ পাওনাটি ছেড়ে দিলে ছেলেরা ঐএকই টাকায় বার বার কবুল পড়ে বিরতি না দিয়েই আরেক মেয়ের সর্বনাশে নামে। আর বিয়ের জন্যে টাকা জমাতে যদি কারও তিন মাসও লাগে, তাহলে অন্তত কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও জীবনে একটি মেয়ের শূন্যতাকে সে উপলব্ধি করার সময় পায়, হয়তো বুঝতে পারে জীবনে একটি সঙ্গী কতটা দামী, প্রয়োজনীয় ।

যাই হোক, ডিভোর্স দিয়েই তাঁর প্রাক্তনের হুঁশ ফিরে আসে। বুঝতে পারেন, মা আর যাই হোক, বউয়ের বিকল্প নয়। ছুটে গিয়ে বউয়ের হাত-পা ধরে কেঁদে পড়েন, ‘আর একবার বাঁচাও বউ!’

তারানাও বাড়তি দেমাগ না দেখিয়ে ভাবেন, যদি কাজ হয়, যদি বাচ্চার বাবার মধ্যে পরিবর্তন আসে, যদি বিয়েটি কাজ করে– এতোদিন যখন দেখেছি, থেকেছি, আরেকটু নিশ্চিত হতে ক্ষতি কী– দু’টি বাচ্চাও যে রয়েছে!

মাতৃত্বের খাতিরে তিনি আরও একবার ঐ বরের ঘরে ফিরে যান এবং পরবর্তীতে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে ফিরে আসেন যে, সদ্য প্রাক্তন আগে যে লাউ ছিলেন, এখনও সেই কদুই আছেন, আক্ষরিক অর্থে কোন পরিবর্তনই তার হয়নি।

ঐ ঘরে দ্বিতীয়বার ফিরে যেতে তারানা হালিমকে ধর্মীয় বিধানকে কিছুটা পাশ কাটাতে হলেও সন্তানদের খাতিরে ভবিষ্যতের পথ শতভাগ পরিস্কার করেছেন তিনি। তাই অকারণ জেদাজেদি, বা ইগো প্রবলেমে ঘায়েল না হয়ে কোন পিছুটান ছাড়াই তিনি জীবনের বাকি পথটুকু চলতে পেরেছেন। তাঁর জীবনই এখন বলে দেয়, তিনি মোটামুটি ভালোই আছেন– অন্য সাধারণ মানুষের মতোই জীবনের আপস-ডাউনস নিয়ে।

প্রাক্তন মুভিতে সুদীপার হাহাকারকে কে কিভাবে দেখবে সেটা নির্ভর করে দর্শকের চিন্তার গভীরতার উপর। তারপরও কিছু বার্তা দিয়েছে মুভিটি। হয়তোবা না বুঝেই–

মুভিটিতে মেয়েটি ডিভোর্স দিয়েছে, ছেলে নয়। অর্থাৎ মেয়েরাও প্রয়োজনে ডিভোর্স দেয় ! হয়ত সে কারনেই মেয়েটির হাহাকারটি বেশী দেখাবার চেষ্টা চলেছে। তারপরও দেখানো হয়েছে, সুদীপার আরেকটি বিয়ে হয়েছে। যদিও সে ফিরে ফিরে তাকায় তবু এটাও সত্যি যে ট্রেনে দেখা না হলে সে প্রাক্তনের খোঁজও নিতো না।

পজেটিভ দিকটি হলো, তাঁর এবারের বরটি বউয়ের জন্যে সময় বের করে, সারপ্রাইজ দেয়, কেয়ারিং, সভ্যতা বজায় রাখে, আবার চৌদ্দ সন্তানের বাবাও নয় । অর্থাৎ আক্ষরিক হিসেবে সুদীপার তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।

এতো বছর পরও যখন সে উজানকে জিজ্ঞেস করে, বাচ্চাটি যদি তাদের হতো তাহলে উজান কি বদলাতো? উজান উত্তর দেয়, ঠিক নিশ্চিত নই।

মানে, মালিনীর সাথে উজান সুখী হলেও, সুদীপার সাথে উজান সুখী হতো এমন কোন বার্তা মুভিটিতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ উজানের সাথে সুদীপার ভবিষ্যত ঝরঝরেই ছিল– এখানে মালিনী কে, কী, কেন, অবান্তর প্রশ্ন।

মালিনীকে দেখানো হয়েছে সে বিয়েতে সুখী। কেননা উজান এখন বউকে সারপ্রাইজ দেয়, বউয়ের জন্মদিন প্লান করে, হানিমুনে যায়, বাজার করে। এমনকি বউয়ের কথায় নিজের কোম্পানিও খুলেছে। সুদীপার যা কিছু চাওয়া ছিল তাঁর প্রায় সবকিছুই সে এখন মালিনীকে দিচ্ছে। এমনকি তাঁদের পরিকল্পিত বাচ্চার নামটিও রাখতে ভোলেনি। অর্থাৎ সুদীপা গিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে উজানদের বউ রাখতে কী কী করতে শেখা জরুরি, নইলে কোনো বউই থাকবে না। তাই সুদীপাকে হারিয়ে সে নিজেকে অনেকটাই শুধরে নিয়েছে।

শিল্পী জলি

অনেক দর্শকই হয়তো দেখতে চেয়েছিলেন, উজান যেহেতু সুদীপাকে সুখী হতে দেয়নি, সেহেতু সে নিজে কোনদিন সুখী হবে না এবং কম শিক্ষিত মালিনীকেও সুখী হতে দেবে না– তাহলেই কি মুভিটির সঠিক পরিণতি হতো?

