বৈরী সংসারও যখন আটকাতে পারেনা মেয়েটিকে – ৪

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী: বহু কষ্টে ঘুম পাড়ানো গেছে ছেলেটাকে। জ্বরটাও একটু ঘাম দিয়ে ছাড়ছে। ক্লান্ত মিতালী বালিশে হেলান দিয়ে ঢুলছিলো। ফোনের ভাইব্রেশনে ধড়মড় করে উঠে বসে। আবার অফিস থেকে ফোন।

: ” হ্যালো! আপা,রাইয়ানের জ্বর কেমন?”
: জ্বরটা সহজে কমছে না, শোয়েব।সারারাত জাগা ভাইয়া।”
: আপা, শারমীন আপা তো পাগল বানায় ফেলছে সবাইরে।প্রমোশন হইছে, আসবেন না আপা? আপনি যে করে হোক, আধা ঘণ্টার জন্য হলেও আসেন। এই রকম খতরনাক বস আমি দেখিনাই রে আপা!

: কী যে করি বলো তো!একটু বুঝাতে পারো কীনা দেখো। নাহলে দেখি, আমি জানাচ্ছি তোমাকে।

বাচ্চা অসুস্থ হলে খুব অসহায় লাগে মিতালীর।রেজা দিব্যি অফিসের ট্যুরে ঢাকার বাইরে চলে গেল। যত ঝড় মিতালীর ওপর দিয়েই যায় সবসময়।
রাইয়ানের দীদা সুফিয়া বেগম তার এক আট আনা সাইজের ব্যাটালিয়ন নিয়ে তাদের সাথেই থাকেন।তারপরও এগারো মাসের বাচ্চা নিয়ে মিতালীর নাজেহাল অবস্থা।

সুফিয়া বেগমের ছুঁচিবাই আছে।ছোট বাচ্চার দায়িত্ব তিনি নিতে পারবেননা। তার কাপড়, বাসনপত্তর কেউ ধরলে ছ্যাঁত করে ওঠেন, এমন নানা হ্যাপা আছে তার। সেই সাথে দিনরাত মিতালীর খুঁত খুঁজে বেড়ান।রাইয়ানের দেখভাল নিয়েও একশো এক কথা শোনান।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

ব্রেস্টফিড করানোর ফলে মিতালীর ক্ষিদে বেড়ে গেছে তিনগুণ। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ফ্রিজ খুললেই ব্যাটালিয়ন কুলসুমকে ডেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেন, ” বাবুর বৌ ফ্রিজ খুলে আবার কী খেলো রে?”
রেজা আর মিতালী ঘরে শুকনো  নাশতা, ফল,দুধ এনে রাখে সবসময়। তা দেখে ওনার মুখটা গোমড়া হয়ে যায়। তাকে সাধলেও ভারি বিপদ। তার মতে এগুলো “অপচয়” আর “ফুটানি” ছাড়া কিছু না!

সেদিন একটা পুরনো রেড কাউ এর টিন এনে মিতালীর খাটের পাশে রেখে বলে গেলেন, “মিতা,তোমার তো খালি ক্ষিদে পায়,বিস্কুট দিয়ে গেলাম, জান ভরে খেও। রোজ রোজ নাশতায় অনেক খরচ তো, তোমার হোক আর বাবুরই হোক পয়সা তো সংসার থেকেই যায়”..
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় মিতালী। টিন খুলে দেখে, সবচেয়ে সস্তা দরের শুকনো, খটখটে টোস্ট বিস্কিট যা কামড়াতে গেলে নতুন করে দাঁতের অর্ডার দিতে হবে।
বাড়িতে সবার আদরে বেড়ে ওঠা মিতালীর মায়ের কথা মনে পড়ে, মা এসব জানলে না জানি কত কষ্ট পাবে!

রাইয়ানের দেখভাল করে যে মেয়েটি, সেই নাজমাকে মার কাছ থেকেই আনা।নাজমার পেছনেও সুফিয়া বেগম চব্বিশঘণ্টা লেগে থাকেন।মিতালী অফিস থেকে ফিরলেই রাজ্যের নালিশ। নিজের ব্যাটালিয়ন নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখেন, রিপিট টেলিকাস্টও বাদ যায়না। ট্রেনিংপ্রাপ্ত কুলসুমের তো যাকে বলে ” সূর্যের চেয়ে বালির তাপ বেশি!”
মালিকের হুকুম ছাড়া এক পাও নড়ে না।
ক’দিন হলো নাজমা মেয়েটা ছুটিতে বাড়ি গেছে।
সেই থেকে মিতালী অফিস আর সংসার সামলাতে চোখে সর্ষে ফুল দেখছে।
একা সব কাজ করে গলদঘর্ম মিতালীকে সাহায্য করার জন্য কস্মিনকালে  একবার কুলসুমকে দেখা যায়, তাও রাইয়ানের

বাবা বাড়িতে থাকলে তখন। এখন তো রেজা নেই, তাই সিরিয়াল দেখায় বিঘ্ন ঘটিয়ে কুলসুমের দেখা পাওয়া- অসম্ভব ব্যাপার। এর মধ্যে একদিন তো রাইয়ানের সকালের ডায়াপার মিতালীকে সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে চেইঞ্জ করতে হয়েছে। গতরাতে রাইয়ানের জ্বর মেপে দেখে তাপমাত্রা প্রায় ১০৩ ডিগ্রী।একদিনের জ্বরে চোখমুখ শুকিয়ে গেছে বাচ্চার।মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে সে। মায়ায় মিতালীর চোখে জল আসতে চায়। এই বাচ্চাটা ফেলে কীভাবে অফিসে যায় সে?

