‘বিউটিফুল’ ভার্সেস ‘এভারেজ’  

সুরাইয়া আবেদীন: আচ্ছা ধরুন আপনি বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে কিংবা নিউ মার্কেটে গেলেন কেনাকাটা করতে। পরিচিত গেট, সব সময় যান, কিন্তু এবার ঢোকার সময় হঠাৎ দেখলেন চিরচেনা সেই পথে ঢোকার জন্য দুইটা দরজা বসানো হয়েছে।

এক দরজার উপরে বড় করে লেখা ‘Beautiful’ এবং অপর দরজায় লেখা  ‘Average’নিজেকে যেটা মনে করেন অর্থাৎ ‘ Beautiful’ নাকি ‘Average’ সে ভাবনা অনুযায়ী দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকবেন।

কোন পথে যাবেন আপনি?  

সুরাইয়া আবেদীন

Dove এর ‘Choose Beautiful’ নামে একটা ক্যাম্পেইনের কমার্শিয়াল দেখেছিলাম। সানফ্রানসিসকো, সাংহাই, লন্ডন,  দিল্লি আর সাও পাওলো- এ কয়টা শহরে তারা এ ক্যাম্পেইন করেছিল। এসব শহরের নারীরা নিজের সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে, তা দেখাই ছিল মূল উদ্দেশ্যমার্কেটে কিংবা নারীদের যাতায়াত আছে এমন জায়গায় প্রবেশ পথে দুইটা সাইনবোর্ড লাগানো ছিল। একটায় লেখা ‘Average’ আরেকটায় লেখা ‘Beautiful’ , অর্থাৎ নিজেকে ‘বিউটিফুল’ মনে করলে বিউটিফুলের পথ দিয়ে ঢুকবে আর যদি এভারেজ মনে করে তাহলে এভারেজ দিয়ে!   

Dove এর এই ক্যাম্পেইনের ফলাফল ছিল খুব হতাশাজনক! ৬১% অ্যামেরিকান, ৮৬% চাইনিজ, ৯৬% লন্ডনের, ৫৬% ইন্ডিয়ান, ৭২% ব্রাজিলিয়ান- নারী নিজেদের লুক সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন! অর্থাৎ তারা প্রত্যেকেই জানতেন যে সব নারীর চেহারার কিছু না কিছু সুন্দর, কিন্তু  তারা নিজেদের ‘সৌন্দর্য’ সম্পর্কে পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। অর্থাৎ  তারা নিজেদের ব্যাপারে ইতিবাচক বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারেন নাই ‘আমি সুন্দর!’   

দেখা গেছে ‘বিউটিফুল’ দরজা দিয়ে অনেকেই নিজেকে সুন্দর বলে বিশ্বাস করেন না বিধায় ঢুকেন নাই। এভারেজ পিক করেছিল বেশিরভাগ! আবার কেউ কেউ তো নিজেকে দুইটার কোনটাতেই ঢোকার যোগ্য(!) ই মনে করেন নাই, কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে ফেরত গেছেন।  

পরে তাদের অভিমত জানতে চাওয়া হলে- বিউটিফুল বাদ দিয়ে এভারেজ বেছে নেয়া কেউ কেউ আফসোস করে বলেছেন, তার মনে হয়েছে বিউটিফুল বাদ দিয়ে এভারেজ বেছে নিয়ে সে নিজেকেই নিজে ছোট করেছে। আরেকবার সুযোগ পেলে এর পরেরবার সে বিউটিফুলই বেছে নেবে, কারণ তার মনে হয়েছে সে এভারেজ না, বরং সুন্দর!   

আবার কেউ কেউ বলেছেন, সবাই তাকে সারাজীবন বলেছে, ‘সে এভারেজ’, তাই সে ‘এভারেজ’ দরজা দিয়ে ঢুকেছে, যদিও সে নিজেকে সুন্দর ভাবে, তারপরেও তার সাহস হয় নাই ‘বিউটিফুল’ এর দরজা দিয়ে ঢুকবার! মানুষের চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাসকেই সে জয়ী করেছে, নিজের মনকে শোনার প্রয়োজন মনে করেন নাই!

এই ক্যাম্পেইন আর কিছু না পারুক, কিছু মেয়েকে নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবতে শিখিয়েছে এবং নিজেদের সম্পর্কে নেতিবাচক বিশ্বাস কিভাবে গড়ে ওঠে তা দেখিয়েছে! এই বা কম কী! এই ক্যাম্পেইনের মেসেজটা আমি সবাইকে গ্রহণ করতে বলি।  

‘আমি সুন্দর’ এই একটা ইতিবাচক বিশ্বাস নিজের মনে গেঁথে নিতে পারলে দুনিয়া জয় করা সম্ভব। এই একটা বিশ্বাসই আত্মবিশ্বাস বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়!

