ভালো থাকার গল্প-৩

মৌসুমী বিশ্বাস: সামগ্রিক অর্থেই এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছি আমরা। বিশ্বব্যাপি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দা সকল সাম্রাজ্য দখল করতে চাইছে যেন। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ধাক্কা যখন বাংলাদেশ নামক ছোট্ট স্বপ্নের ভূখণ্ডটিতেত এসে লাগে, যখন নাসিরনগর কিংবা গাইবান্ধায় অপরাধহীন অসহায় মানুষের ক্লান্ত, পরাজিত মুখের ছবি সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে ছাপা হয়, দলে দলে রোহিঙ্গাদের নৌকাগুলো যখন শুধুমাত্র মৃত্যুকে প্রতিরোধ করবে বলে শীতার্ত রাতের অন্ধকারে নদী থেকে সমুদ্রে, সমুদ্র থেকে নদীতে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, যখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম জুড়ে শুধু আইনাল কুর্দি’দের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার ছবি ভেসে বেড়ায়, তখন আসলে ভালো থাকার কথা বলা পৃথিবীর দুঃসহতম কাজের একটি।

মৌসুমী বিশ্বাস, উন্নয়ন কর্মী

কিন্তু সকল কঠিন সময়েরই কিছু না কিছু প্রেরণা থাকে মানুষের তার মনুষ্যত্ব পুন: প্রমাণের। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন অসাধারণ প্রেরণাদায়ী গানগুলো কিন্তু তৈরি হয়েছিল কঠিনতম সময়ে, যখন মানুষ মৃত্যু, অপমান ও অনাহার ছাড়া চোখের সামনে আর তেমন কিছুই দেখতে পেত না। কিছু মানুষ হাজার প্রতিকূলতার ভেতরেও ইতিবাচক চিন্তা করেছিলেন ও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই আজ পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কম্পিউটারের কি-বোর্ডে আমরা দ্বিধাহীনভাবে আঙ্গুল চালাতে পারি।

ছোট্ট কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েরা স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই চরম দারিদ্রকে জয় করে আমাদের ফুটবলে এনে দিয়েছেন গর্বের ইতিহাস। আমার কাছে তাই মনে হয়, পরিবর্তনটা আসে যেকোনো ইতিবাচক ভাবনার সূচনা থেকেই। মানুষের পরিস্থিতি যত প্রতিকূল মুক্তির আনন্দ ততই সন্নিকটে। অন্ততঃ ইতিহাস তাই বলে।

ঢাকা শহরে বসবাসকারী হিসাবে উত্তরাধিকারসূত্রে যানজট বিড়ম্বনার নিয়ত সাক্ষীর মতো একদিন প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে গাড়িতে বসে আছি। প্রেসক্লাব থেকে একটা প্রোগ্রাম শেষ করে ফিরছি। সময় তখন মধ্যদুপুর ছাড়িয়েছে। গন্তব্য বনানীর অফিস। পৌনে একঘন্টায় মাত্র সোনারগাঁ হোটেলের সামনে পর্যন্ত এসে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধরহিত প্রায়, সাথে গত কয়েকদিনের পরিশ্রমজনিত ক্লান্তি। ক্ষুধার কাছে দুনিয়ার সবকিছুকেই মনে হচ্ছে অর্থহীন ও বিরক্তিকর।

হঠাৎ একটি বিলবোর্ডের লেখায় চোখে পড়লো, “মনে পড়ে, শেষ কবে খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটেছেন?” আমি আবার পড়লাম লেখাটা, আবার, তারপর আবার। মনে হলো, সত্যিই তো মনে করতে পারি না শেষ কবে খালি পায়ে হেঁটেছি! ভাবতে ভাবতে, পেছনে ফিরতে ফিরতে অনেক পেছনে ফিরে যেয়ে মনে পড়লো, সারারাত জেগে থাকার পর কোন এক একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে আমাদের কলেজের সবুজ ঘাসে হেঁটেছিলাম সহযোদ্ধাদের সাথে। আমার মন ভালো হয়ে গেল। খাবার কথা অনেকক্ষণ আর মনে পড়লো না।

