‘প্রাক্তন’ দেখার বিরক্তি

কাবেরী গায়েন: ফেসবুকে না এলে ‘প্রাক্তন’ দেখা হতো না। জানাও হতো না এই নামে এক ছবি আছে। তো দেখে ফেললাম। এই ছবির সবচেয়ে ভালো হলো ব্যান্ডের গানগুলো। আর সবচেয়ে অসহ্য হলো এই ছবির থীম। শুরুতে বলেছে, রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত। সেই স্মার্ট কবিতার এই রদ্দিমার্কা পরিণতিতে বিরক্ত হয়েছি।
একই পরিচালকের ‘বেলাশেষে’ দেখে মনে হয়েছিলো ছবির থিম ‘আমার মা আমার বাবার কাজের বুয়া’।

আর এই ছবি দেখে মনে হলো, বিদুষী, প্রফেশনাল নারীদের স্বামী ধরে রাখার জন্য শুধু গার্হস্থ্য সামলানো চতুর স্ত্রী’র টিপস। আর বলিহারি সেই টিপস বা ঊপদেশনামা:
১। সন্তানের নাম রাখতে হবে শ্বশুর বাড়ির ইচ্ছায়;
২। শ্বশুরবাড়ি যা বলে সেই অনুযায়ী চলতে হবে বিয়ের পরে পাঁচ বছর। তাহলেই স্বামী আর শ্বশুরবাড়ি হাতের মুঠোয়।
৩। স্বামীকে মাসে একদিন পেলেই চলবে।
৪। সন্তান ধারণের পর থেকে নিজেই চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।
৫। মেয়ের দেখভালের জন্যই মা-নামের বুয়া।
৬। স্বামীর জীবন সম্পর্কে কোন কৌতুহল না থাকা। বলা তো যায় না বাবা, কার কোথায় কোন ব্যথা। বটে!

আর এসব বয়ান শুনে একজন মেধাবী-সফল স্থপতি নিজেকে অকিঞ্চিতকর ভেবে অনেক কিছু শিখলেন জেনে চোখ মুছতে মুছতে বিদায় হলেন। রাবিশ!

ওদিকে প্রাক্তন স্বামী-জান স্ত্রী কাশ্মীর বেড়ানোর টিকেট কেটেছিলেন বলে লম্ফঝম্ফ দেয়ায় সেই টিকেট ছিঁড়ে ফেলতে হয়েছিলো, নতুন বউয়ের সামাজিকতা মানতে গিয়ে গর্ভপাত হয়েছিলো, চাকরিতে পদোন্নতি হওয়ায়
কটুবাক্য শুনতে হয়েছিলো। আবার তিনি আধুনিক স্বামীও বটে। তাই বউ একেবারে কিছু করবে না, তেমন নয়, তবে কাজে বেশি সময় দিতে পারবে না। স্থপতি বউ কলকাতা ব্রাঞ্চের হেড হয়ে আনন্দের সংবাদ দিতে এলে তাকে খোঁচা দিয়ে চাকরি ছেড়ে দেবার মতো মানসিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। ইত্যাদি।

এবং সেই স্বামীর সাথে বহু বছর পরে ট্রেনের কামরায় দেখা হলে স্বামী জানাবেন তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট কম শিক্ষিত গৃহবধু দ্বিতীয় স্ত্রীর ভালোবাসা, আব্দারের কাছে তিনি বশ মেনেছেন। এখন তিনি বেগুন কেনেন। তিনি কী ভীষণ সুখী! একটি মেয়ে হয়েছে। সেই মেয়েই তার জীবনের সব। অথচ তাদেরও তো একটি বাচ্চা হবার কথা ছিলো যে তার এবং তার পরিবারের অবহেলায় জন্মাতেই পারেনি।

নির্মম লেগেছে, দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে হানিমুন করতে সেই কাশ্মীরেই গেছেন তিনি। কোন জন্মদিনেই সারপ্রাইজ না দিয়ে থাকেননি। প্রাক্তন স্ত্রী আর কন্যার সামনে দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে ‘প্রাইভেট সময়’ কাটাতেও বাধেনি ট্রেনের কামরায়। অথচ এহেন ব্যক্তির জন্য গুণী প্রথম স্ত্রীর কান্না থামে না। নিজের জেদকে দায়ী করতে করতে তিনি চলে যান।

এই যে নিজেকে দায়ী করা দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও, এও পুরুষতন্ত্রের আরেক অস্ত্র। নারীর নিজেকে নিজে দায়ী করা্র মধ্য দিয়ে ক্ষমতাবান নারীর নিজের ইচ্ছা-পছন্দ-ভালোবাসা-আকাংক্ষা সবকিছুকে অস্বীকার করানোর এই চল বহু প্রাচীন। শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই শোষিতকে দিয়েই নিজেদের দোষ স্বীকার করায়। চোর ধরে চোরকে যেমন কান ধরে উঠবস করানো হয় এবং বলানো হয় সে চোর, এই সম্পর্ক ভাঙ্গার পেছনেও দীপার সব বিসর্জনকে বাদ দিয়ে তার জেদকে দায়ী করে তাকে কাঁদিয়ে বিদায় করা হয়। এবং আবহ তৈরী করা হয় যেনো এই সম্পর্ক ভঙ্গের জন্য সেই দায়ী। তার জেদই দায়ী। অথচ পুরুষটির কোন অনুতাপ নেই, তিনি সংসারী হয়েছেন, সুখী হয়েছেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য তার কন্যাকে পেয়েছেন।

কাবেরী গায়েন

পরাজয়ের, অসুখীত্বের যতো বিষাদ- সব বরাদ্দ মেয়েটির জীবনে। অতএব প্রফেশনাল মেয়েরা তোমার চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন, হীনমন্য স্বামীর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তোমার কাজের জগত এবং প্রেমের ক্ষেত্রে তোমার আকাংক্ষাকে বলি দাও। নইলে বিয়ে তোমার টিকবে না।

অন্যদিকে যে কম শিক্ষিত নারী শ্বশুরবাড়ি আর স্বামী ধরে রাখার টিপস দিলেন, তিনি কিন্তু পুরুষতন্ত্রের কথাগুলোই বললেন, বা তাকে দিয়ে বলানো হলো। এভাবেই পুরুষতন্ত্রের বিধিবিধান দুই নারীকে দিয়ে প্রকাশ করা হলো। একজন যিনি মানেন নি, তিনি শাস্তিপ্রাপ্ত এবং অনুতপ্ত। অন্যজন যিনি মেনেছেন, তিনি পুরুষতন্ত্রের পুরস্কারপ্রাপ্ত। তাই তিনি নিয়োজিত এসব পুরস্কারপ্রাপ্তির গোপন ঠিকানা বাতলে দেয়ার কাজে।

আর এই রদ্দিমার্কা কথা বলা হয়েছে চমৎকার অভিনয়, সিনেমাটোগ্রাফি, চমৎকার গান আর দারুণ সেট ব্যবহার করে। জি-বাংলা, স্টার জলসার নারীকে বশে আনার সিরিয়ালের সাথে এই সিনেমার পার্থক্য কেবল এই কারিগরি দিকগুলোতে। নারীর জন্য রাংতায় মোড়া পুরুষতন্ত্রের আদি এবং অকৃত্রিম জীবনবিধান এসব ভেলকির মধ্য দিয়ে ভালোই বিক্রি হয়।

আমিও লিখলাম। ধ্যাত্তেরি!

শেয়ার করুন:
  • 13.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    13.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.