এতে কি ‘বিয়ে করে করে একের পর এক মেয়ের জীবন নষ্ট করাই সমাজে ছেলেদের ব্যবসা’ শেখানো হতো না?

বরং সুদীপা চলে গিয়ে উজানের মাঝে সভ্যতার যে বীজ বপণ করে গেল, সেই ফল না হয় মালিনীই ভোগ করলো– ক্ষতি কী?

কদর বাড়লো তো একটি নারীরই।

তবে মুভিটিতে কিছু প্রেক্ষাপট ছিল অপরিণত চিন্তাধারার ফসল।

যখন সুদীপাকে বসের সাথে ঘুমাবার বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করা হয়, বউয়ের মোবাইল চেক করাকে নিজের প্রোপার্টির সাথে তুলনা করা হয়, তখন সুদীপা যায় না, কিন্তু একজনের মৃত্যুর সংবাদ শুনেও সে চলে যায়! অথচ তখন সে বিয়ে রিপেয়ারের উদ্দেশ্যেই ভেকেশনে গিয়েছিল।

বাচ্চা পেটে নিয়েও শারীরিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে যে নারী শাশুড়ির মন জুগিয়ে চলে, সেকি কখনও একজন মানুষের মৃত্যুর খবর শুনে দৌঁড়ে গিয়ে ডিভোর্স দেয়? তাছাড়া যে মেয়ে শুধু বিয়ে বাঁচাতেই ভেকেশন প্লান ফাঁদে, সে কি আসলেই তখন ডিভোর্সের জন্যে তৈরি?

আমার চোখে মুভিটি একটি বার্তাই দিয়েছে, এটি একটি প্রি-ম্যাচিউ্যর ডিভোর্স কাহিনী এবং ডিভোর্সে তড়িঘড়ি চলে না– মুভিটিতে তারই হাহাকার।

ডিভোর্স কোন ছেলেখেলা নয় যে বাসীতে ফুঁ দিতেই দৌঁড় দিতে হবে। বরং যত সময় নেয়া দরকার, ঠিক ততোটা সময় নেয়া জরুরি। এমনকি ডিভোর্স দেবার পরও যদি কোন মেয়ের মনে হয়, হয়তো আশা ছিল, হয়তো কোথাও বুঝতে ভুল হয়েছে, তাহলে ফিরে যেতে চাওয়াও লজ্জাজনক নয়, বরং তাদের সমঅধিকার কায়েম হলো।

ছেলেরা যেমন স্যরি বলে কান ধরে নাকে খৎ দিয়ে ছেড়ে দেয়া বউকে ফিরে পেতে চায়, মেয়েরাও দরকার মনে হলে তেমনই করবে। তখনই ছেলেরা অনুধাবনে সক্ষম হবে যে, যে কাজ একটি ছেলের পক্ষে করা সম্ভব, সে কাজ একটি মেয়ের পক্ষেও করা সম্ভব, এবং জীবনে যেকোনো ভুলের মাশুল দু’পক্ষকেই সমানভাবে গুণতে হতে পারে।

মুভিতে সুদীপার যতটা অসন্মান দেখানো হয়েছে, যতটা অকদর দেখানো হয়েছে, যতটা নোংরা কথা শোনানো হয়েছে, তা বাস্তব জীবনের চিত্রের চেয়ে অনেক কম। বাংলার ঘরে ঘরে বিবাহিত মেয়েরা অহরহ মার, গালাগাল, যৌতুকের চাপ, পর-নারীর চাপ, অতি সেক্সের চাপ, সেক্সহীনতার চাপ, মেয়ে সন্তান জন্ম দেবার চাপ, সন্তান না জন্ম দেবার চাপ, অতি যোগ্যতার চাপ, অযোগ্যতার চাপসহ নানা চাপ সয়ে বেড়ায়।

বরের অবজ্ঞা- অবহেলায় অতিষ্ট হয়ে এক বউ চলে যাবার পরও যদি আরেক বউ এসে ঐ একই জ্বালায় জ্বললো, তাহলে তো সমাজে ছেলেদের পোয়াবারোই– এক বউ যাবে, আর নতুন নতুন কম বয়সী বউ এসে সেবা এবং সেক্স সরবরাহ অব্যাহত রাখবে, আর সব মেয়েই একই গোয়ালের গরুতে পরিণত হবে।

বরং সুদীপা চলে যাওয়ায় উজানদের জীবনে যদি একটুও পরিবর্তন আসে আর তাতে কম শিক্ষিত মালিনীরা যদি একটু সুখের মুখও দেখে, তাতে বিজয় মেয়েদেরই।

সুদীপা যখন ছিল না মালিনীর তখন আগমন–দু’টি আলাদা সত্ত্বার তুলনা কিসের?

পুরুষের কুকামে নারীতে নারীতে প্রতিযোগিতা, চুলোচুলি–বোকামি!!!

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.