পরাজয়টাই সত্য এবং সত্য যে কঠিন

মাসুদা ভাট্টি: ইদানীং দেশে ও বিদেশে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে রিয়েলিটি শো নামে এক ধরনের অদ্ভুত অনুষ্ঠান প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। প্রথমত. এগুলো তৈরিতে খরচ কম পড়ে এবং তুলনামূলকভাবে এগুলো তৈরিতে ঝামেলাও কম। অন্যদিকে টিভি সেটে এবং পর্দার বাইরে দর্শককুল খুব সহজেই এই অনুষ্ঠানে একাত্ম হতে পারেন। ফলে অনুষ্ঠানগুলো জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে ব্যাপক। বিশেষ করে ভারতের মতো জনবহুল দেশে রিয়েলিটি শো মানেই কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ, তাও আবার মোবাইল ফোন বা অন লাইনে ভোটের মাধ্যমে। বাংলাদেশেও এ রকম অনুষ্ঠান শুরু হয় ক্লোজ আপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে এবং তারপর আরও অনেক অনুষ্ঠান এখানে হয়েছে। সে যাহোক, কথা হচ্ছে, এসব অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বেই বিচারক ও দর্শকদের কাছ থেকে কম ভোট পেয়ে কাউকে না কাউকে সরে দাঁড়াতে হয়। যাকে সরে যেতে হচ্ছে তাকে ঘিরে মঞ্চে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করা হয়। প্রায়শঃই বিচারকরা কাঁদেন, সেটে উপস্থিত দর্শকরা কাঁদেন এবং প্রার্থী নিজে তো কাঁদেই। ঠিক এরকম সময়ই বিচারকরা পরাজিতকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলেন, তুমি তো পরাজিত হওনি, এ পর্যন্ত এসে তুমি ফিরে যাচ্ছ চ্যাম্পিয়ন হয়েই!! বলাই বাহুল্য, একথা কথার কথা। এর ভেতর কোন সত্যতা নেই, তা প্রার্থী নিজে তো বোঝেই, বিচারকরাও বোঝেন, দর্শকও বোঝে। আসলেই যে প্রতিযোগীকে ফাইনাল রাউন্ড থেকে ফিরে যেতে হচ্ছে তাকে এ পর্যন্ত পৌঁছুতে তো জীবনপাত করতে হয়েছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং কখনও কখনও বিচারকদের ঘুষ দেয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে তাকে এ পর্যন্ত পৌঁছুতে হয়েছিল। ফলে ফিরে যাওয়াটা একটা কষ্টকর, গ্লানিকর এবং দুঃখজনক ঘটনা বটে। রিয়েলিটি অনুষ্ঠান নিয়ে এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই, আওয়ামী লীগের প্রার্থী গাজীপুর পৌরসভা নির্বাচনে লাখখানেক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এটা কোন টিভি রিয়েলিটি শো নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক জীবনের তীক্ষ্ণ বাস্তবতা এটি।
২০০৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজনে এবং তাতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে আওয়ামী লীগের মতো বৃহত্তর রাজনৈতিক দলকে এককভাবে চরমতম পরিশ্রম করতে হয়েছে। তারপর ক্ষমতায় এসেও এই দলটিকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ঘরের ভেতরের ও বাইরের বহু শত্রুর ক্রমাগত আক্রমণ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, দলটির নেতাকর্মীরা এখন কেমন যেন একটু ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত।
ঠিক সেই সময়ে গাজীপুরসহ পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ে আজকাল যারা আওয়ামী লীগকে টিভি রিয়েলিটি শো’র হেরে যাওয়া প্রার্থীর মতো সান্তনা দিচ্ছেন, তারা আসলে দলটির প্রকৃত শুভাকাঙ্খী নন। বরং এখন যদি সত্য দিয়ে আঘাত না করা হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত এ দেশ যে পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা পুষিয়ে ওঠা এদেশের পক্ষে আর কখনওই সম্ভবপর হবে বলে আমি মনে করি না।
রাষ্ট্র ও দল পরিচালনায় আওয়ামী লীগের ভুলভ্রান্তি যথেষ্ট ছিল এ কথা দৃঢ়ভাবে বলতে না পারলে দলটির প্রতি সুবিচার করা হবে না। কিন্তু তাই বলে আজকে যারা ঢালাওভাবে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পরাজয়কে সরকারের ব্যর্থতা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন তারাও সর্বৈব মিথ্যে কথাই বলছেন। বাংলাদেশ নিয়ে প্রায়শই একটি কথা সকলে বলে থাকেন যে, এদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন। অখ- ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বার বার বাঙালী সে প্রমাণ দিয়েছে। আমি এখানে এ বিষয়ে সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করছি।
