দেশ মানে মায়ের মুখে শোনা গল্প

মারজিয়া প্রভা: দেশ আমার কাছে কখনোই কোন বড় ইস্যু নয়। আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার আমার বাবা-মায়ের হাসিখুশি মুখ, আমার ছোট্ট পরিবারের বড় বড় সংগ্রাম করে বেঁচে থাকাটা। আর ঠিক সেভাবেই দেশ আমার কাছে ধরা দেয়।

আমার মায়ের মুখে আমি বিজয় দিবসের গল্প শুনি। আজও বিজয় দিবস এলে আমার নানাবাড়িতে পোলাও রান্না করা হয়। কারণ ঠিক এর দুইদিন আগে সেই ৭১ সালে আমার নানু বেঁচে ফিরে এসেছিল পাকসেনাদের গুলির মুখ থেকে। কিন্তু আমার মায়ের মিজু মামার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল এর দুইদিন আগেই। আমার ছোট্ট মায়ের দেখা সেই গোলাগুলির গল্প শুনেই এই দেশকে আমার চেনা। আমার নানীর ওপর হামলা করতে যখন পাকবাহিনী ভিড় করেছিল বাসায়, কিভাবে নানী বেঁচে যায় তাদের লালসার হাত থেকে, তা শুনতে শুনতেই আমার বড় হওয়া।

এই বড় হওয়াতে কে ক্ষমতায় এলো গেলো কিচ্ছু জানি না। আমি শুধু ইকবাল রোডে মায়ের কথা অনুযায়ী এক লালবাড়ি খুঁজে গিয়েছি। যেখানে বাস করতো আম্মুর প্রিয় চাচি, রিয়ার আম্মু। পাকবাহিনীরা যাকে ইচ্ছেমতো নিজের স্বামী আর বাচ্চার সামনে রেপ করেছিল।

আমি আম্মুর মুখ দিয়েই শুনে চলি, তার বান্ধবী লিনার আব্বুর গল্প। যে ঐ লাইন থেকে ফিরে আসেনি। যার রক্তাক্ত মাথা আর চেনা যায়নি। কয়েকমাস আগে চিটাগাং এ দেখা মুক্তিযোদ্ধা রমা মাসীর গল্প আমাকে দেশ চিনায়। হেডমিস্ট্রেস রমা মাসী ছাড় পাননি পাকিস্তানিদের হাত থেকে। পাকিস্তানি ধর্ষক ধর্ষণের পর রমা মাসীর দিকে আর মুখ তুলে তাকাতে পারেনি, শুনেছি। 

দেশ আমার কাছে বড় কিছু না! কিন্তু আমার পরিবার, আমার চেনাজানা পরিমণ্ডলে এই মানুষগুলোর টুকরো গল্পগুলো আমার কাছে অনেক বড় কিছু। এরাই আমাকে দেশ চিনিয়েছে তিলে তিলে। আমি খুব একটা রাজনীতি নিয়ে থাকি না। অবশ্য অনলাইন পত্রিকা পড়ি। খবর নিয়মিত রাখি। কিন্তু কে কোন দলে এলো গেলো আমি সেটা বুঝি না। 

আমি শুধু জানি রিয়ার আম্মু, কিংবা রমা মাসীর ঐ অবর্ণনীয় কষ্টের দাম আমরা ৪৫ বছরে কিছুই দিতে পারিনি।

দেশ রাজনীতি কোনদিন বুঝবো কীনা জানি না। কিন্তু আমার চারপাশের এই দিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বপ্ন আগামী ৪৫ বছরে পূরণ করার চেষ্টা করে যাবো। যতোটুকু পারি। abstract ভালোবাসা আমার কোনকালেও পোষায় না। আমি বস্তুবাদী মানুষ। তাই দেশকে ভালোবেসে যাই structurally. 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.