চা শ্রমিকের ঐতিহাসিক ভূমিরক্ষা আন্দোলনের এক বছর

মাহমুদা খাঁ: বহুকাল আগে বুদ্ধিমানরা আবিস্কার করলো- যেখানে আকাশ অঝোরে কাঁদে, কিন্তু সে কান্না ঐ মাটির বুকে জমাট বাঁধতে পারে না- সেখানেই চায়ের চাষ সম্ভব। শুধু বৃষ্টির জলই নয়, শ্রমিকের চোখের নোনা জলও যে চা-চাষের জন্য অপরিহার্য, তা কিন্তু বুদ্ধিমানেরা তখন বলেনি। তবে শ্রমিকের সে কান্নাও আকাশের কান্নার মতোই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

তাই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নয়নের স্লোগান শোনা গেলেও চা-শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এখনো ৮৫ টাকা। অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল আসাম ও সিলেটে। এই উপমহাদেশে চা শ্রমিকদেরকে নিয়ে আসা হয় গিরমিট প্রথার মধ্য দিয়ে। গড়ে উঠে চা শিল্প, নয়নাভিরাম চা বাগান। সেই থেকে প্রায় ১৭০ বছর ধরে চা বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অমানবিক জীবনের গল্প।

বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার মতো সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে চা শ্রমিকরা বঞ্চিত। চা বাগানের জন্য লিজ নেয়া পতিত সমতল জমি ছোট বড় টিলা ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চা শ্রমিকরা এ জমিকে আবাদযোগ্য করে তোলে, এবং বংশ পরম্পরায় এ জমিতে চাষাবাদ করে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করে আসছে। এদিকে দারিদ্রপীড়িত চা শ্রমিকেরা যখন অমানুষিক পরিশ্রম করে এ জমিতে সোনার ফসল ফলান, তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন এই ৫১১.৮৩ একর আবাদি জমি কেড়ে নিয়ে স্পেশাল ইকোনোমিক জোন করার ষড়যন্ত্র করে সরকার।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের শ্রমিকরা ২০১৪ সালের দিকে হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন, কোনো এক‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ করার জন্য সরকার তাদের ৫১১.৮৩ একর কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে ফেলেছে। তারা অভিযোগ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে শুনলেন, প্রায় দেড়শ বছর আগে জঙ্গল কেটে যে জমি তারা আবাদযোগ্য করেছেন, যে জমিতে তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে ধান চাষ করছেন, সে জমি নাকি তাদের নয়, তাই তাদের অনুমোদন কিংবা তাদের সাথে আলাপ-আলোচনার কোনো প্রয়োজন কেউ মনে করছে না! কাগজে-কলমে সে ধানী জমি ডানকান ব্রাদার্সের কাছে লিজ দেয়া সরকারি খাস জমি। সরকার সে লিজ বাতিল করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বন্দোবস্ত দিয়েছে।

পরবর্তিতে প্রশাসন থেকে ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর যখন এই জমিতে সীমানা পিলার ও দখল নিতে আসে তখন চা শ্রমিকরা বাধা দেয়, শ্রমিকদের এই প্রতিরোধের মুখে প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়। এদিকে শ্রমিকরা কোন উপায় না দেখে ১৩ ডিসেম্বর থেকে চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের কৃষি জমিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে যুক্ত হয় লস্করপুর ভ্যালির ২৩ টি চা বাগানসহ বাংলাদেশের প্রায় দু’শতাধিক এরও অধিক চা বাগানের চা শ্রমিকরা। যেটি পরবর্তিতে ঐতিহাসিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

বলা হয়ে থাকে, ১৯২১ সালের চা শ্রমিকের ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের পরেই হচ্ছে চান্দপুর-বেগমখান চা শ্রমিকদের ভূমি রক্ষার আন্দোলন। আন্দোলন শুরুর পর প্রায় প্রতিদিন মিছিল সমাবেশ হতে থাকে উক্ত ধানি জমিতে। শ্রমিকরা লাগাতার প্রায় পাঁচ মাস ওই আন্দোলন চলমান রাখেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন এক প্রকার বাধ্য হয়ে আপাতত এই জোন স্থাপন স্থগিত রেখেছে।

বলা বাহুল্য এই ধানী জমিতে নির্ভরশীল হচ্ছে ১২০০ এর অধিক পরিবার যারা কোনরকম চা বাগানের কাজের সাথে জড়িত নয়, তাদের পরিবারের একমাত্র আয় উপার্জন হচ্ছে এই জমিকেই ঘিরে। এখন যদি এই জমিতে সরকার ইকোনমি জোন স্থাপন করে তাহলে এসকল প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষকে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