হ্যাঁ মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণে শিক্ষিত বাঙালী হিন্দু জনগোষ্ঠী এদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের বক্তব্য ও অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধ্য হয়েই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকেই যখন এদেশে শিক্ষিত বাঙালী হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে আমাদের ক্রমশ সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসংখ্যানও ততটাই বেড়েছে। এ কথা আমার কলামের অনেকেই হয়ত ভালভাবে গ্রহণ করবেন না, কিন্তু এ বিষয়ে গবেষণা হওয়াটা জরুরী এবং তাতে আসল সত্য সঠিকভাবে বেরিয়ে আসবে বলে বিশ্বাস করি। বাঙালী মুসলমানের কিছু আত্মঘাতী প্রবণতা রয়েছে যা আমরা বিগত শতাব্দী থেকে চলতি শতকে কম বেশি প্রমাণ পাই। যেমন ভারত ভাগে বাঙালী মুসলমানের অবদানকে যদি বাদও দিই তাহলেও একাত্তরে মুসলমানদের একটি অংশের পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকে কোন্‌ চারিত্রিক গুণাবলী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, বলুন? তেমনই চীনের পক্ষ নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকেই বা আমরা কিভাবে দেখব? এবং তারপর স্বাধীনতার মাত্র ৪ বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়টিই বা আমরা ভুলি কী করে? যাহোক, এ রকম আত্মঘাতী প্রবণতার বহু উদাহরণ দেয়া যায়। তবে এতে তিক্ততাই বাড়বে কেবল। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতিতে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি তাতে আওয়ামী লীগের মতো মুক্তিযুদ্ধেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দলের পক্ষে টিকে থাকাটাই মুষ্কিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সত্য আমাদের এখন স্বীকার করার সময় এসেছে।
বিষয়টি আমি একটু পরিষ্কার করে বলতে চাই। প্রয়োজনে এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহেও লিখব, যদি পাঠক কিছু মনে না করেন। যে কথাটি একটু আগেই বলেছি যে, এক শ্রেণীর বাঙালী মুসলমান-মানসে নানাতর অসঙ্গতি রয়েছে। বিশেষ করে ধর্ম গেল ধর্ম গেল বলে এক ধরনের শঙ্কা তাদের ভেতর প্রবলভাবে কাজ করে। ফলে যে কেউ, সে যদি খুনী, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজও হয়, তাহলেও কেবল একটিবার যদি ধর্ম গেল বলে জিগির তোলে তাহলে তার পেছনে অনেকে ঢাল তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। ধর্ম যে আসলে যাওয়ার মতো কোন বিষয় নয় সে সত্য আবিষ্কার করতে তাদের আরও বহু বছর লাগবে বলে মনে হয়। আজকাল অসংখ্য বাঙালী মুসলমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু বিদেশে তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের পরিচয়ে আর বাঙালিত্ব নেই; তারা এখন মুসলিম পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবং তারা মূলত পাকিস্তানী ও আরবের অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গেই সম্পর্কে বেশি আগ্রহী।

ফলে এদেশে থাকতে তারা যতটা উদার ও গণতন্ত্রমনা ছিলেন বিদেশে গিয়ে তারা সেটুকু প্রায় ধুয়ে মুছে ফেলেছেন বলতে গেলে। এই প্রবণতা আজকের বাংলাদেশেও আমি দেখতে পাই। দেশটির সচ্ছল জনগোষ্ঠীর ভেতর রীতিমতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে আরও বেশি করে ‘মুসলমান’ হওয়ার। জন্মসূত্রে যে মানুষটি এই ধর্ম পরিচয়ে পরিচিত তার তো আর নতুন করে মুসলিম হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোথায় যেন দ্বন্দ্ব, কোথায় যেন অবিশ্বাস, যেন ঠিকমতো মুসলমান হওয়া হয়ে উঠছে না। আর সেই চিন্তা থেকেই বিগত চল্লিশ বছরে এদেশ ধর্মপ্রাণ থেকে ধর্মান্ধ হয়েছে অনেক বেশি। ধর্মপ্রাণ আর ধর্মান্ধে যে ব্যাপক-বিপুল ফারাক তা বোঝার মতো ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ফলে সমাজের ভেতর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ‘ঈমানদারিত্বের’; যে কেউ চাইলেই মানুষের ঈমান পরীক্ষার খেলা খেলতে পারে। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি যে, রাজনৈতিকভাবে এই ঈমান পরীক্ষা নিয়ে কতটা নোংরা খেলা এদেশে চলেছে। এবং আমি নিশ্চিত যে, আগামী নির্বাচনেও ধর্মের নামে এই নোংরা খেলা ব্যাপকভাবে চলবে ও মানুষ তাতে বিভ্রান্ত হবে। কারণ, আগেই বলেছি যে, নিজের প্রতি, বিশ্বাসের প্রতি আস্থাহীনতা বাঙালী মুসলমানকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি করে দিয়েছে। এর থেকে সহসা উত্তোরণের কোনো পথ আমি খোলা দেখছিনে।
