ধর্ষণ মূলত: পুরুষের ক্ষমতার(?) বিকৃত-প্রকাশ

গিয়াস উদ্দিন: সোহাগী জাহান তনু। নামটা আমাদের খুব চেনা। এই নামটা ঘিরেই মুহূর্তে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলার আম-জনতা। ঘটনাটা কী ছিলো? কুমিল্লার এক সেনানিবাস চত্বরে রাস্তার পাশে এক ঝোঁপ থেকে উদ্ধার হয় ওড়না ঢাকা তার অর্ধনগ্ন মৃতদেহ। তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিলো। এই নিয়েই উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা বাংলাদেশ।

ধর্ষণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এইটুকু পড়তে যতোটুকু সময় লাগলো তার মধ্যেই হয়তো এই বিশ্বের কোথাও না কোথাও ধর্ষিতার তালিকায় নাম লেখালেন কোনও এক নারী। এবং বহু ক্ষেত্রেই গণ-পরিসরে ধর্ষণের দায় গিয়ে পড়ে ধর্ষিতার ঘাড়েই। যুক্তিগুলো মোটামুটি একই। নারীর পোশাক, তার চলন বলন ও আচরণ, তার অতি-সাহসিকতা ইত্যাদি।

সোহাগী জাহান তনু

মন্তব্য উঠে আসে, কীসব খোলামেলা পোশাক পরে থাকে, এদের সঙ্গে তো এ সব হবেই। মানে নারীর পোশাকই আসলে ধর্ষককে ‘প্ররোচিত’ করে অনেকাংশে। কিংবা রাত-বিরেতে একা একা ঘুরবে আর অঘটন ঘটলে চেঁচাবে!!! হ্যাঁ, এই কথাগুলোর সঙ্গে আমরা মোটামুটি পরিচিত। মানে ধর্ষণের দায় অনেকটা ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীরই। এবং এই মতের ধারক এবং বাহক আমাদের সমাজের বহু মানুষ। নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নেতা-জনতা নির্বিশেষে।

তনুর কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করার একটি কারণ আছে। সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাকে ঘিরে দেশের গণপরিসরের আলোচনায় তার পোশাকের বিষয়টিও চর্চায় এসেছে। তবে অন্যভাবে। কারণ তনু কিন্তু হিজাব পরা একজন নারী। আর সেক্ষেত্রে পোশাকের ‘অ-শালীনতা’ কিংবা ‘প্ররোচনা’-র বিষয়টিও এখানে আসে না। তারপরেও ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হতে হয় তাকে। আর তার জন্যই হয়তো তনু আম-জনতার সহানুভূতি এতো বেশি করে আদায় করতে পেরেছে। তনু যদি খোলামেলা পোশাক পরা কোনও নারী হতো, তাহলে হয়তো এই ধর্ষণই ন্যায্যতা পেয়ে যেতো অনেকের কাছেই। এমন পোশাক পরে রাস্তায় ঘুরলে এমন তো হবেই!!!

আমরা কোনওভাবেই ধারণায় আনতে পারি না যে ধর্ষণের সঙ্গে নারীর পোশাকের কোনও যোগ নেই। ধর্ষণের মূল বিষয়টি হলো নারী শরীরের উপরে পুরুষের ক্ষমতার প্রয়োগ। আর পুরুষকে এই ক্ষমতা দেয় সমাজের চলমান পুরুষতন্ত্র। যে পুরুষতন্ত্র নারীকে পুরুষের অধীন হিসেবে সত্যতা দেয়। নারী হয়ে ওঠে পুরুষের ভোগের ক্ষেত্র। সেখানে নারীর সম্মতির কোনও প্রশ্ন নেই, পুরুষ যেমন চাইবে তেমনটাই হবে। পোশাক যদি ধর্ষণের কারণ হতো, তাহলে নাবালিকা ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো না, ঘটতো না তনুর ক্ষেত্রেও এই ঘটনাটি। কিন্তু এই সব কিছুই ঘটে চলেছে আমাদের সমাজে।

কিছুদিন আগে ভারতের মধ্যপ্রদেশের সিংগ্রাউলি জেলায় অভিযোগ উঠেছে ক্লাস টু-এর এক মেয়েকে হোমওয়ার্ক না করার অপরাধে ধর্ষণ করে তার শিক্ষক। তবু সামাজিক ধারণায় নারী ধর্ষণের সঙ্গে বারবার ফিরে ফিরে আসে নারীর পোশাক এবং ‘অশালীনতার’ বিষয়টি।

লেখক: গিয়াসউদ্দিন

ঠিক এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় দিল্লীর ঘটনাটিও। যে ঘটনাটি ঘিরে উত্তাল হয়েছিলো গোটা ভারত। সেই ঘটনাটিতেও ধর্ষণ এবং খুনের শিকার তরুণীটি রাতে তার বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলো। মানে সে একা একা নয়, সঙ্গে পুরুষকে নিয়ে রাতের রাস্তায় ছিলো। তার পোশাকের ‘অশালীনতা’ নিয়ে কোথাও কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু তারপরেও তাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিলো।

তনুর ঘটনাটির সাপেক্ষে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। মেয়েটি যদি রাত-বিরেতে একা থাকতো, যদি খোলামেলা পোশাকের থাকতো কিংবা কোনও নাইট-ক্লাবে আনন্দ করে বাড়ি ফেরার পথে এই ঘটনা ঘটতো, তাহলে কি গোটা দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ভাষা এতোটা জোরালো হতো? নাকি সেদিনের প্রতিবাদী অনেকেই পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে বলতেন, রাত-বিরেতে এরা একা বেরোয় কেন, খোলামেলা পোশাক পরে কেন কিংবা নাইট ক্লাবে হুল্লোড় করতে যায়ই বা কেন?

ধর্ষণ আসলে পুরুষের ক্ষমতার বহি:প্রকাশ। ধর্ষণ হলো পৌরুষের একাধিপত্যের নিশান। ঠিক সেই কারণেই প্রতিপক্ষ দেশকে ক্রিকেটে হারিয়ে আনন্দে উদ্বেল হয়ে লোককে বলতে দেখা যায়, আজ পুরো ‘রেপ’ করে দিলাম ওদের। ধর্ষণের সঙ্গে পোশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের আধিপত্য এবং ক্ষমতার সঙ্গে। সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাটি তা ফের প্রমাণ করে দেয়।

যতোদিন পুরুষতন্ত্র জারি থাকবে, যতো দিন পুরুষ নারী শরীরকে তার ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্র মনে করবে, ততোদিন নারী যা পোশাকই পরুক না কেন তার উপরে ধর্ষণ চলবেই। আর এই ধারণাগুলো যেদিন লোপ পাবে সেদিন কোনও নারী নগ্ন হয়ে রাস্তায় বেরোলেও তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হবে না।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.