অফিসে খুব জরুরী মিটিং ছিলো। উপস্থিত থাকা দরকার ছিলো। শারমীন আপা নিশ্চই তাকে ভীষণ দায়িত্বহীন ভাবলেন।
সে তো যাবে বলেই তৈরি হচ্ছিলো – বাচ্চাটাকে ধরার জন্য সকাল থেকে কেউ এঘরের ত্রিসীমানায় এলোনা।তখন একটু রাগই হয়েছিলো সে, “কী ব্যাপার কুলসুম, সাহায্য করতে সময় পাস না, তাইনা? একটু বিবেক নিয়ে চল বুঝলি?দিনরাত একই সিরিয়াল চোদ্দবার না দেখে বাচ্চাটাকে ধরলেও তো পারিস! ”
তারপর যা হলো তার জন্য মিতালী প্রস্তুত ছিলোনা। হঠাৎ দেখে সাতসকালে রাইয়ানের দীদা ব্যাগ গুছিয়ে ভাইয়ের বাড়ি রওনা দিচ্ছে।
কুলসুমও তার “পাখি ড্রেস” পরে সুফিয়া বেগমের পিছুপিছু।
মিতালী বলে, “আম্মা, আমার তো অফিসে মিটিং,  রাইয়ানের জ্বর! আপনার ছেলে শুনলেও কী বলবে বলেন তো?”
রাগে ফেটে পড়েন সুফিয়া বেগম, ” আমার যখন যেখানে মন চায় যাব, আমি কী আমার ছেলেকে ভয় পাই? এখনো হাতে-পায়ে বল আছে, বুঝলে? ছেলেকে ভয় করতে যাব কোন দুঃখে??”

মিতালী শাশুড়ির প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখে। তারপরেও কেন যে মিতালীর প্রতি উনি এতো অমানবিক ভেবে পায় না।
নিজের মা এই শহরে থাকলে হয়তো বাচ্চা নিয়ে এতো কষ্ট করতে হতো না! বাধ্য হয়ে অফিসে ফোন করে মিতালী জানায় সে যেতে পারছেনা।খুব ভালো করেই সে জানে এভাবে ছুটি নেয়ার জন্য শারমীন আপা কমপক্ষে আগামী তিন দিন
তার সাথে গম্ভীর আচরণ করবে। ইতিমধ্যে দুইবার ফোন এসে গেছে, তার মানে হলো  যাই ঘটুক তাকে একবার অফিসে যেতেই হবে।
নাহ্! এভাবে হয়না।
চাকরিটা আবার ছাড়তেই হবে।

এর মাঝে রেজার ফোন আসছে অনবরত। “আমাকে কী কাজ করতে দেবেনা তোমরা?আমি নেই, মা কীভাবে বাড়ি ছাড়ে মিতা? তুমি তো বয়সে ছোট,  তোমার তো উচিৎ ছিলো “সরি” চেয়ে তাকে থাকতে বলা!.. শোনো মিতা, তোমার মতো ফালতু চাকরি আমার না, আমি একটা ইম্পরট্যান্ট কাজে আছি। মাকে যে তুমি রেসপেক্ট করোনা, উনি তা বোঝেন।.. এখন তুমি কী করবে তোমার ব্যাপার।আমাকে কনসেন্ট্রেট করতে দাও।”

মিতালী অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করে, সারাদিন অফিস করে, বাচ্চা সামলে, যে লোকটার জন্য সে যত্ন করে রান্না করে, তোয়ালে থেকে ট্রাউজার পর্যন্ত গুছিয়ে রাখে, যার সব টেনশন সে নিজের করে নিয়ে আশ্বস্ত করে -আজকে তার বিপদে সেই লোকটার কোনো কথার মধ্যে কোথাও মিতালী আর রাইয়ানের জন্য উদ্বেগ নেই!রাইয়ানের শরীর খারাপ নিয়েও সে চিন্তিত না। সে শুধু ভাবছে তার মা এবং তার অফিস নিয়ে এবং মিতালীর চাকরিটাও তার কাছে নিতান্তই “ফালতু” কাজ!

এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় মিতালী।
শারমীন আপাকে কল দেয়,
: স্লামালিকুম আপা,আমি যদি আমার ছেলেকে সাথে নিয়ে আসি, প্রবলেম হবে? আসলে আর কোনো অপশন নেই।”

: নট অ্যাট অল মাই ডিয়ার! আই অ্যাপ্রিশিয়েট ইয়োর সিনসিয়ারিটি!  প্লিজ ডু কাম। জাস্ট ফর টেন মিনিটস! সবাই অপেক্ষা করছে তোমাকে কনগ্রাচ্যুলেট করবে, সেলিব্রেট করবে।
লেট’স বি প্রাউড অফ ইউ।

সংসারে সবার চরম  অসহযোগিতার মধ্যে দিয়ে চাকরিটা চালিয়ে যাচ্ছে মিতালী। এখন সে ট্রেনিং সেশনে অসংখ্য নারীদের জন্য মোটিভেশনাল স্পিচ দেয়, কীভাবে ধীরেধীরে সে বুঝতে শিখছে, এ সমস্যা তার একার নয়, তার কাজটা ফালতু কাজ নয়।
ওয়ার্কিং মাদার হবার যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন শত শত নারীদের পথ চলতে হচ্ছে – মিতালীও তাদেরই একজন। তার  মতো বাইরে কর্মরত নারীদের কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া প্রতিটি সকাল একেকটি আলাদা যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধটাকে সাফল্যের গল্পে টার্ন নেয়াটা নির্ভর করে মিতালীদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর মনোবলের ওপর। চ্যালেঞ্জটা নিতে পারলে প্রত্যেকদিনই নতুন সূর্যোদয়।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.