আমি ভিন্ন ধরনের নারীবাদী, খারাপ নারীবাদী: ম্যাডোনা

0

কাজল দাস: বিলবোর্ড উইমেন্স অ্যাওয়ার্ড অফ মিউজিক অব দ্য ইয়ার মনোনীত হয়েছেন বিখ্যাত পপ গায়িকা ম্যাডোনা। পুরস্কার নিতে গিয়ে যে কথাগুলো বলেন তিনি, তা তুলে ধরা হলো:

প্রবল নারী বিদ্বেষী মনোভাব, পুরুষতান্ত্রিকতা, সেক্সুয়াল এ্যাবিউজের বিপরীতে যারা ৩৪ বছর ধরে আমার গানকে গ্রহণ করে সংগীত জগতে  আমার ধারাবাহিক পথচলাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছেন তাঁদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

যখন আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, তখন কোন ইন্টারনেট ছিল না, কেবলমাত্র যাদের সামনে গান গাইতাম তারাই আমাকে দেখতে পেতো। জীবন এখনকার চেয়ে অনেক সরল ছিল তখন। আমি যখন তরুণ,  প্রথমবারের মতো মঞ্চে গান করতে আসি।

এটা ছিল ১৯৭৯ সাল, তখনকার নিউইয়র্ক শহর সবার কাছে একটি ভীতিকর জায়গা ছিল। নিউইয়র্কে আসার প্রথম বছরে আমি বন্দুকধারীর সম্মুখীন হয়েছি, গলায় ছুরি ধরে বাসার ছাদে নিয়ে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেই সময় আমার বাসায় দরজা ভেঙ্গে অনেকবার ডাকাতি হয়েছে, একসময় আমি আমার বাসার দরজা লক করা বন্ধই করে দিয়েছিলাম!

তার পরের বছরগুলোতে আমি আমার প্রায় সকল বন্ধুকেই হারিয়েছি, এদের কেউ  গুলিতে, কেউ নেশাগ্রস্ত বা কেউ এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

ভাবতে অবাক লাগে, এইসব অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো কেবল আমাকে একজন দুর্দান্ত সাহসী নারী হয়ে উঠতেই কেবল সাহায্য করেনি, যে কিনা আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে; এই ঘটনাগুলো অনেক সময় আমার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে আমি একজন নারী! আমি দুর্বল বা ভঙ্গুর! এবং আমাদের জীবনে আত্মবিশ্বাস ছাড়া নিজের আর কোন নিরাপত্তা নাই।

নানান ঘটনা তখন আমাকে বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে, আমি মেধাবী, কিন্তু আমার এই মেধার মালিক আমি নই, এমনকি কিছুই আমার নয়। অনেক সময় এগুলো ঈশ্বরের দান বলেও মনে হতো আমার কাছে।

আমার সাথে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, যা এখনো ঘটছে, সব কয়টি বিষয় আমাকে আগের থেকে দৃঢ় করেছে, আমাকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করছে। আজ যখন আমি বিলবোর্ড এওয়ার্ড অফ উইমেন হিসেবে মনোনীত হয়েছি, আমি বার বার ভাবছি একজন নারী হিসেবে সংগীতের দুনিয়ায় আমি কী করেছি! একজন নারী হিসেবে আমার কী বলা উচিত? আমি যখন এই জগতে কাজ করতে আসি, তখন লিঙ্গভিত্তিক চিন্তা আমার মধ্যে ছিল না, আমি নারীবাদী ছিলাম না, কিন্তু এইসব এখন আমাকে ভাবতেই হয়।

আমি অবশ্যই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম ডেবি হারি, ক্রিসি হাইন্ডে এবং এরেইথা ফ্রাঙ্কলিন এর কাছে, কিন্তু আমার আসল অনুপ্রেরণা ছিলেন ডেবি ব্যুই, তাঁর কাছে নারী ও পুরুষের সকল মানবিক গুণ ছিল সমান, এইগুলো আমি তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করেছি। সে আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছে মানুষের কোনো শৃঙ্খল নেই; কিন্তু আমি ভুল শিখেছিলাম, ভুল জেনেছিলাম, অবশ্যই দুনিয়াতে কোন শৃংখল নেই কেবল যদি তুমি ছেলে হও, আর যদি নারী হও তাহলে অবশ্যই তোমাকে শৃংখলিত থাকতে হবে।

