মানসিক নির্যাতন – এক নীরব ঘাতক!

ড. ইশরাত মাহেরিন জয়া: এই বছর আমি বিজয় দিবসে দেশের মাটিতে ছিলাম, তোপধ্বনি দিয়ে দিনের শুরু। খুব ইচ্ছা হলো নারীর পরাধীনতা নিয়ে লিখি। বহু বছর ধরে দেশের বাইরে থেকে এতটুকু বুঝেছি যে অনেক বাঙালী মেয়ে অনেক সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। বেশ কয়েক বছর আগে আমাকে একজন তার অনেক মনো:কষ্টের কথা বলেছিল। আমি খেয়াল করেছিলাম মেয়েটিকে কেউ সাহায্য করে নাই। আমি নিজেও তেমন কিছু করতে পারিনি।

অন্য মানুষের পারিবারিক ঝামেলায় কেউ জড়াতে চায় না, আর মানসিক অত্যাচার খালি চোখে দেখাও যায় না, শুধু তাই নয় আমরা ছোটবেলা থেকেই অনেক ধরনের নির্যাতনকে স্বাভাবিক ভেবে বড় হই।

ছোটবেলায় স্কুলে পড়া না পারলে শাস্তি হিসেবে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কানে হাত দিয়ে বেঞ্চের উপর দাঁড় করানো অথবা সবার সামনে বকা দেয়াকে আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি। কিন্তু চিন্তা করলে এগুলো সবই দুর্বল প্রতিপক্ষ শিশুর উপর সবল শিক্ষকের অত্যাচার। সাইকোলজিস্টদের মতে, “এবিউজার ” আর “ভিক্টিম ” দুই পক্ষই অনেক সময় বুঝতে পারে না তারা একটা অস্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে আছে। কিন্তু তাই বলে কি এটা ক্ষতিকারক নয়?

দুঃখের বিষয় আমরা অনেকেই জানি না যে মানসিক নির্যাতন থেকে অনেক শারীরিক অসুস্থতা যেমন বিষন্নতা, অ্যাংজাইটি বা আর্থ্রাইটিসের মতো কঠিন অসুখ হতে পারে। এছাড়া আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার কারণে মানুষ এধরনের ক্ষতিকারক সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে না। একসময় স্বামী তার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চায়, আর স্ত্রী বিশ্বাস করে এমন আর হবে না। কিন্তু কদিন পর একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে ! মেয়েটি, “সাইকেল অফ এবিউজ” নামক এক ক্ষতিকারক চক্রে আটকে যায়।

কী ধরনের ব্যবহার মানসিক নির্যাতনের মধ্যে পড়ে?

১.বিচ্ছিন্নকরণ: মানসিক নির্যাতনের প্রথম ধাপ হলো মেয়েটিকে তার পরিবার, বন্ধু বান্ধব কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। দেশের বাইরে এটি খুব সহজ একটা কাজ, কারণ অনেক মেয়ে এমনিতেই পরিবার থেকে দূরে আছে। এই অবস্থায় তার যদি কোনো বন্ধু না থাকে তাহলে তার কোনো সাপোর্ট সিস্টেম থাকছে না। অসহায় হয়ে অনেক মেয়ে অনেক দিনের জমে থাকা ক্ষোভ স্বল্প পরিচিত মানুষের সামনেও বলে বসতে পারে। তখন তাকে নিজের স্বামীর নামে বদনাম করছে ভেবে উল্টো দূরে ঠেলে না দিয়ে তার হতাশার কথা শোনা উচিৎ। আজকালকার যুগে কোনো মেয়েকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে বলাটাও বিছিন্নকরণের মধ্যে পড়ে। এটা তাকে খানিকটা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা। বাক স্বাধীনতা আর চিন্তা শক্তির স্বাধীনতা একজন মানুষের মৌলিক অধিকার।

