পুরুষের বিশেষ পারফরমেন্স

0

ড. সীনা আক্তার: পেশাজীবনের শুরুর দিকে কয়েক বছর এক নারী সংগঠনে কাজ করেছিলাম। সেখানে নারী অধিকার, উন্নয়ন নিয়ে না না বিষয়ে প্রশিক্ষন, কর্মশালা হতো। একবার ‘যৌনতা এবং সন্তুষ্টি’ বিষয়ে একটা কর্মশালা হয়েছিল।

জীবনে সেই প্রথম যৌনতা বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা শোনার অভিজ্ঞতা হলো (অজ্ঞ ছিলাম তাই শুধু শুনেছি, বলতে পারিনি)। শহর এবং দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষিত, কমশিক্ষিত নারীরা সেই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ নারী যৌনতা বিষয়ে তাদের অজ্ঞতা, বঞ্চনা, নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন।

যেমন, একজন নারী হতাশা নিয়ে বললেন,  ”সে (স্বামী) মোড়গের মত উঠে আর নামে, আর আমি কাটা মুরগির মতো …”। সদ্য বিবাহিত এক নারীর অভিজ্ঞতা, তিনি তার অসন্তুষ্টির কথা স্বামীকে বলতেই স্বামী তার চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলে, সন্দেহের চোখে দেখে … ।

আরেকবার কিশোরীদের জন্য, কিশোরীদের নিয়ে এক কর্মশালা হচ্ছিল, বিষয়: ‘শরীর ও যৌনতা’ বিষয়ে সচেতনতা। এক আপা পুরুষের উত্থিত লিঙ্গ (Erection) বিষয়টা কী এবং কেমন সে বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, তিনি বোর্ডে ছবি এঁকে দেখাচ্ছিলেন যৌনতায় একজন সুস্থ পুরুষের লিঙ্গ ৪৫ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে উত্থিত হয়। সেদিনই প্রথম আমি বিষয়টি জেনেছিলাম। সত্যি বলতে তখন প্রথম অনুধাবন করেছিলাম এ বিষয়গুলো জানাটা কতটা জরুরি।

বলাই বাহুল্য, পরিবার বা স্কুল থেকে এ বিষয়ে জানার কোনো সুযোগ ছিল না। আমার মুর্খ থাকার পেছনে আরও যৌক্তিক কারণ ছিল। সাধারণত ভাবী বা বড় বোনদের থেকে অনেকে এসব বিষয়ে হয়তো কিছুটা ধারণা পায়, কিন্তু আমার সেই সুযোগও ছিল না। উপরন্তু যৌনতা বিষয়ে ছোটবেলা থেকেই ফিসফাস শুনেছি এসব খারাপ বিষয়, এসব নিয়ে কথা বলতে নেই এবং খারাপ মানুষেরা এসব নিয়ে কথা বলে ইত্যাদি। ফলে কোনদিন এসব নিয়ে কৌতূহলও দেখাইনি যদি কেউ খারাপ ভাবে এই ভয়ে!

আমার বিশ্বাস আমাদের দেশে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নারীরই মনোরম, সুখপূর্ণ যৌনতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব আছে। পরিণতিতে তারা পুরুষ সঙ্গীর বিশেষ পারফরমেন্স এবং নিজের সন্তুষ্টি উপলব্ধি করতে অপারগ। অনেকে মনে করে যৌন সন্তুষ্টি শুধুমাত্র পুরুষের বিষয় এবং এই ধারণায় অনেকে পুরুষ সঙ্গীর যৌন নিপীড়ন সহ্য করে। আনন্দহীন যৌনতা নিপীড়নের মতোই হবার কথা।

শুনেছি অনেক পুরুষ নিজেদের দুর্বল পারফরমেন্স এর জন্য সঙ্গীকে নিপীড়ন করে, অনেকে সঙ্গীর সন্তুষ্টি বিবেচনাই করে না। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অধিকাংশ পুরুষ (সবাই না) যেখানে ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীর উপর কর্তৃত্ব চালায়, সেখানে নারী-পুরুষের একান্ত সম্পর্ক পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটাগিরির বাইরে থাকে কী করে! নিজেদের বিশেষ পারফরমেন্সে আস্থাহীনতার কারণেই হয়তো অনেক পুরুষ বউ হিসাবে অল্পবয়সী, আনাড়ী মেয়েদের পছন্দ করে।

প্রসঙ্গক্রমে, অনেকদিন আগে তসলিমা নাসরিন তাঁর এক লেখায় আমাদের দেশের পুরুষের বিশেষ পারফরমেন্সের সমালোচনা করেছিলেন, এবং ইউরোপীয় পুরুষের প্রশংসা করে উল্লেখ করেছিলেন, তারা কিভাবে নারীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে এবং সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায় …।

স্বাভাবিকভাবেই নারী-পুরুষের মধ্যে সুন্দর/সুন্দরী সঙ্গী পাবার আকাংঙ্খা রয়েছে। আমাদের দেশের মেয়েরা এর ব্যতিক্রম না। কিন্তু অভিজ্ঞদের মতে, একজন হ্যান্ডসাম পুরুষ মানে তার বিশেষ পারফরমেন্স ভাল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। যেমন, Sex and the city ছবিতে Sarah Jessica Parker র একটি সংলাপ হচ্ছে ”Men who are too good looking are never good in bed because they never had to be (বেশি হ্যান্ডসাম পুরুষ কখনও বিছানায় ভাল হয় না, কারণ তারা কখনো হয়নি)”।

সেলিম আলদীন স্যারের এক নাটকে দেখেছিলাম এক তরুণী তার পানিপ্রার্থীকে প্রেমের শর্ত হিসাবে কুস্তিতে জেতার কথা বলে। নাটকটি দেখার সময় এর মাহাত্ম্য বুঝিনি। কুস্তি খেলায় অন্তত একজন সুস্থ্-সবল পুরুষকে চিহ্নিত করা যায়। বলাই বাহুল্য, সঙ্গীকে সন্তুষ্ট করতে একজন পুরুষের সুস্থতা দরকার। পাশাপাশি সংবেদনশীলতা, দক্ষতা এবং সঙ্গীকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা জরুরি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নারীর আত্ম-সচেতনতা, নিজ এবং পুরুষের শরীর সম্পর্কে ধারণা, সুস্থ এবং আনন্দময় যৌনতা সম্পর্কে জানাশোনা।

লেখাটি ১,৪৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.