একটি দেশ কতটা উন্নত তা বোঝার জন্য সে দেশের জিডিপি জানাটাই যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে আরবভূমের বিভিন্ন দেশ যেমন সৌদি আরবের জিডিপি পশ্চিমের অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সৌদি আরবকে কোনভাবেই উন্নত দেশ বলে কেউ স্বীকৃতি দেয় না। অনেকেই হয়ত তর্ক করতে পারেন যে, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অনেকখানি এগিয়ে গেছে।
হ্যাঁ, স্বীকার করছি যে, আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যা প্রতিবছর ৪% করে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই সত্যকে স্বীকার করেও এ কথা বলতেই হচ্ছে যে, এ দেশের বহিরাঙ্গে উন্নয়ন ঘটেছে ঠিকই; কিন্তু অন্তরাঙ্গে এদেশের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। আমি এই অন্তরাঙ্গেও উন্নয়ন বলতে মানসিক উন্নতিকে বোঝাতে চেয়েছি। প্রগতিশীল গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির দোহাই দিয়ে যে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাঙালী বাংলাদেশ এনেছিল মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই নিজেরা হানাহানি করে সে দেশকে অগণতন্ত্রে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াকে কোন সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা মুশকিল। যে সেনাশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঙালী যুদ্ধে নেমেছিল সেই সেনা শাসন দীর্ঘ দুই দশক এদেশে টিকে ছিল কেবল নয়, তারই জঠর থেকে বেরিয়ে এসেছিল সাম্প্রদায়িক, উগ্র জাতীয়বাদী রাজনৈতিক দল এবং বাঙালী দলে দলে গিয়ে তার ছায়াতলে আশ্রয়ও নিয়েছে। এটা দোষের কিছু নয়, রাজনীতি উন্মুক্ত হলে মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলে যোগ দেবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে তো ঘটনা ঘটেছে উল্টো, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ বিলিয়ে নেতাদের দলে টানা হয়েছে আর সাধারণ জনগণের তো উপায় নেই, তারা পেশীশক্তির কাছে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাকে বিসর্জন দিয়ে নেতাদের দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হয়ে টিকে থাকতে চেয়েছে। অপরাজনীতির কাছে সত্যিকার রাজনীতির এই যে পরাজয় তা যে ৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়েছে তা আসলে যতবারই বলি না কেন কম বলা হবে। এই সত্য নিয়ে আমরা এগুতে এগুতে একদিন দেখতে পাই যে, এদেশে রাজনৈতিক সত্য বলতে কিছু নেই, যা কিছু আছে তা রাজনৈতিক মিথ্যাচার, ইতিহাসকে অস্বীকার করা এবং ধর্মকে সাধারণ্যের কাছে এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে একটু তোড়ড়-মোড়ড় করেই ধর্ম দিয়ে স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব হচ্ছে। এখন বলুন, এই যে এতো শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি, এত্তো এত্তো প্রবৃদ্ধি কোন্ কাজে লাগবে যদি মানুষের বিচারবুদ্ধি আর বিবেচনাবোধকেই জাগাতে না পারলেন? বিদেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তির ডিগ্রী নিয়ে এসেও যখন এদেশে ধর্মীয় রাজনীতির শেকলে বাঁধা পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিককদের অনেকেই তখন এদেশের উন্নতি, প্রযুক্তি আর উদারতার কপালে কুড়োলের কোপচিহ্নই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণতন্ত্রের পথে যে কুড়োল আসলে কোদাল হয়ে গর্তই তৈরি করে কেবল; যেমনটি হয়েছে পাকিস্তানে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.