এটা বিয়ে নয়, যৌন নির্যাতনের সুব্যবস্থা!

জিনাত হাসিবা: শিশু বিবাহ (বাল্যবিবাহ বলে বহুল পরিচিত) বাংলাদেশে এখনো বেশ প্রচলিত চর্চা, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান (“বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ায় বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়ে থাকলে তা অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না, কিংবা অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবেনা”) এর বদৌলতে এর পক্ষের এবং বিপক্ষের বিবিধ যুক্তিও আমাদের অজানা নয়

যেটা আমরা জেনেও জানি না তাহলো সবাই মিলে উৎসব করে শিশুদের ধর্ষণের সুব্যবস্থা করে দেওয়ার নাম হলো শিশুবিবাহ বা বাল্যবিবাহ এখন এই মেয়ে ধর্ষণের শিকার হবে কী, হবে না, তা যে লোকের হাতে তাকেতুলে দেওয়াহলো তারবিচারবিবেচনাএবং ‘ঐ মেয়ের ভাগ্যের’ উপর নির্ভর করে দিনশেষে সবইসৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা

মিনতির (ছদ্মনাম) বয়স কী ১০ জন্ম নিবন্ধনে যদিও বেশি এখনো তার পিরিয়ড/মাসিক হয়নি কয়েক মাস আগে তার বিয়ে হয় এক পূর্ণ বয়স্ক ডিভোর্সড ব্যক্তির সাথে এই সম্পর্ক থেকে মিনতি বের হয়ে আসতে চায় এই ব্যক্তি জোরপূর্বক মিনতির সাথে যৌন মিলনে গেছে আমরা বুঝতে চাই না এর নাম ধর্ষণ

নুসরাত (ছদ্মনাম) ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে তিন বছর আগে বিয়ে হয় তার মাত্র একদিন ছিলো সে তার শ্বশুরালয়ে একদিন পরেই সে ফিরে আসে আর ডিভোর্স নেয় ধর্ষণের স্বীকার হয়েছিলো সে সেই রাতে এখনো সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু স্কুলে ফিরেছে সে কিন্তু এই সংগ্রামের আলাদা গল্প আছে।

মালিহার (ছদ্মনাম) বয়স ১৩ সে যখন ক্লাস ফোর পড়ে তখন তার প্রথম বিয়ে হয় স্বামীর কাছে ধর্ষণের শিকার হয়ে সে ডিভোর্স নেয় স্কুলে ফিরে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে আবার বিয়ে

ক্লাস টু তে পড়া অবস্থায় ১২ বছরের বড় একজনের সাথে প্রথম বিয়ে হয় ফিরোজার (ছদ্মনাম)শরীরটার উপর সেই অত্যাচারের স্মৃতি এখনো তাড়া করে তাকে। কয়েকদিন সে হাঁটতে পারেনি। ডিভোর্স হলো। ক্লাস থ্রি-তেই দ্বিতীয় বিয়ে। শ্বশুরবাড়ির ঝামেলা পোহাতে না পেরে ফিরে আসা। ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায় নিজের পছন্দে ক্লাস নাইনে পড়ুয়া একজনকে বিয়ে করেই সন্তান সম্ভবা। দুজনেরই পড়া বন্ধ হয়ে গেছেফিরোজার কেসটার বিষয়ে আরেকটু বলার আছেসে ‘নিজের পছন্দে’ বিয়ে করে সন্তান-সম্ভবা, যাকে এই বিশেষ বিধানের কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

