মুক্তিযোদ্ধা নারীরা অপাংক্তেয় কেন?

0

তানিয়া মোর্শেদ: বাংলাদেশের মানুষ হিসাবে আমি বড়ই লজ্জিত হই যখনই কোন নারী মুক্তিযোদ্ধার (যাঁদের বীরাঙ্গনা বলা হয়, যে শব্দ তাঁদের জন্য ভালো কিছুই বয়ে আনেনি, অপমান-লাঞ্ছনা-অত্যাচার ছাড়া) নিজের দেশের মানুষের থেকে পাওয়া অপমানের অভিজ্ঞতা শুনি। পাকিস্তান আর্মি আর রাজাকারদের অত্যাচার সয়েও যাঁরা বেঁচেছিলেন তাঁদের নিজের দেশের মানুষ কী অপমান-লাঞ্ছনা-অন্যায়-অত্যাচার করেছে, করছে!

সেদিন চ্যানেল আই-তে কয়েকজনের সাক্ষাতকার দেখাচ্ছিল। এখনও যদি কেউ জানে তাঁদের ইতিহাস, বাড়ি থেকে বের করে দেয়! ভাড়া দেয় না, কাজ দেয় না, পরবর্তী প্রজন্মকেও রেহাই দেয় না! বিয়ের পর বর জানলে তালাক দেয়। এমনকি তাঁদের মেয়েদেরও!

কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার ক’জন তাঁদের নিয়ে লিখেছেন, লেখেন? ক’টি নাটকে, মুভিতে তাঁদের দেখানো হয়েছে? বলা হয়ে থাকে, সব যুদ্ধেই নারী ধর্ষণ হয়। যুদ্ধ মানেই নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা, এটা যেন একটি আরেকটির যমজ! ১৯৭১-এ এথনিক ক্লিনসিং এর চিন্তা থেকে পাকিস্তানী আর্মি বাংলার নারীকে ধর্ষণ করেছে। করেছে দেশীয় রাজাকাররাও। দুই থেকে চার লক্ষ ধর্ষিতার অভিজ্ঞতা পড়ার সাহস আজও আমার হয় না! একটু পড়লেই অসুস্থ লাগে! আর সেই তাঁদের সাথে দেশের মানুষ তখন থেকে এখন পর্যন্ত যা করে চলেছে, তাতে আমার মনে হয় জাতি হিসাবে আমরা নিজেরাই বড় অসভ্য, বর্বর, অমানবিক।

আমার কাছে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার থেকেও নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্মান একটু হলেও বেশী। পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা বলতে পারেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যদি রিক্সাও চালান, তবুও তিনি একটু ভালো আছেন নারী মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে। নারী মুক্তিযোদ্ধা নিজে শুধু নয়, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মও কোনভাবেই প্রকাশ করতে পারেন না তাঁদের কথা! এতো বড় নির্মমতার শিকার হয়েও কিছুই পেলেন না তাঁরা! শারীরিক ও মানসিক ক্ষত তাঁরা বহন করে চলেছেন আমৃত্যু!

১৯৭২ সালে এসব নারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু হয়। আমার মা তাঁদের জন্য কাজ করেছেন। করেছেন আমার বড় খালাও। এক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসা হয় ধানমন্ডিতে নারী পুনর্বাসনের প্রধান কেন্দ্রে। তাঁদের বিভিন্ন কাজ শেখানো (হস্ত শিল্প) হতো। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সব বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৭৪-এ কানাডা যাবার সময় (বাবা পড়তে গিয়েছিলেন ১৯৭৩-এ) একই ফ্লাইটে কিছু যুদ্ধশিশুকে দেখেছিলাম। হ্যাঁ আমার স্মৃতি শক্তি সিলেক্টিভ! অতি অল্প বয়সের বিশেষ বিশেষ বিষয় মনে আছে আজও। যেমন মনে আছে ১৯৭১-এর বেশ কিছু কথা।

সেইসব যুদ্ধশিশুকে এক নারী নিয়ে গিয়েছিলেন, বিভিন্ন মানুষ দত্তক নিয়েছিলেন তাঁদের। হ্যাঁ অবশ্যই কানাডার অবাংগালী (এবং সাদা মানুষ) দত্তক নিয়েছিলেন। যুদ্ধশিশুকে দত্তক নেবে বাঙ্গালী! এমন ক’জন জন্মেছেন!

ক্ষমা করো মুক্তিযোদ্ধা নারী, মা ও বোনেরা আমায়! আমি শুধু একরাশ লজ্জা, ক্রোধ, হতাশা নিয়ে তোমাদের হাত ধরে আছি!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.