পূজা সেরে উঠছে, কিন্তু আতংকিত পরিবার

সুপ্রীতি ধর: ছোট্ট, চঞ্চল মেয়ে পূজা। শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি তাকে, গায়ের শিশুসুলভ গন্ধটা পাবার জন্য মুখ গুঁজি বুকে, একটু উষ্ণতা পাবার চেষ্টা করি।

ছোট্ট মা আমার। কী সুন্দর তার হাসি, চোখের পাতাগুলো ঢেউ খেলানো, একেবারে সাক্ষাত দেবী। কিছু বললেই হাসে, শুধুই হাসে। এরকম একটি ফুলের কুঁড়িকে কেউ ক্ষতবিক্ষত করতে পারে, আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায় ভাবতেই। গলা ধরে আসে।

ওর কথাগুলো এখনও জড়ানো। পূজার দিদা বললেন, ওরা গলায় ফাঁসের মতো দেয়া হয়েছিল, ব্লেড দিয়ে কাটা হয়েছিল বলে ওর কথা বলতে অসুবিধা হয়। টলোমলো পায়ে হাঁটে। ধরে ধরে হাঁটাতে হয়। ডাক্তাররা বললেন, সেরে উঠছে সে। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। সবগুলো অপারেশনই ভালোয় ভালোয় হয়েছে।

ফিস্টুলা অপারেশনের পর ডাক্তাররা চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু না, সবার চিন্তা দূর করে পূজা সেরে উঠছে। 

ওর মানসিক সমস্যা হবে না তো! নিজের জীবন থেকে আমি জানি, শারীরিক ক্ষত সেরে উঠে একসময়, কিন্তু মানসিক? থেকে যায় আজীবন। আর এইদেশে তো ক্ষত সারাবার কোনো উপায়ই নেই। চারদিক থেকে বিচ্ছুর মতোন সমাজ লেগে থাকে ক্ষতিগ্রস্তের সাথে, বার বার মনে করিয়ে দেয, ‘মেয়ে, তোমার কি মনে পড়ে? কী হয়েছিল তোমার? কী করেছিল ওরা?’ ক্ষতটাকে দগদগে ঘা বানাতে ওস্তাদ এইদেশের মানুষ। তাই আমি একটি প্রশ্নই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে করি।

ডাক্তার আপা, ওর ভিতরের ভয়টা আর নেই তো?

ডাক্তার আপা আশ্বাস দেন, না, এখন অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। যখন নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন তার অবস্থা ছিল খুবই করুণ, মুমূর্ষুপ্রায়। সেখান থেকে আজকের পূজাকে দেখুন, কী সুন্দর। আদর কেড়ে নিচ্ছে সবার।

আমার চোখ সরে না সুন্দরের উপর থেকে। কপালে লাল টিপ পরেছে, পায়ের নখেও নেলপলিশ। ব্যাগ খুঁজে একটা লিপস্টিক বের করতেই ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠে। কাছে টেনে নিতেই সে ঠোঁট দুটোকে এমন করে এগিয়ে দিল, আমি লিপস্টিক দিতেই সে দুই ঠোঁট উল্টে আধো আধো কথা বলতে শুরু করে। উপস্থিত সবাই হেসে খুন তার এই কীর্তিতে। আমাদের ছোটবেলাকেই স্মরণ করিয়ে দেয় আমার এই ছোট্ট মা।

পার্বতীপুরে ধর্ষণের শিকার সেই পাঁচ বছরের মেয়েটিই আজকের এই পূজা। দু’মাসের চিকিৎসায় অনেকটাই সেরে উঠেছে। নির্যাতনে তার পায়ুপথ, মূত্রনালী, যোনিপথ, সবগুলো নালী ছিঁড়ে গিয়েছিল, আমরা যাকে ফিস্টুলা বলি। ডাক্তার জানান, অপারেশনের পর সে ভাল রেসপন্স করছে, হয়তো সময়ের ব্যবধানে পুরোপুরিই সেরে উঠবে। কিন্তু এজন্য চাই প্রয়োজনীয় সেবা-শুশ্রুষা, চিকিৎসা।

এসব শুনি আর ভাবি, কে দেবে এই চিকিৎসার খরচ এই গরিব পরিবারটিকে?