এখানে তোমাকে গেইম খেলতে হবে প্রতিনিয়ত, তোমাকে সৌম্য চেহারার হতে হবে, আদুরে হতে হবে, যৌন আবেদনময়ী হতে হবে, কিন্তু কখনোই তুমি এগিয়ে গিয়ে বেশি কিছু করতে পারবে না। এটাকে কেউ মানবে না,তোমার কোন মতামত থাকতে পারবে না এবং কখনোই সংগতিপূর্ণ এই সমাজের বাইরে গিয়ে তোমার কোন মতামত পোষণ করা যাবে না।

এবং অবশ্যই নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সমাজের সামনে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করা যাবে না। তোমাকে তাই হতে হবে যেভাবে পুরুষ তোমাকে চায়, কিন্তু যা প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি, তাহলো একজন পুরুষের তাই হওয়া দরকার যেভাবে একজন নারী তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।

এবং শেষতক যা খুবই গভীর দুঃখজনক, তাহলো তোমার যেন বয়স না বাড়ে, এখানে নারীর বয়স হয়ে যাওয়াটা রীতিমতো একটা পাপ হিসেবে দেখা হয়! যদি তোমার বয়স হয়ে যায়, তোমাকে নিয়ে সমালোচনা হবে, কুৎসা রটানো হবে এবং শেষ পর্যন্ত রেডিও স্টেশনে তোমার চাকরিটা চলে যাবে বয়স বাড়ার কারণে!

আমি যখন বিখ্যাত হয়ে উঠি তখন আমার নগ্ন ছবি ছাপা হয়েছিল ছিল, প্লেবয় এবং পেনথাউস ম্যাগাজিনে আমার ছবি ছাপা হয়েছিল সর্বপ্রথম। একটি আর্ট স্কুলে আমার সেই ছবি তোলা হয়েছিল, সেই সময় আমাকে টাকার জন্য আমার নগ্ন আবক্ষের পেছন প্রদর্শন করতে হয়েছিল সেইসব পত্রিকায় এবং সেগুলো কখনোই যৌন আবেদনের কিছু ছিল না, যদিও আমাকে সুন্দর দেখিয়েছে তখন।

আমাকে বলা হয়েছিল, আমি খুব বিতর্কিত, কিন্তু আমি মনে করি, আমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিতর্কিত বিষয় আমার চারপাশে ছিল। এমনকি এই সব বিতর্কের পরিণামে আমি একা হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ আমি শন পেনকে বিয়ে করেছিলাম। আমার তখন বাজারে কোন কাটতি ছিল না, কদর ছিল না, আমি কোন হুমকি ছিলাম না। তাঁর পরের বছরেই আমি বিচ্ছেদ নিয়ে আলাদা হয়ে যাই…শন পেনের কাছে আমি দুঃখিত। কিন্তু আমি সেটা করেছিলাম।

একই সময়ে বের হয় আমার প্রথম এ্যালবাম সেক্স বুক এবং ইরোটিকা এ্যালবামের কাজ  শেষ  হয়। আমাকে নিয়েই তখন সকল পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের হেডলাইন কাভারেজ ছিল। আমার সর্বনাশ হতে পারে এই রকম সকল সংবাদ আমি তখন নিজের চোখে পড়েছি। আমাকে কোন পত্রিকা আখ্যায়িত করেছে স্বর্গের পরী হিসেবে, আবার কেউ লিখে লিখেছে ডাইনি। একটি পত্রিকা আমাকে শয়তান হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিল।

একটু দাঁড়ান, গায়ক প্রিন্সই তো লেসের পোশাক গায়ে দিয়ে, ঠোঁটে লিপস্টিক আর হাইহিল পরে আর হাতে মদের ব্যারেল নিয়ে এই ডাইনির পাশে ঘুর ঘুর করছিল, তাই নয় কি? ঠিক তাই। আপনারা জানেন, কিন্তু বলবেন না, কারণ সে পুরুষ ছিল! 

এটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, আমি তখন জীবনে প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করলাম, না, পুরুষের মতো নারীর কোন স্বাধীনতাই নেই এই সমাজে। আমি তখন নিজেকে খুব আহত বোধ করেছি, নিজেকে তখন সর্বাঙ্গেই অসাড় মনে হয়েছে নিজের কাছে।

আমি তখন সত্যিকার অর্থে একজন নারী সঙ্গী খুঁজেছি, যে আমাকে বুঝবে, আমার দুঃখকে বুঝবে। আমার তখন বিখ্যাত নারীবাদী ক্যামিলি প্যাগলিয়ার কথা মনে হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন-আমি নারীকে দেখি আমার নিজের যৌনতা দিয়ে, যা তুমি অস্বীকার করো। সুতরাং আমি বললাম, মানি না এসব, আমি ভিন্ন ধরনের নারীবাদী। আমি খুবই খারাপ নারীবাদী।

আমি এখানে সকল নারীদের উদ্দেশ্য যা বলতে চাই, তাহলো, নারীরা মনে করে তাঁরা অনেকদিন থেকে নির্যাতিত হয়ে আসছে এবং পুরুষরা তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। তাঁরা মনে করে একটি চাকরি পাবার জন্য পুরুষ তাঁকে সহযোগিতা করবে। এবং এখানে হয়তো অনেক ভদ্র পুরুষ আছেন যারা নারীকে সহায়তা করছেন; কিন্তু এটা তাঁরা অবশ্যই একজন পুরুষ হিসেবে করছেন না, তাঁরা সেটা করতে পারছেন কারণ তাঁদের হাতে প্রচুর সম্পদ রয়েছে।

সুতরাং নারী হিসেবে আমাদেরকেও নারীদের নিজস্ব সম্পদ তৈরি করতে হবে, এবং আমরা যাতে নিজের সম্পদ দিয়ে অন্যকে সাহায্য করতে পারি। নিজের সঙ্গী হিসেবে একজন দৃঢ়চেতা নারী খুঁজতে হবে, নিজেকে তাঁর সাথে মেশাতে হবে, তাঁর কাছ থেকে শিখতে হবে, তাঁর সাথে সহযোগী হতে হবে, তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে, সহায়তা নিতে হবে এবং তাঁর দ্বারা আলোকিত হতে হবে। নারীর জন্য নারীদের কাজ করতে হবে।

আজকের এই অনুষ্ঠান শুধু আমার জন্য কেবল একটি পুরষ্কার গ্রহণ করা নয়, আমার জন্য এটি অনেক বড় একটি সুযোগ যে আমি আপনাদের সামনে কথা বলতে পারছি। আমার এতোদূর এগিয়ে আসতে যারা পাশে ছিলেন, এটা আমার জন্য নিছক কোনো সহায়তা নয়, এটি তাঁর চেয়েও অনেক বেশি কিছু, আমি আপনাদের বলে বুঝাতে পারবো না যে,  আপনাদের সহযোগিতা আমার জীবনের কত বড় একটি বিষয় ছিল।

কিন্তু যারা সন্দেহপ্রবণ, যারা অস্বীকারকারী, যারা আমাকে নরকে ঠেলে দিয়েছিল, যারা বলেছিল আমি কিছু করতে পারিনি, আমার কিছু করা হবে না বা কোনদিন কিছু করতে পারবো না- তাদেরকে বলছি, আপনাদের এইসব বাধা-বিপত্তি আমাকে অনেক দৃঢ় করেছে, আমাকে কঠোর হতে সহায়তা করেছে, আমাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে সাহস যুগিয়েছে। এটাই আমাকে আজকের একজন ম্যাডোনা বানিয়েছে। আমার সাথে যারা ছিল, অধিকাংশই চলে গেছে। আমি এখনও আছি। প্রতিটা দিনকেই আমি আশীর্বাদ হিসেবে দেখি।

সবাইকে ধন্যবাদ।

লেখাটি ৩,১৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.