আমার টাকা আমার, তোমার টাকাও আমার

তামান্না ইসলাম: আমার এক বন্ধু গল্প করছিল। তার এক পরিচিত আমেরিকান জুটি অনেকদিন চেনাশোনার পর ঠিক করলো তারা এক সাথে থাকবে, তারপরে সিদ্ধান্ত নেবে তারা বিয়ে করবে কী করবে না। পাশ্চাত্যের খুব সাধারণ জীবনযাপন পদ্ধতি। থাকতে গিয়ে দেখা গেলো সবকিছুই সুন্দর ভাবে আগাচ্ছে, বেশ বোঝা পরা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধ, ভালো বাসাবাসি, আবেগ,  সবই ঠিকঠাক।

শুধু একটা জায়গায় বড় রকমের সমস্যা। মেয়েটার খরচের হাত অনেক বেশি। ছেলেটা হিসেবী। কিন্তু সংসারে তো দুজনেরই সমান দায়িত্ব। তাই এই ব্যাপারে ছোটখাটো মনোমালিন্য দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে সেটা একটা বিরাট আকার ধারণ করে। ছেলের অভিযোগ মেয়ে অকারণে ফালতু খরচ করে, মেয়ের অভিযোগ তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ঝামেলার জল অনেকখানি গড়ানোর পর আসন্ন বিয়ের সম্ভাবনা যখন প্রায় উবে গেছে, তখন অনেক চিন্তা ভাবনা করে তারা একটা সমাধানে আসলো।

সংসারের মূল খরচগুলোর জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার তার একটা আনুমানিক হিসাব করে তারা একটি জয়েন্ট একাউনট খুললো। সেখানে ছেলে এবং মেয়ে অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে দিত মাসের শুরুতেই। এর বাইরে তাদের আয়ের যে টাকা, সেটা খরচের ব্যাপারে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা।

মেয়েটা চাইলে শখের জিনিসে টাকা ব্যয় করবে আর ছেলেটা চাইলে জমাবে। এভাবে দেখা গেল, মেয়েটার অকারণে টাকা উড়ানো কিছুটা কন্ট্রোল হলো, কিন্তু স্বাধীনতা নেই বলে ক্ষোভ তো তার আর নেই। এদিকে ছেলেটারও দুশ্চিন্তা কিছুটা কমলো। অন্তত সংসার কীভাবে চলবে সেই টেনশন তো করতে হচ্ছে না। কী সুন্দর সহজ একটি সমাধান।

সংসারে টাকা-পয়সা, আয়-ব্যয় নিয়ে খিটিমিটি হয়তো অনেক সংসারেই খুব সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে যেখানে ব্যয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি, আর এ ব্যাপারে দুজনের দুধরনের মতামত। কিন্তু বাঙ্গালি সংসারে আয়-ব্যয়ের এই ব্যাপারটি অনেকটা জুলুমের পর্যায়ে চলে যায়।

স্বীকার করছি যে ইদানীং কিছু আধুনিক পরিবারে এমন বউও আছে যাদের চাহিদা অতিরিক্ত, স্বামীর আয় বা তার উৎস সম্পর্কে তারা কিছু জানে না, জানতে চায়ও না, এই পরনির্ভর জীবন নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথাও নেই যতক্ষণ নিজের ইচ্ছামতো খরচ তারা করতে পারবে, তাদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক স্বামীকে অসৎ পথেও আয় বাড়াতে হয়।

এদের পাশাপাশি একটা বিরাট অংশ আছে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কর্মজীবী নারী। এদের কাজ করতে গেলেও স্বামী, শাশুড়ির অনুমতি নিয়ে কাজে যেতে হয়। কাজে থাকা অবস্থায় বাচ্চার লালন-পালন কে করবে, সেই ব্যবস্থাও একা করতে হয়, স্বামীর খেদমতে যেন কোন ত্রুটি না হয়, সেদিকেও তীক্ষ্ণ মনোযোগ দিতে হয়। কিন্তু এতোকিছুর পরেও যে অর্থ তারা উপার্জন করে, সেটায় তাদের কোন অধিকার নাই। সেই টাকায় পূর্ণ অধিকার স্বামীর। সেই টাকায় অধিকার শ্বশুর বাড়ির। স্বামী যদি বেকার হয়, এমনকি সক্ষম স্বেচ্ছায় বেকার, তাহলে বউয়ের সেই উপার্জনে সংসার চলে। নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে সেই টাকায় স্বামী দেবতার মদ, গাঁজার পয়সাও জুটাতে হয়।

মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে চিত্রটা আরেকটু ডিপ্লোম্যাটিক। মুখে সরাসরি না বললেও এটা অলিখিত চুক্তি। মেয়ে মানুষ চাকরি করো এই বেশি। অর্জিত অর্থটা যেন সেই স্বাধীনতাটুকুর দাম। মেয়েদের অর্জিত টাকা পুরোটাই যাবে সংসারে, হয়তো ছেলেদেরটাও যায়। কিন্তু পার্থক্য আছে। একজন উপার্জনশীল স্ত্রী, এমনকি তার উপার্জন যদি হয় স্বামীর চেয়েও বেশি, স্বামীর অনুমতি ছাড়া অর্থ খরচ করতে পারে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

নিজের শখ মেটাতে আমি অনেক কর্মজীবী নারীকে স্বামীকে না জানিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে চুরি করে খরচ করতেও দেখেছি। আর সেই খরচ যদি হয় নিজের বাবা, মা, ভাই বোনের জন্য, তাহলে আজও বাঙ্গালি মেয়েরা বিরাট অপরাধ বোধে ভোগে।

যেন অন্যের টাকা চুরি করে নিজের বাবা-মাকে দিয়ে দিচ্ছে। মায়ের ডাক্তার দেখানো, বাবার ওষুধ কেনা, ছোট ভাইবোনদের পড়ার খরচ দেওয়ার মতো অতি প্রয়োজনীয় জরুরি কাজের জন্য টাকার দরকার হলেও আজও মেয়েরা মুখ কাচুমাচু করে ইনিয়ে বিনিয়ে স্বামীর কাছে সেই প্রস্তাব দেয়। সেই অপরাধবোধের সাথে মিশে থাকে তীব্র ঘেন্না, নিজের মেয়ে জন্মের উপরে ঘেন্না।

নিজের কাছে নিজেকে ছোট করতে করতে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করে। আমাদের ছাঁচে গড়ে দেওয়া বাঙ্গালি নারী মন একবারও বলে না, ‘এটা আমার অধিকার, আমার উপার্জনের টাকায় আমার বাবা, মায়ের অধিকার সবার আগে, তারা আমাকে তৈরি করে না দিলে আজ আমি এই উপার্জন করতে পারতাম না’।

ছেলেদের ক্ষেত্রে কিন্তু এটা হয় না একেবারেই। অনুমতির কোন দরকার নেই, অপরাধবোধের প্রশ্নই উঠে না। বিয়ের চুক্তিতে সই করার সাথে সাথে আরেকটা অলিখিত চুক্তিতেও সই করিয়ে নিয়েছে যে পতিদেবতা, সেটা হলো, ‘আমার টাকা আমার, তোমার টাকাও আমার ………’।  

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.