আমি নিশ্চিত, বাড়ি ফিরে গেলে ওর এই চিকিৎসা সম্পূর্ণই ব্যাহত হবে। তার ওপর ওই ধর্ষক সাইফুল এখন জেল হাজতে আছে। মামলার স্বার্থে পূজাকে যদি হাজিরা দিতে হয়, যে কিনা এখনও হাঁটতেই পারে না, ডায়াপার পরিয়ে রাখতে হয়, তাহলে ওর ক্ষতিটা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যেতে পারে, এমন আশংকাও আছে।

আর এই যে ডায়াপার ব্যবহার, ভালো, পুষ্টিকর খাবার, ফিজিওথেরাপি এসবই তো টাকার ব্যাপার। দরিদ্র বাবা পিকআপ চালায়। মা আবারও অন্ত:সত্ত্বা। এলাকায় ফিরতে কিছুটা ভীতিও কাজ করছে তাদের মনে। দিদা বললেন, ধর্ষক সাইফুলের পরিবার আছে, ওর নিজস্ব লোকজন আছে। কে কোথায় কী করে বসে, ঠিক তো নেই। তার ওপর সংখ্যালঘু। বিপদ চারদিকে ওঁৎ পেতে আছে।

মনে থাকা প্রশ্নটা করেই ফেলি পূজার দিদাকে। আচ্ছা, পূজাকে যদি বিদেশে কেউ দত্তক নিতে চায়, আপনারা দেবেন? ভেবে দেখুন, ওর পার্বতীপুর ফিরে যাওয়াটা ঠিক হবে না মোটেও। ওর একটা সুস্থ জীবন চাই সবার আগে, সুন্দর শৈশব, কৈশোর-তারুণ্য চাই। ভেবে দেখুন। দিদা ভাবেন, পর মুহূর্তেই বলেন, এরকম যদি হয়, খুবই ভালো হয়। আমরা চাই, মেয়েটা সুন্দর হয়ে বেড়ে উঠুক, সবদিক থেকে সুন্দর। পড়া করবে, বড় হবে, অনেক বড়।

আস্তে করে বলি, চেষ্টা করবো। যদি পাই এমন কাউকে, অবশ্যই জানাবো। সত্যি বলতে কী, আমার সামর্থ্য থাকলে আমি নিজেই ওকে মেয়ে করে নিয়ে আসতাম। এতোটাই মায়ায় জড়িয়েছে সে আমায়, কোলে বসে সে যখন দুহাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো, মনে হলো, আমিই ওর মা।  

পূজা এখন সব মনে করতে পারে। ও স্পষ্ট করেই বলতে পারে, কে তাকে ব্যথা দিয়েছিল, কীভাবে দিয়েছিল। ওর এই স্মৃতিটা যেন দু:সহ হওয়ার আগেই ওকে সুস্থ করে তুলতে পারি।

ধর্ষক সাইফুল

কিন্তু সবার আগে আমাদের সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তাহলো ধর্ষক সাইফুলের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শোনা কথা, জমিজমা বিক্রি করে দিয়ে সে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তা যেন না হয়, সেজন্য সরকারের সর্বোচ্চ সংশ্লিষ্ট মহল পর্যন্ত আমাদের পৌঁছাতে হবে।

সব ধর্ষক ধরা পড়ে না, কাউকে কাউকে ছেড়েও দেয় এই দেশ, এই সমাজ, কিন্তু সাইফুলকে দিয়েই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা চালু করতে হবে আমাদের। এবং যত দ্রুত সম্ভব। তবে যদি কিছুটা হলেও আমাদের মেয়েরা রক্ষা পায় ধর্ষণের হাত থেকে। পূজার পরিবারেরও এটাই এখন একমাত্র চাওয়া, ধর্ষক সাইফুলের বিচার। কুঁড়ির মতো মেয়েটাকে ক্ষতবিক্ষত করার শাস্তি যেন পায় সাইফুল।

এই কথাটি আমাকে বলছিলেন ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের একজন চিকিৎসকও। তিনি বললেন, আপা, আপনারা যারা মিডিয়ায় আছেন, আপনারা একটু বলিষ্ঠভাবে বিষয়টা একটু ধরেন, এভাবে চলতে পারে না কোনো দেশ। আমি মুগ্ধ হই উনার কথায়, মুগ্ধ হই ওসিসি’র প্রতিটা মানুষের স্নেহ, ভালবাসায়। তারা সবাই পূজাকে এমনভাবে ভালবেসেছেন আর পূজাও ফিরিয়ে দেয়নি তাদের আবেগকে। সেও জড়িয়ে নিয়েছে সবাইকে।

ভালো থাকুক পূজা, ও সেরে উঠুক দ্রুত, এটাই চাই।  

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.