২. গালিগালাজ করা: আমরা অনেক সময় ভাবি স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে তর্ক হবে, একটু চিৎকার চেঁচামেচি হবে। কিন্তু এইটা যদি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়? যদি সে আপনাকে এমনভাবে উত্যক্ত করে যে আপনি উল্টো উঁচু স্বরে কথা বলতে বাধ্য হন, তাহলে এটা স্বাভাবিক না। এই গালিগালাজ যদি অন্য মানুষের সামনে হয় কিংবা নিজের বাচ্চাদের সামনে হয়, সেটা ভয়াবহ। যদি প্রতিটা কাজে স্ত্রীকে মাথায় রাখতে হয় যে সে যেন তার স্বামীকে রাগিয়ে না দেয় তাহলে বুঝতে হবে, সে মানসিক নির্যাতনের শিকার।

৩. মিথ্যা কথা বলা আর মিথ্যা অপবাদ দেয়া: মিথ্যা বলে খুব সহজেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় আর তখন অপর পক্ষ খুব অসহায় হয়ে পড়ে। কোনো দুর্ব্যবহার করে পর মুহূর্তে তা অস্বীকার করাও এই ধরণের ব্যবহারের মধ্যে পড়ে। কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়া ভয়ঙ্কর মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। বাজে ভাবে সমালোচনা করার একটা উদাহরণ দেই – “তুমি ভালো মা না “- এই ধরনের বাজে অপবাদ। নিজের সন্তানকে সবাই ভালোবাসে কিন্তু সন্তানের জন্য আপনি কি করছেন আর কি করলে যথেষ্ট হতো তার কিন্তু সীমারেখা নাই। এই ধরণের কথা একজন মানুষকে চরম হতাশায় নিমজ্জিত করবে।

৪. সন্দেহ প্রবণতা: অনর্থক সন্দেহ একটা মানসিক রোগ। সাধারণত অতি চালাক মানুষ, “আমিতো তোমাকে খুব ভালোবাসি, তাই তোমাকে কারো সাথে হেসে কথা বলতে দেখলে সহ্য করতে পারি না ” এই ধরণের ফালতু যুক্তি দিবে। কিংবা সমাজে এমন মানুষও থাকবে যারা বলবে “এই মেয়েকে কেন সন্দেহ করছে? নিশ্চয়ই এর কোনো দোষ আছে”। এক্ষেত্রে মেয়েরা অনেক সময় এই বিষয় গুলোকে “ভিকটিম সেমিং(victim shaming) ” এর ভয়ে চেপে থাকে।

৫. বিয়ের পর লেখাপড়া বা চাকরি করতে না দেয়া বা এ ব্যাপারে সহায়তা না করা: আজকাল অনেক মেয়ে চাকরি করে, তাদের অনেককেই বিয়ের পরে লেখাপড়া করতে হয়, কাজের প্রয়োজনে ট্যুরে যেতে হয়। সংসারে বাড়তি উপার্জন ছাড়াও, ক্যারিয়ার আর চাকরি একটা মেয়ের অধিকার। এইজন্য তাকে যেই মা বাসায় আছে তার সাথে তুলনা করে হেয় করা অবশ্যই মানসিক অত্যাচারের মধ্যে পড়ে।

৬. সন্তানের সব সিদ্ধান্ত একা একা নেয়া: সন্তানের কোনো ব্যাপারে মায়ের অভিমতকে গুরুত্ব না দেয়া অবশ্যই মানসিক অত্যাচারের মধ্যে পড়ে। কিছু কিছু বিষয়ে মাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ।

৭. টাকা-পয়সা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ: একটা সংসারে ছেলে এবং মেয়ে দুইজন মানুষই সব বিষয়ে একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। যদি দেখা যায় কোনো একজন এই বিষয়ে একাই সব অধিকার ফলাচ্ছে, তাহলে সেটা অন্যায়।

