তিন নম্বর মেয়ে 

তামান্না ইসলাম: সোমেন রায় মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ। একজন সাধারণ কলেজ শিক্ষক। শিক্ষকতার কারণেই হোক আর নিজের আগ্রহে করা পড়াশোনার কারণেই হোক, প্রকৃত শিক্ষার আলো ঠিকই তাঁর মনের গভীরে পৌঁছেছে। সমস্যা হলো, তিনি অতি নিরীহ মানুষ, বলা যায় খানিকটা ভীতু প্রকৃতির। নিজের মনের গভীরে সত্য জেনেও অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। তাঁর স্ত্রী সুষমা দেবী স্বামীর এই স্বভাবটি ভালো করেই জানেন। তাই স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসায় খানিকটা করুণা মিশে আছে, খুব বেশি শ্রদ্ধা নয়। 

পর পর দুটো মেয়ে হওয়ার পর সুষমা দেবী এবং সোমেন রায় দুজনেরই মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। সুষমা দেবী ভয় পাচ্ছিলেন শাশুড়িকে নিয়ে, শ্বশুর মশাইকে নিয়ে। আর পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনকে নিয়েও। সোমেন রায় তাঁর শুকনো মুখে হাসি টেনে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ‘বেশ তো দু’বোনে কতো ভাব হবে।’ 
শ্বশুর শাশুড়ির চাপে বাধ্য হয়ে বংশের বাতির আশায় তাঁরা তৃতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করলেন, যদিও জানেন না এই সীমিত আয়ে কীভাবে তিনটি বাচ্চাকে ভরণপোষণ করবেন। যথা সময়ে ঘর আলো করে যখন এলো তিন নম্বর মেয়ে, তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এবার আর সোমেন রায় চেষ্টা করেও শুকনো মুখে হাসি ফোটাতে পারলেন না। শুধু তিন সন্তানের ভরণপোষণই তো শেষ নয়, এদেরকে বিয়ে দিতে হবে। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় উপযুক্ত বর পণ ছাড়া মেয়ের বিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। গয়না-গাটির সাথে নগদ টাকারও ব্যাপার আছে। তাঁর মতো একজন সামান্য স্কুল শিক্ষকের পক্ষে কীভাবে সম্ভব তিনটি মেয়ের জন্য পর পর এই পণ জোগাড় করা? 
মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো এসময়ে তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে পেলেন একটি সান্ত্বনাদায়ক চিঠি। বলা বাহুল্য, ছোট ভাইয়ের একটি পুত্র সন্তান আছে। চিঠিটি তাঁর মনে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা  লাগিয়ে দিল।
মানুষের কাছে অনবরত কথা শুনতে শুনতে তাঁর মনে এক জেদের জন্ম নেয়। তিনি তাঁর একটি মেয়েকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন, তিনি সমাজকে কাঁচকলা দেখাবেন, প্রমাণ করবেন তাঁর মেয়েরা ছেলেদের চাইতে কোনো অংশে কম নয়। বড় দুটি মেয়ে পড়ালেখায় মাঝারি মানের। তাঁর সব আশা যেয়ে ভর করলো ছোটটির উপর, এ যেন তাঁর শেষ অবলম্বন। তিনি কিছুতেই হেরে যাবেন না। 
ছোট মেয়ে রঞ্জিতা কিন্তু স্বভাব শিল্পী। তার ভালো লাগে ছবি আঁকতে। ভালো লাগে সেলাই করতে। যদিও তার পড়ালেখার মাথাও খুব ভালো, কিন্তু মনে মনে তার স্বপ্ন একদিন সে বড় আর্টিস্ট হবে। বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবা-মায়ের তীব্র কষ্টটা সে আস্তে আস্তে বুঝতে পারলো। তার কারণেই যে সেই কষ্টের শুরু, আর তাকে ঘিরেই ওই দুটো মানুষের মুক্তির স্বপ্ন টের পেতো সে। এক সময় নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে, শিল্পী মনকে দুমড়ে-মুচড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করলো রঞ্জিতা। 
বলছিলাম আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের গল্প। ভারতীয় মেয়ে রঞ্জিতা এখন একটি নামকরা আন্তর্জাতিক কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্যমতে, এখনো রুমভর্তি ছেলেদের মাঝে সে হতাশা দেখে যখন একজন নারীর নির্দেশে টেকনিক্যাল কাজ করতে হয়, কিন্তু সে এতোদিনে জেনে গেছে কীভাবে এগুলোকে উপেক্ষা করতে হয়।
বাবা মায়ের তিন নম্বর মেয়েটি তার বাবা-মাকে অনেক অনেক গর্বিত করেছে ঠিকই, তবে নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সমাজের কাছে তাকে প্রমাণ করতে হয়েছে, সে ছেলেদের মতো মানুষ, মেয়ে বলে সে ছেলেদের চেয়ে কম সক্ষম মানুষ নয়।    
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.