যে জমিতে বছরে ৫৯ হাজার মণ ধান যার বাজার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা ও ৮০/৯০ লক্ষ টাকার সমপরিমাণের সবজি চাষ হয়, সে জমিকে অকৃষি খাস জমি দেখিয়ে প্রশাসণ সম্পূর্ণভাবেই এক ভয়ঙ্কর মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে, সেটি ইতিমধ্যে সবারই জানা হয়েছে ।
চান্দপুর-বেগমখান চা শ্রমিকের ভূমি রক্ষা আন্দোলনে চোখে পড়ার মতো ছিল নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ,শতকরা নব্বই ভাগ নারী ছিল এই আন্দোলনের মূল প্রাণ। তাদের কন্ঠেই প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল “আমার মাটি আমার মা, কেড়ে নিতে দিব না”। “রক্ত দিব, জীবন দিব, ধান্য জমি দেব না”।

জোন বিরোধী আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে এই শ্রমিকদের সাথে কাজ করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি তারা কতোটুকু নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত। সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে তারা খুবই অবহেলিত, যদিও বাংলাদেশ সরকার একটি ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে তাদেরকে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়েছে, কিন্তু দেয় নাই কোনরকম জীবনমানের উন্নয়নের সামান্যতম সুযোগ কিংবা সুবিধা।  
২৩ কেজি চা-পাতি তোলার বিপরীতে শ্রমিকরা মজুরি হিসেবে মাত্র ৮৫ টাকা পায়, যেটি কিছুদিন পূর্বেও ছিল ৬৯ টাকা। সেইসাথে শ্রমিকদের নামমাত্র মূল্যে রেশন দেওয়া হয় ।   

প্রতিজন শ্রমিক ১ টাকা ৩০ পয়সা কেজি হিসাবে প্রতি সপ্তাহে পান ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম চাল বা আটা। সেটাও আবার সব সময় পাওয়া যায় না। এখন এই অনুন্নত সমাজে আদর্শ পরিবার ধরেও যদি হিসাব করা হয়, তাহলে মাথাপিছু পড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ গ্রাম চাল। (আদর্শ পরিবারে ৪ জন সদস্য ধরা হয়। দুই জন কাজ করলে পান ৩.২৭০+৩.২৭০=৬.৫৪০ কেজি চাল। তাহলে দিন প্রতি প্রতিজনের ভাগে পড়ে ২৭৭ গ্রাম চাল।) এখন বর্তমান বাজারে এই ৮৫ টাকায় সংসার চালানো কীভাবে সম্ভব, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

চা শ্রমিকের অর্ধেকেরও বেশী নারী হলেও কী হবে, এই নারীদের অবস্থা আরও খারাপ। আগে শ্রমিকরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেত না। কাজ না করলে খাবার জুটবে না, তাই বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা এই সময়টাতেও কাজ করেছে। এমনও হয়েছে যে, কাজ করতে করতে চা–বাগানের মাঝেখানেই চটের বস্তা বা পলিথিনের উপর বাচ্চার জন্ম হয়েছে। বর্তমানে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। এখনও প্রসুতিকালে তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি ঠিকভাবে পায় না!  দেড় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি এই কঠোর পরিশ্রমের কাজে কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আবার পূর্ণ ছুটি ভোগের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হতে দেখা যায় না। যদিও চা শ্রমিকরা দাবি জানিয়ে আসছে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেশের অন্যান্য পেশায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের সমপর্যায় করার জন্য।

ডাঃ নিবাস চন্দ্র পাল তার ‘চা শ্রমিকদের কথা’ বইতে উল্লেখ করেন যে, “চা বাগানের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ নারীই রক্তশূন্যতার মাঝে গর্ভধারণ করেন। অপুষ্টি ও বাল্যবিবাহ এর অন্যতম ।
২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি চা বাগানে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও অনেক চা বাগানে ন্যুনতম স্বাস্থ্যসেবার কোনো সুবিধা নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কোন ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা নেই; একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় পা এবং মাচা। যেসব বাগানে ডিসপেনসারি রয়েছে, সেখানে নামমাত্র ওষুধ ছাড়া জীবনরক্ষাকারী কোনো ওষুধই মেলে না। বেশিরভাগ বাগানেই কোন ডাক্তার, ওষুধ ও ন্যুনতম চিকিৎসা সেবা নেই।
ফিরে আসি আবার চা শ্রমিকের ভূমি রক্ষার দিকে …..  

