যৌতুক এখনও ভয়াবহ এক অভিশাপ

তৃষ্ণা হোমরায়: ছোটবেলায় আমাদের বাসায় কেউ বেড়াতে এলেই আমার বাবা-মাকে বলতো, আপনাদের তিনটি মেয়ে! বিয়ে দেয়ার সময় বুঝবেন। এই কথাটা বেশি বলতেন, আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাই। কেউ কেউ আবার রীতিমতো অঙ্ক কষে বোঝাতেন, তিন মেয়ের বিয়েতে যৌতুক বাবদ তাদের কী পরিমাণ টাকা খরচ করতে হবে। তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার মধ্যবিত্ত শিক্ষক মা-বাবার কপালে দেখেছি চিন্তার ভাঁজসেসময় এসব কথার মর্ম না বুঝলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে দেখেছি সমাজে শ্রেণীভেদে এই প্রথার নানা রকম জঘন্য রূপ।

তৃষ্ণা হোমরায়

আমাদের সমাজে যৌতুক অনেক মা-বাবার জন্যই একটি ভয়াবহ অভিশাপ। মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে তাকে পাত্রস্থ করার চেষ্টার পাশাপাশি বাড়তে থাকে পাত্র পক্ষের দাবি-দাওয়া নিয়ে উদ্বেগ। শুধুমাত্র যৌতুক দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় অনেক মেয়েকেই বিয়ে দিতে পারছেন না তাদের অভিভাবকঅনেকে আবার প্রায় নিঃস্ব হয়েও মেয়েকে পাত্রস্থ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ যন্ত্রণা যেমন কন্যাদায়গ্রস্ত অভিভাবকদের, তেমনি মেয়েটিরও। চোখের সামনে বিয়ের জন্য পরিবারকে নিঃস্ব হতে দেখে মানসিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত মেয়েটি নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকেযৌতুক দিলেই যে মেয়েটি সুখে থাকে, তা কিন্তু নয়। লোভী পরিবারগুলোর ‘আরো চাই’ মানসিকতার কারণে নানা অছিলায় চলে শারীবিক-মানসিক নির্যাতন। আমার পরিচিত একটি মেয়েকে দুই ভরি গয়নাসহ ফার্নিচার দেয়ার পরও, আরো পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে বিয়ের দুই দিনের মাথায় অকথ্য নির্যাতন করে ছেলের পরিবার

সমাজে এক শ্রেণির মানুষের জন্য আধুনিক যুগেও মহাসমারোহে এই বিকৃত প্রথাটি টিকে আছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজেদের স্বার্থে যুগ যুগ ধরেই যৌতুক প্রথাটি টিকিয়ে রেখেছে। সময়ের সাথে সাথে শুধু ধরন পাল্টেছে। আগে দর কষাকষি করে ঠিক করা হতো, আর এখন বুঝিয়ে দেয়া হয় আকারে ইঙ্গিতে। সমাজের উঁচু মহলেই এর প্রচলন বেশি।

এইতো সেদিন আমাদের পরিচিত এক ভাবি বোনের বিয়ের দাওয়াত দিতে এসে গল্প করলেন, ছেলে পক্ষ খুবই বড়লোক। বাড়ী-গাড়ি সবই আছে তাদের। তাই কিছুই দেয়া লাগছে না। কিছুদিন পরই শুনি বিয়েতে মেয়ের ভাই উপহার হিসাবে কিছু ফার্নিচার দিতে চেয়েছিলেন। আর তাতেই বেরিয়ে পড়ে ছেলে পক্ষের আসল চেহারা। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছেলের বাবা নাকি মেয়েপক্ষকে বলেছেন, আমার তো কোন কিছুর অভাব নেই। ফার্নিচার রাখার জায়গাই নেই বাসায়। আপনারা যদি দিতেই চান তাহলে আমার ছেলেকে একটি গাড়ি দিতে পারেন। বোঝেন অবস্থা, কোথায় ফার্নিচার আর কোথায় গাড়ি!! এখন এ নিয়ে চলছে অশান্তি।

এতো গেল বিয়ের সময় যৌতুক চাওয়ার কথা। বিয়ের পরও এ থেকে নিস্তার মিলছে না মেয়েদের। বিয়ের বয়স ৬/৭ বছর পার হয়েছে, সন্তানও জন্মেছে তারপরও চলছে যৌতুকের নামে নির্যাতন। এতে অনেক সময় হাতিয়ার করা হচ্ছে সন্তানকে।

১২ই ডিসেম্বরের পত্রিকায় দেখলাম যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর উপজেলায় স্ত্রীর ওপর বর্বর কায়দায় নির্যাতন করেছেন এক ইমাম। ৬ ডিসেম্বর রাতে  শফিকুল নামের ওই ইমাম তার স্ত্রী ফাতেমাকে মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন সংবাদ মাধ্যমে মেয়েটির ছবি দেখে আঁতকে উঠেছি। আঘাতের কারণে ফুলে রক্ত জমে আছে দুই চোখে ভালোভাবে তাকাতেও পারছেন না সারা শরীরে আঘাতের কালসিটে দাগ। মাথাভর্তি ক্ষুরের চিহ্ন। এখানেই শেষ নয়, মেয়েটির কোলে এখন সদ্যপ্রসূত সন্তান। ছবিতে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। একদিকে মাতৃত্ব, অন্যদিকে নির্যাতিত শরীর ও মন। উভয় সংকটে পড়া লাখো নারীর জীবনের প্রতীক যেন এই ফাতেমা যেন। 

এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েব সাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৮৯টি।আর ২০১৫ সালে শুধু নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ২১ হাজার ২২০টিবাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির ‘বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা’ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী  ২০১৫ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ৩৯২ জন নারী। এরমধ্যে হত্যা করা হয় ১৯২ জনকে। আর আত্মহত্যা করেছেন ১৮ জন। এই উপমহাদেশ ছাড়া বিশ্বে আর কোথাও বোধ হয় যৌতুকের কারণে এত মেয়েকে প্রাণ দিতে হয়না। এ কারণে শুধু ভারতেই প্রতি ঘন্টায় ১২ জন নারীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

এরকম ভয়াবহ ছবি প্রকাশ করতে চায় না উইমেন চ্যাপ্টার। কিন্তু নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখাতেই প্রকাশ করা হলো। দেখুন, নারী নির্যাতনের মাত্রা কোন পর্যায়ে?

যৌতুক প্রথা বন্ধে ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’। এরপর ২০০৩ সালে এটিকে সংশোধন করে আরো প্রশস্ত করা হয়। এ আইনে যৌতুকের সংজ্ঞায় বরপক্ষ কতৃক কনেপক্ষের কাছে দাবি করা যে কোন অর্থ সামগ্রীকে বোঝানো হয়েছে। আইনে মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছেএমনকি এই আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের সাথে জড়িত মূল এবং প্রত্যক্ষভাবে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি না দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন আছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলিয়ে বের হয়ে যায়। যে কারণে প্রথাটির ভয়াল থাবা থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছে না মেয়েরা, পরিবারগুলোও।

লেখক: সাংবাদিক, একাত্তর টেলিভিশন

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.