৮ বাহ্যিক সৌন্দর্য আর পোশাক নিয়ে মন্তব্য: কোনো মেয়েকে তার বাহ্যিক রূপ সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলা, শুধু তাই না, একজন মেয়ে কী পরবে তাতে জোর-জবরদস্তি করা, কাউকে হিজাব পরতে বাধ্য করা, সংক্ষিপ্ত কাপড় পরতে বাধ্য করা কিংবা “এই জামায় তোমাকে ভালো দেখাচ্ছে না, এটা তুমি পরতে পারবে না” এগুলো কোনোটাই স্বাভাবিক না। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ তার পোশাকের ব্যাপারে নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে।

৯. প্রতি মুহূর্তের হিসেবে চাওয়া: “অফিসে কী করছো, বাসায় কী করছো?” প্রতি মুহূর্তের হিসেব যদি আপনার স্বামীকে দিতে হয়, তাহলে তা অত্যন্ত বিরক্তিকর। একটা অফিসেও কিন্তু মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট করে উন্নয়ন বাড়ানো যায় না, বরং অতি নিয়ন্ত্রণের কারণে কাজের আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়।

১০. অন্য মানুষের সামনে বিব্রত করা: অন্য মানুষের সামনে অপমান করা আর হাসাহাসি করা মানসিক নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। মনে করেন আপনি সেলাই করতে পছন্দ করেন, কিন্তু এটা অন্যদের কাছে খুব ক্ষুদ্র কিছু হলেও আপনার কাছে প্যাশন। আপনাকে যে ভালোবাসবে সে আপনার প্যাশনকেও শ্রদ্ধা করবে, আপনার পোষা কুকুর আর বিড়ালকেও আদর করবে। কিন্তু এটা না করে আপনার শখকে হেয় করলে আপনাকে আঘাত করা হবে।

১১: আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা: কবি ও লেখক গুলতেকিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাকে তার প্রাক্তন স্বামী বলেছিল, “তুমি ইংরেজি সাবজেক্ট পারবে না”, তার ভাষ্যমতে তাকে “আন্ডার এস্টিমেট করা হতো”। এই ধরনের কথা দিয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়া হয়।

১২. “সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট”: সবসময় মুখ কালো করে থাকা আর অসুখী চেহারা করে থাকা, কথা না বলা অথবা স্ত্রীকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। এতে মেয়েটি সব সময় অপরাধবোধে ভুগে, ভয়ে ভয়ে থাকে, সে ভাবে সে এমন কিছু করেছে যাতে সে এমন ব্যবহার পাচ্ছে। কিন্তু তাকে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না সে কী করেছে, আর তাকে বিনা অপরাধে শাস্তি ভোগ করতে হয়। সব থেকে দুঃখজনক অনেক সময় নিজের দুর্নাম শুনতে শুনতে মেয়েটি বিশ্বাস করে বসে, সে আসলে এমন ব্যবহারই পাওয়ার যোগ্য, সে নিজেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

উপরে যা উল্লেখ করেছি তার অনেক কিছুই মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েটাকে সন্তানের জন্য “সহ্য করো, ধৈর্য ধরো” উপদেশ দেয়া হয়। কিন্তু একটা শিশুর দেহ আর মনের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সুস্থ পরিবেশ জরুরি। সমাজের কিছু মানুষের বাঁকা আঙ্গুল সব সময় মেয়েটার দিকেই থাকে। তোমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে? কিংবা তোমার কোনো ভুল হচ্ছে। কিন্তু এই উক্তি ভুলে যাওয়া উচিত নয়,

“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,

তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সময় দহে।”

তাই আপনার আশেপাশে কোনো মেয়ে এরকম অন্যায় ব্যবহারের শিকার হলে, তাকে সাহায্য করুন। তা না হলে মানসিক অত্যাচারের শিকার কোনো মানুষের দৈহিক না হলেও মানবিক মৃত্যুর জন্য আপনারা সবাই দায়ী থাকবেন।

লেখক: তড়িৎ প্রকৌশলী, ডালাস টেক্সাস

শেয়ার করুন:
  • 14.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    14.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.