প্রিয় মিডিয়া, খদ্দেরের মুখটাও দেখান দয়া করে

শাশ্বতী বিপ্লব: ক্যামেরা দেখেই তড়িঘড়ি ওড়নায় মুখ লুকালো কয়েকজন। এর ফাঁকেই দু’একজনের মুখ দেখা হয়ে গেলো পর্দায়। তিনচারজন ওড়নায় মুখ লুকাতে লুকাতে প্রাণপন দৌড় দিলো যেদিকে পারলো। পেছনে পেছনে ক্যামেরা হাতে দৌড়াচ্ছে একটি দল। এর মাঝে দু’জন রাস্তার পাশের কাঁটাতার বিপদজনকভাবে ডিঙ্গিয়ে গেলো। রাজপথ দিয়ে দৌড়াতে লাগলো পড়িমড়ি করে।

পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে দ্রুতগতির গাড়ি। যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোন সময়। এরই মাঝে পুলিশ নাটকীয়ভাবে বীরবিক্রমে এসে ম্যাচ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলো রাস্তার পাশে কাপড়ের ঘের দিয়ে বানানো অস্থায়ী মিলনস্থল।

যৌনকর্মীরা খুব খারাপ, খুব খুব খারাপ। আইন-কানুন মানতে চায় না। নগরে অন্ধকার নেমে এলেই সারি সারি দাঁড়িয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ রাজপথের ধারে। ছোট-বড় দেবদারু আর ল্যামপোস্টের আড়ালে-আবডালে। ফুটপাতের পাশেই ঘাসের উপর চারদিকে এক টুকরো ঘেরটোপের অনাড়ম্বর আয়োজন। এর বেশি আহ্লাদ করার সুযোগ নেই, সময়ও নেই। খদ্দেরদেরও এর বেশি আয়োজনের চাহিদা নেই। বরং এই ভালো, চলতি পথে চট করে কাজ সেরে নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফেরা যায়। 

এটা কিন্তু ভারী অন্যায়, একেবারে দুঃসাহসের চূড়ান্ত, কী বলেন? একে তো ভাসমান, তার ওপর অবৈধ (!) কাজ করে, তাও কিনা একেবারে পুলিশের নাকের ডগায় রাজপথ ঘেঁষে দাড়িয়ে থাকে! এতো রীতিমতো অপরাধ!

অপরাধ থাকলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থাও তো করা দরকার, নাকি? তো সেটা কীভাবে সম্ভব? ভাববেন না। সেই মহান দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির “তালাশ” টিম। এবার তারা নেমেছে চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বিজয় সরণীর রাস্তায় ভাসমান নারী ও হিজরা যৌনকর্মীদের অবৈধ অবস্থান/ ব্যবসা হাতেনাতে ধরতে। দক্ষ গোয়েন্দার মতো ক্যামেরা হাতে শুধু হানা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, রীতিমতো তাড়া করে ভাগিয়ে দিয়েছে এইসব ভাসমান যৌনকর্মীদের। আমরা আমাদের মিডিয়ার সৎসাহস এবং ক্ষমতা দেখে আনন্দিত হয়েছি। এইবার প্রাণের শহর নোংরামিমুক্ত না হয়েই যায় না।

ভাসমান যৌনকর্মীর কাজ অবৈধ – কোন সন্দেহ নাই।
গুরুত্বপূর্ণ পথে দাঁড়িয়ে থাকা চরম অপরাধ – নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
ঘাসের উপর সস্তা সংগম বেআইনী – সে আর বলতে, হুজুরের মতে অমত কার?

কিন্তু খদ্দেরের যৌন লালসা বৈধ – কোন সন্দেহ নাই।
সস্তার সুখের তৃপ্তির ঢেকুর নিরপরাধ – নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
পুলিশের নীরব (!) সমর্থন সম্পূর্ণ আইনসম্মত – সে আর বলতে, হুজুরের মতে অমত কার!

তাই তালাশ টিম ক্যামেরা হাতে নেমেছে আসল (!) অপরাধী ধরতে। নিরীহ খদ্দের থেকে গেছে নিরাপদে ক্যামেরার আড়ালে। খদ্দেরের চিত্রধারণ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই তাদের ভাগিয়ে দেয়ারও। এই পাজীগুলো সস্তায় শরীর বেচে বলেই না কিছু নিরীহ সুবোধ পুরুষ কষ্টে কামানো পয়সা নষ্ট করতে আসে। তাই যৌনকর্মীদের শায়েস্তা করতে পারলেই সব অপরাধের অবসান হবে।  

ভালো কথা, মাচ এপ্রিশিয়েটেড। কিন্তু ক্যামেরায় যৌনকর্মীদের মুখ দেখানো, তাদের পিছনে পিছনে ক্যামেরা হাতে ধাওয়া করার এক্তিয়ার তাদের কে দিয়েছে?

শাশ্বতী বিপ্লব

তালাশ টিমের কী ধারণা? যৌনকর্মীদের ব্যক্তিগত কোনো জীবন নেই? পরিবার-পরিজন নেই? সমাজ নেই? তারা শখ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে? টিভি চ্যানেল দেখলে বর্তে যায়? ক্যামেরায় মুখ দেখাতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করে?  

তাদের বিনা অনুমতিতে তাদের শ্যুটিং করার অধিকার তালাশ টিমকে কে দিয়েছে? এইসব যৌনকর্মীদের খদ্দের যারা তাদের মুখ কই? তাদের কেন ক্যামেরায় বন্দী করলেন না তালাশ টিম? হ্যাডম থাকলে তাদের মুখগুলোও একটু দেখান দয়া করে। দেখি কত বড় মাস্তান আপনারা।

টিভি চ্যানেলগুলোর মাস্তানি আর অনধিকার চর্চা মাঝে মাঝে সত্যি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তালাশ টিম আবারো বুঝিয়ে দিলো, টিভি চ্যানেলগুলোই দেশের আসল মাস্তান, ক্ষমতাধর গোষ্ঠী।

আমি সাংবাদিক নই, তবে সাংবাদিকতার কোন এথিক্সে এই মাস্তানি জায়েজ, সাংবাদিকরাই ভালো বলতে পারবেন।

শেয়ার করুন:
  • 326
  •  
  •  
  •  
  •  
    326
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.