সরকারি খাস খতিয়ান হিসেবে যে অকৃষি জমি ডানকানকে ১৮৯০ সালে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেই অকৃষি খাস জমিকে চা শ্রমিকের পূর্বসূরিরা ১২৫ বছর আগে ফসলি জমিতে রূপান্তরিত করেছে। ১২৫ বছর যাবৎ ফসল ফলানো, প্রতি বছর বিঘাপ্রতি সাড়ে তিন মণ চাল অথবা আটার সমপরিমাণ রেশনের মূল্যে এই জমির দাম পরিশোধ করা হয়েছে বহু আগে।  ডানকান চুক্তিমতো জমি ব্যবহার না করায় যেহেতু আইন অনুযায়ী এই লিজ বাতিল করা হয়েছে, তাহলে ১৯৯৭ সালের খাস জমি বন্দোবস্ত আইন অনুযায়ী এই জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়ার অগ্রাধিকার রয়েছে চা শ্রমিকদের। জমি যদি লিজ দিতে হয় তাহলে শ্রমিকদেরই দিতে হবে।

ইকোনমি জোনের নামে শ্রমিকের জীবন মান উন্নয়নের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের কাছ থেকে সেটি যে ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয় সেটা প্রতিয়মান হবে যদি আমরা দেখি ইকোনমি জোন কোন প্রেক্ষিতে এবং কিসের জন্য করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০ অনুসারে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমি চার ধরনের কাজে ব্যাবহার করা যাবে-
(ক) রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা: রপ্তানীমুখী শিল্পের জন্য নির্ধারিত;
(খ) অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকরণ এলাকা: দেশীয় বাজার চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত শিল্পের জন্য নির্ধারিত;
(গ) বাণিজ্যিক এলাকা: ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ওয়্যারহাউজ, অফিস বা অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত;
(ঘ) প্রক্রিয়াকরণ মুক্ত এলাকা: আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন ইত্যাদির জন্য নির্ধারিত।
ফলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, বিপুল কর্মসংস্থানের কথা বলে কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হলেও সেখানে আসলে কার স্বার্থরক্ষিত হবে- জমি হারানো চা শ্রমিক আর তার পরিবারের, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নাকি দেশীবিদেশী লুটেরা পুজিপতি ও বিনিয়োগকারীদের?
তাই ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে চলা আন্দোলন আজ এক বছরে পর্দাপণ করলেও আজ পর্যন্ত চা শ্রমিকদের দাবি একটাই, ‘আমাদের উন্নত জীবন আর চাকরির লোভ দেখিয়ে লাভ নেই ,আমরা আমাদের মাকে চাই,
মায়ের বিকল্প আর কোনো কিছুই হতে পারে না। পূর্বেও আমাদের অনেক লোভ দেখিয়ে হবিগঞ্জ তথা সিলেটের অনেক চা বাগানের জমি দখল করা হয়েছে’।

মাহমুদা খাঁ

চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প অথচ এই বৃহৎ শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান কাছ থেকে দেখলে যে কারোও চোখ কপালে উঠবে। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে এক কাপ চা পান না করলে আমাদের যাদের সকালের যাত্রাই শুভ হয় না, তারা কি জানি এই চা শ্রমিকরা নামিদামি হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্ট এর এক কাপ চায়ের মূল্যের সমপরিমাণ মূল্যও তারা পায় না।     
সোনারগাঁও হোটেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ব্রেকফাস্ট টি ১২০ টাকা, দার্জিলিং টি ১২০ টাকা, গ্রিন টি ১২০ টাকা, অলিম্পিক টি ১৮০ টাকা, আইস টি ১৪০ টাকা ছিল কয়েক দিন আগেও। এখন সবগুলোর দাম বেড়ে ১৯৪ টাকা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই চায়ের উৎপাদক, তাঁরা কি দুই কাপ চায়ের দামও পাবেন না? তাঁরা পাতা শুকিয়ে বড়ি বানিয়ে চিনির বদলে লবণ দিয়ে চা খান। টেলিভিশনের ক্যামেরায় সাজানো বাগানে হাস্যরত মালির অভিনয় দেখি, সংসদে ইতিহাস দখলের লড়াই দেখি, কিন্তু চোখের সামনে জীবন্ত মানুষ মরে মরে যে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে; আমরা তা দেখবো না? ব্রিটিশ উপনিবেশ, পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আজোও চা শ্রমিকরা নিম্ন মজুরি আর মানবেতর জীবন পার করছে। আজোও দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি চা শ্রমিকের জীবন।

লেখক: কেন্দ্রীয় সদস্য বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন
    ও
সংগঠক, চান্দপুর-বেগমখান ভূমি রক্ষা আন্দোলন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.