লক্ষণীয়,তার আগেই কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছাতেই দুইবার বিয়ে হয়েছে ফিরোজার। সেই বাবা-মায়েদেরই হাতে দিতে চাইছি এই শিশুদের বিয়ে দেবার ক্ষমতা স্বরূপ আইনী সায়? ৩৫টি কেসের মধ্যে এই একটি মাত্র কেস এসেছে যেখানে ছেলে-মেয়ে নিজ পছন্দে বিয়ে করেছে। করেছে কারণ এলাকায় বিয়ের বয়স হিসেবে শিশু বয়সটাই গ্রহণযোগ্য, ‘প্রযুক্তির পাল্লায় পড়েছে’ বলে নয়। সুতরাং শিশু বিবাহের চল নিরোধ করাতেই আমাদের সমস্ত মনোযোগ হওয়ার কথা এখন, ‘সতীত্ব-নির্ভর সামাজিক সম্মান রক্ষায়’ নয়। এই তথাকথিত সম্মান নয়, শিশুদের জীবন আগে

উপরের ঘটনাগুলো একটি গবেষণায় উঠে আসাকেসএর অংশ একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করার সুবাদে আমার কাজের পরিধি গবেষণা আর গবেষণার ফলাফল জানা ও জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ (বলে রাখা ভালো আমার মূল ভূমিকা ঠিক গবেষকেরও নয়গবেষণার বিষয় খোঁজা, গবেষক নির্বাচন, গবেষণার লক্ষ্যউদ্দেশ্য ঝালাই, গবেষণা ঠিক পথে রাখার জন্য সমস্ত তথ্য সংগ্রহের কলাকৌশল তথ্য বিশ্লেষণে পদে পদে লেগে থাকা, গবেষণার রিপোর্ট নীতি নির্ধারন/সংশোধনে বা কর্ম এলাকায় কী কাজে লাগতে পারে তা নির্ধারণে সহায়তা করা আমার কাজ)

গতবছর স্থানীয় তরুণ গবেষকদের উন্নয়ন গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য একটা কাজ হাতে নিয়েছিলাম তারই সুবাদে অনেক কর্ম এলাকার মধ্যে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার নাম উঠে আসে, বিষয় শিশু বিবাহ গবেষণার আগে গেলাম সাপাহারের পাতাড়ি ইউনিয়নে স্কুল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কিছু অভিভাবক আর গ্রামের অন্যান্য শিশুদের সাথে দুটো দিন গল্প করে বুঝলাম ঘটনা সত্য এই এলাকার বিশেষত্ব শিশু বিবাহে নয়, ‘বিবাহযোগ্যবলে বিবেচিত শিশুদের বয়সে, এবং শিশু বিবাহের হারে

অন্যান্য এলাকায় শিশু বিবাহের বয়স সাধারণত ১৩১৭ কিন্তু এলাকায় এই শিশুদের বয়স ১৬! গবেষণার জন্য সিলেক্টেড হয়ে কাজ শুরু করলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থী ইতিরানী বিশ্বাস আর আরিফ ইসলাম গুণগত পদ্ধতি অবলম্বন করে স্বল্প পরিসরে থেকেও গভীরে গিয়ে গবেষণা ছিলো তাদের মূল কৌশল এর জন্য তারা এক সপ্তাহ রাতদিন থেকেছে পাতাড়িরই দুই বাসায় বিভিন্ন পর্যায়ের, বিভিন্ন ধরনের মানুষের কাছ থেকে তুলে এনেছে গবেষণার তথ্য শিশুবিবাহের মোট ৩৫টি কেস স্টাডি (৩১ জন মেয়ে, জন ছেলে) এই গবেষণার মূল এছাড়া সরকারীবেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের মতামত রেকর্ডের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হয়েছে প্রাপ্ত তথ্য

২০১৫ এর শুরুতে কল্মুডাঙা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল ৮০ জন বছর শেষ হতে হতে ৪৭ জনের বিয়ে হয়ে গেছে ফেরেনি আর স্কুলে গত বছর যেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিলো ২০০ সেখানে এখন কমে হয়েছে ১৫০ এবং ঝরে পড়া এই ৫০ জনের প্রত্যকেরই বিয়ে হয়ে গেছে একই বছর বলদিঘাট প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ফাইভের ৬৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জন স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এদের মধ্যে যাদের ডিভোর্স হয়েছে তারাও আর স্কুলে ফেরেনি সহপাঠীদের প্রশ্নবাণ আর যাতায়াতের পথে কটুক্তি শোনার ভয়ে কেউ গার্মেন্টসে কাজ করতে গেছে, কেউ নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছে একবার নয়, শিশু অবস্থাতেই একাধিকবার বিয়ে হচ্ছে শিশুদের যে মেয়েটা ফিরে এলো বড় ধরনের ধাক্কা খেয়ে, পরিবার এবং সমাজ আবারো তটস্থ হচ্ছে তার পরবর্তী বিয়ের আয়োজনে