‘আমি কালো হই, মোটা হই, নাক বোঁচা হই, খাটো হই- এতো কিছুর পরেও আমি সুন্দরকেননা আমি ইউনিক। আমার মতো আর একজনও এই পৃথিবীতে নাই! নিজের কাছে নিজেকে সুন্দর ভাবতে হবে এবং তা বিশ্বাস করতে হবেএটা করতে পারলে আর কিছু লাগে না।   

সমাজে  নানা ভ্রান্ত এবং চরম ফালতু প্রথা প্রচলিত থাকে এমন কিছু মানুষের জন্য যারা প্রজ্ঞাহীন, কালো কিংবা শ্যামলা কমপ্লেকশন নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসও সারফেস লেভেলে চিন্তা করা এসব মানুষের সৃষ্টি। কাজেই প্রজ্ঞাহীন এসব মানুষের চাপিয়ে দেয়া এ বিশ্বাস, অর্থাৎ ‘কালো মানেই অসুন্দর, কালো মানেই বিয়ে হবে না, কালো মানেই অবহেলা পাবার মত’–ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সাহস অর্জন করতে হবে। এগুলা সমাজে ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু এই অযৌক্তিক পারসেপশন কেউ একসেপ্ট করবে কিনা, একসেপ্ট করে কষ্ট পাবে কীনা, একসেপ্ট করে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়বে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে।  

সেই কবেকার এক ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

বেইলি রোডে গিয়েছিলাম আম্মুর সাথে শাড়ির দোকানে আম্মু  শাড়ি কিনছে, আর আমি এমনি দেখছি। পাশেই এক মেয়ে বসা। মুখ খুবই মলিন, হাতে খুব সুন্দর হলুদ এক শাড়ি ধরে আছে, শাড়িতে  হাত বুলাচ্ছে আর এখনই কেঁদে দেবে এমন এক ভাব! আম্মু শাড়ি কেনায় ব্যস্ত, আর আমি ব্যস্ত ঐ মেয়েকে দেখতে! এতো কেন মন খারাপ বোঝার চেষ্টা করছি, তখন কানে এলো তার সাথে থাকা এক নারীর কথা ‘…আমার বোন তো বলেই গেছে পছন্দ না হলে চেইঞ্জ করে দিতে হবে! আমার শাড়ি পছন্দ হয়নি! আমার মেয়ে কালো, এই রঙ্গে তার গায়ের রঙ আরও বেশি কালো লাগবে… আমার অন্য রঙ দরকার… আর কী আছে দেখান!’

আমি তখন কাহিনী ধরতে পারলাম। মেয়েটার শাড়িটা পছন্দ হয়েছে, তার মা তার গায়ের রঙের কারণে এই শাড়ি রাখতে দিচ্ছে না।

গায়ের রং দিয়ে একজনকে কী পরিমাণ আঘাত করা সম্ভব, এরপর আরও দেখেছি, কিন্তু এই ঘটনা দিয়ে প্রথমবারের মতো আমার পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা দেখা শুরু হয়েছিল! আমি বুঝতে পারছিলাম না ভদ্রমহিলা মা হয়ে কেন সে নিজের মেয়েকে ছোট করছে দোকানদারের সামনে! এও বুঝিনি মেয়েটাই বা কেন মন খারাপ করছে? মাকে বলুক এই শাড়িই সে রাখবে। না বলে চুপ করে আছে কেন?

বেইলি রোডের সে মেয়ের মলিন মুখ আমার চোখে আজও ভাসে। নিজের মাকে সে বলতে পারে নাই, ‘আমি এই শাড়িই রাখবো, এই শাড়িতেই আমি সুন্দর।’

মেয়েটা যদি একটু সাহস করে বলে দিত, একটু যদি সে ‘সুন্দর’-এই ‘বিশ্বাস’টা করতো!!    

Dove এর ‘Choose Beautiful’ এর মতো ক্যাম্পেইন বাংলাদেশে যদি কোনদিন হয়, আমি চাইবো বিশ্ব যেন অবাক হয়ে দেখে, এমন এক দেশ আছে যেখানে সব মেয়ে নিজেকে ‘সুন্দর’ বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে! কেননা আমরা আসলেই সবাই সবার মতো সুন্দর!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.