অফিসে ফিরে নতুন ডেটলাইন নিয়ে আবার কাজ শুরু করতে হবে মনে করেও বিরক্ত লাগলো না। মনে হলো, আমাদের সবকথাই উপকথার মতো। শুধইু ফিরে ফিরে আসে; কারণে-অকারণে। আমরা আবার ভালো থাকতে শুরু করি যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে।

একবার খুব বন্যা হলো দেশে। আমরা তখন কলেজে পড়ি। সাতক্ষীরা, নড়াইল, খুলনা সব পানির নীচে। সপ্তাহব্যাপি আমরা ত্রাণ তুলতে শুরু করলাম যশোর শহরে। আমি তখন প্রবলভাবে ছাত্র সংগঠন করি। সারাদিন দুইটা ভ্যান নিয়ে আমরা দুইভাগে ভাগ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। টাকা-পয়সা, জামা-কাপড় মানুষ যে যা দেয় সবই হাত পেতে নেই। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া চলে রাস্তাতেই। কোনদিন কলা-বিস্কুট-মুড়ি, কোনদিন চা-পাউরুটি।

এই কাজ করতে গিয়ে দুইটি ঘটনা আমাকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করলো। ত্রাণ সংগ্রহের শেষ দিনে আমরা কালেক্টরেট মার্কেটের সামনে ভ্যান রেখে যে যার মতো টাকা তুলছি। অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলাম বিডি হলের সিঁড়ির পাশে এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করছিলেন এবং তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে হাত তুলে ইশারা দিয়ে ডাকছেন। ভিক্ষা চাইছেন মনে করে ভাবলাম কাজ শেষে যাবার সময় কিছু দিয়ে যাবো। যথারীতি একসময় উনার কাছে গেলাম এবং উনি আমাকে ত্রিশ টাকা (একটা ২০ টাকা ও একটা ১০ টাকার নোট) হাতে দিয়ে বললেন,” যাগের জন্যি ত্রাণ তুলতিছো, এইটা তাগেরে আমার পক্ষ থেকে দিবা।”

আমি টাকা হাতে নিয়ে চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করছি তখন। এই অশ্রু ব্যাখ্যাতীত আনন্দের। মানুষ হয়ে জন্মানোর গর্বে ভীষণ গর্বিত লাগছে আরো একবার।

দ্বিতীয় ঘটনা। একই কারণে আমরা গিয়েছি ঝুমঝুমপুরে। বিকাল প্রায় চারটা বাজে। তখনও খাওয়া হয়নি কিছু। আমরা কিছু খাবো বলে ব্রিজের পাশে ছাপড়া চা’য়ের দোকানগুলির কাছে দাঁড়িয়েছি। আমার এক ছোট ভাই সাইদ চা আর বিস্কুট দিতে বললো চা-ওয়ালাকে। আমরা বেঞ্চে বসে ক্লান্ত শরীরে চা খাচ্ছি, টুকটাক গল্পগুজব করছি, আর মাঝে মাঝে চাওয়ালার বিভিন্ন কৌতুহলের জবাব দিচ্ছি। একসময় খাওয়া শেষ হলে টাকা কত দিবো জিজ্ঞাসা করলে দোকানদার বললেন, “আপনাগের হইছে ৩৫ টাকা, কিন্তু টাকা দেওয়া লাগবে না। আপনারা মানুষের জন্যি সারাদিন ঘুরতিছেন! আমি এককাপ চা আর বিস্কুট খাওয়াইয়ে আপনাগের কাছ থেকে টাকা নিতি পারবো না। দোকানদার হইছি তো কী হইছে”।

মানবতার কি আদৌ মৃত্যু আছে!

পারস্যের কবি নাজিম হিকমতের কবিতার একটা লাইন দিয়ে শেষ করি-“মানুষই মানুষকে পৌঁছে দিবে দুঃসময় থেকে সুসময়ে…”! আমরা সবাই সেই সময়ের প্রতীক্ষায় আছি।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.