কারণ অনেক তবে এই অনেক কারণকে পর্যালোচনা করে মূল কারণ হিসেবে গবেষকেরা পৌঁছেছে একটা কারণে এলাকায় বহুদিনের সামাজিকসাংস্কৃতিকধর্মীয় চর্চা এবং একে ধারণ করার প্রয়াস যা কিনা শিশুবিবাহকে নানাভাবে অনুমোদন দিচ্ছে, উৎসাহিত করছে একটু ভেঙে বললে বলা যায়, হিন্দুমুসলিমসচ্ছলঅসচ্ছলশিক্ষিতনিরক্ষর নির্বিশেষে প্রায় সবাই এখানে শিশুবিবাহের সাথে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত হিন্দুমুসলিম নির্বিশেষে এখানকার লোকে ভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতে যতো দেরী হবে বাবামায়ের পাপ বা গুনাহর বোঝা ততো ভারী হবে মেয়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজের বিভিন্ন মহলঅবিবাহিত মেয়ের পিতামাতা এবং সেই মেয়েটিরউপর চড়াও হবে নানা উপায়ে তাদের হিসেবেবিয়ের সময়/বয়সপেরিয়ে গেলে নানা অপবাদ দিয়েএক ঘরেকরে রাখার চর্চাও আছে

তখন আর কখনোই মেয়ে বিয়ে না হবার ভয় তো আছেই (মেয়েরা গার্মেন্টসে গিয়ে উপার্জন করবে এটা গ্রহণযোগ্যতা পেলেও মেয়েদের জীবনে বিয়েই সর্বোত্তম বলে গণ্য) তাই পরিবারগুলো একে ধর্মীয় সামাজিক দায়িত্ব বলে লালন করছে

শিশুবিবাহের ফলে মেয়েদের পুষ্টিহীনতা, শরীরের ক্ষয়ের কথা বলে এখানে কাজ নেই তার কারণটা অন্যদিক থেকে সংস্লিষ্ট সরকারের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর যেসব উদ্যোগ আছে সবই মেয়েদের ঘিরে জন্মনিয়ন্ত্রণের পুরো ভার দেওয়া মেয়েদের কাঁধে মাঠকর্মীরাও নারী, যেন নারীদের কাছে সেবা পৌঁছাতে সুবিধা হয় বিবাহিত মেয়েরা এই পিল/বড়ি খেয়ে শরীরে দ্রুত বেড়ে উঠছে স্টেরয়েডের কারণে যার কুফলগুলো কারো চোখে পড়ছেনা, বাবামা দেখছেন বিয়ে পর মেয়েরাডাঙর হয়ে উঠছে, তাদেরস্বাস্থ্যভালো হচ্ছেতাই শরীরের কী কী ক্ষতি হচ্ছে তা বোঝানোর জন্য পরিবার-পরিকল্পনা সংক্রান্ত সরকারি কাজগুলোতে কৌশলগত পরিবর্তন জরুরি নইলে সরকারীবেসরকারী সংস্থাথাগুলোর শিশু/বাল্যবিবাহ বিরোধীসচেতনতামূলক কার্যক্রমঅরণ্যে রোদন হয়েই থাকবে

সরকার বিশ্বের কাছে দায়বদ্ধ শিশুবিবাহ নিরোধে উন্নয়নকর্মীরাও কাজ করছেন হতাশা, আত্মতৃপ্তি, আশা, দুরাশা, উচ্চাশা সব নিয়েই চেষ্টা চলছে কিন্তু সচেতনভাবে হোক বা অসচেতনতায় হোক, শিশুবিবাহের সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মাতৃত্বজনিত বিষয়গুলোতে যেভাবে আলোকপাত করা হয়েছে তার কিছুমাত্রও করা হয়নি মেয়েটির শরীর, যৌন সুস্থতা অধিকার, মন জীবনের উপর সংখ্যার খোঁজ, তথাকথিত উন্নয়নে অংশীদার হওয়া আর জার্গন চর্চার ঘনঘটা থেকে বের হয়ে এক একজন মানুষের জীবনের আনাচ কানাচের কষ্টগুলো দেখা জরুরি

সমস্যার প্রলেপে চোখ বুলানোর চেয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে তথাকথিতব্যক্তিগত বিষয়গুলোর ভয়াবহতার দিকে তাকানো জরুরী যৌনজীবন ততোক্ষণ ব্যক্তিগত যতক্ষণ তাতে সহিংসতা বা নির্যাতন নেই শিশুবিবাহ বন্ধে করতে চাইবো অথচ শিশুদের যৌনজীবনকে অস্বীকার করে করবো-এমন নিষ্ফল চেষ্টায় কেন সময় ক্ষেপন? শিশুবিবাহকেসমাজের প্রথাগত ক্ষতিকর চর্চাহিসেবে নয়, শিশুর প্রতি শারীরিক, মানসিক যৌন নির্যাতনহিসেবে দেখা চাই সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন চাই বিষয়ে আইন আছে, আইনের প্রয়োগ নেই; জড়িয়ে আছে জনপ্রতিনিধিদের ভোটের হিসাব নিকাশ পাতাড়িতে দেখা গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসার সংখ্যা এতো বেশী এবং পাশ করা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান এতো অপ্রতুল যে বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজী পাওয়া না গেলে ইমাম, ইমাম পাওয়া না গেলে মুয়াজ্জ্বিন- এ ধরনের সহজপ্রাপ্যতা হরে দরে আইনের এক্ষেত্রে কোনো পরোয়া নেই আর জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে নেওয়ার চর্চা তো আছেই এখানকার মানুষের মনে, অনুভূতিতে, আত্মায়, বেড়ে ওঠার প্রতি ধাপে গাঁথা এই নির্যাতনের গ্রহণযোগ্যতা এর বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে ভোট হারানোর দৃঢ়তা নেই স্থানীয় প্রশাসনের

শিশু বিয়ে বন্ধে কিন্তু পরোক্ষ পদক্ষেপ অনেক বেশী শক্তিশালী প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের জন্যবঙ্গমাতা ফজিলতুন্নেসা ফুটবল কাপশিশুবিবাহের চর্চাকে একটু হলেও দুর্বল করার সুযোগ তৈরী করছে এখানে ফুটবলের এই প্রতিযোগিতায় মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও মন কাড়ার মতো তবে তাও নির্ভরশীল কোনো খেলাপ্রেমী এবং সিন্সিয়ার স্কুলশিক্ষকের উপর আইন এবং আইন প্রয়োগের ফাঁকফোকরের পাল্টা কৌশল হিসেবে ধরনের আরো অনেক পদক্ষেপ প্রয়োজন

আর এর জন্য স্পষ্ট দেখার ইচ্ছা শিশুবিবাহ বন্ধের দৃঢ়তা নিয়ে এলাকার মানুষকে সঙ্গী করে এগোতে হবে সরকারীবেসরকারী নানা প্রয়াসে, এগোতে হবে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে আর মাথায় রাখতে হবেশিশুবিবাহশব্দটার মানে লাল শাড়ি জড়িয়ে ছোট্ট পুতুলের বিয়ে নয়, এর মানে একজন মানুষকে তার শৈশবে হেসে খেলে বিকশিত হতে দেওয়ার বদলে ভয়াবহ তিক্ত যৌন, পারিবারিক সামাজিক অভিজ্ঞতার দিকে ঠেলে দেওয়ার আয়োজন

 

উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন:
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.