প্রস্তাবিত বাল্য বিবাহ আইন ২০১৬: পশ্চাৎপদতার পদধ্বনি

শশাঙ্ক সাদী: অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা যদি হয় আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন, তাহলে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো ও আইনগত সামাজিক সুরক্ষাবলয় হতে হবে অত্যাবশ্যকীয়।

১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতিমালা শুধুমাত্র বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রসরতার ভিত রচনা করেনি, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে, যার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখছি জাতীয় সংসদে নারী নেতৃত্ব। এই নীতিমালা বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে, বিস্তর প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে তৈরি হয়েছিল যা একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। অথচ সেই নীতিমালা অনুমোদনের মাত্র কুড়ি বছরের মাথায় বাল্য বিবাহ আইন ২০১৬ যখন ‘বিশেষ ব্যবস্থায়/অবস্থায় ১৮ বছরের নীচের মেয়েদের বিয়ে বৈধ বা আইনগত বাধা নেই বা আইনগত শিথিলতা দেয়া হবে’ প্রণিধান রাখছে তখন প্রশ্ন জাগে – আমরা কি মধ্যযুগীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি? তাহলে কি শুধুমাত্র ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য ক্রমশ পশ্চাৎপদ আইনি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে আওয়ামীলীগ ও এর অঙ্গ দলগুলি?

শশাঙ্ক সাদী

মেয়েদের বা ছেলেদের নুন্যতম বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল অনেকগুলো বিষয়কে মাথায় রেখে। তার মধ্যে রয়েছে অধিকারভিত্তিক প্রজনন স্বাস্থ্য, সামগ্রিক জনসংখ্যাতত্ত্ব ও জনমিতি, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, নারীর রাজনৈতিক অগ্রসরতা, সামাজিক মূল্যায়ন তথা গোটা সমাজে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার পথরেখা তৈরি করা। ন্যুনতম বয়সের খড়্গ বহাল থাকার পরও রাষ্ট্র ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের অবৈধভাবে বিয়ে দেবার প্রক্রিয়াকে ঠেকাতে পারছে না, প্রতিনিয়ত এই আইন ভঙ্গ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।

তারপরও বর্তমান ‘নুন্যতম বিবাহ বয়স’ আইন কিশোরীদের অধিকার রক্ষা কবচ ও প্রগতিশীলদের লড়াইয়ের হাতিয়ার। একে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। তা না করে বর্তমান সরকার ও ক্ষমতায় থাকা দলগুলো উল্টো পথে হাটছে।

এর একটি সুস্পষ্ট কারণ হচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিন্তার অসাড়তা ও ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা বা লোভ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার স্বার্থপরায়ণতায় ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করছে না। তারা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে যুক্তি দেখাচ্ছে তা খুবই খেলো এবং অদূরদর্শী। এটি আসলে টেবিলের নিচ দিয়ে বাম হাতের খেলার প্রতিফলন।

অনেকটা এরকম যে – আমি তোমাদের এই ছাড় দিলাম, তোমরা আমাকে আমার কাজ করতে বাধা দিবা না। ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারী উন্নয়ন নীতিমালার শুরু থেকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই সহজেই প্রতীয়মান যে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতির মাঠে ঠাণ্ডা রাখার জন্য একটি অযৌক্তিক যুক্তির অবতারণা করা হচ্ছে, অযৌক্তিকভাবে মেয়েদের ন্যুনতম বিয়ের বয়সে শিথিলতা রাখা হচ্ছে। এটি আসলে বুমেরাং হয়ে যাবে বাংলাদেশ ও এর সমাজব্যবস্থার জন্য।

ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি যুক্তির মাপকাঠি হয় তাহলে কিছুদিন পরে দাবি আসবে ধর্মভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠার। রাষ্ট্র ও দল থেকে নারী নেতৃত্ব সরিয়ে দেবার। তখন কোন যুক্তিতে রাজনৈতিক প্রতিরোধ হবে?

একইভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ব্যাক্তিলোভ প্রভাবিত হচ্ছে বৈশ্বিক বৈদেশিক সাহায্য কেন্দ্র পরিবর্তনে সাময়িক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। আমেরিকা বা ইউরোপের চাইতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এখন বৈদেশিক সাহায্য বাড়ার প্রবণতা চলছে। তাদের সাহায্য কোনরকম জবাবদিহিতা ছাড়াই যথেচ্ছ ব্যবহারযোগ্য, লুটপাটে বাধা থাকে না। ব্যক্তিগত ব্যবসার প্রসার করার ক্ষেত্রে আরও সুবিধা পাওয়া যায়। এখানে মনে রাখা দরকার যে স্বৈরশাসক এরশাদ শুধুমাত্র তার ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখা এবং ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক লাভের জন্য ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা ও শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি করেছিল। তার ক্ষমতা ও অর্থ দুটোর প্রধান উৎস ছিল মধ্যপ্রাচ্য।

এই মধ্যপ্রাচ্যের সহায়তায় বঙ্গবন্ধুর খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে শুধু হত্যাই করেনি বরং প্রবল ক্ষমতাশালী হয়েছিল স্বৈরশাসকদের স্বৈরশাসনের সময়। আজকে যখন সেই মধ্যপ্রাচ্যীয় সাহায্যের লোভে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব নারী- পুরুষের সমতার প্রয়োজনীয়তাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায়, তখন মনে হয় ওই বুড়ো আঙ্গুল আসলে বাংলাদেশের পশ্চাৎদেশে সুঁচালো গেজ হয়ে প্রবেশ করছে, সামগ্রিক স্বোপার্জিত স্বাধীনতার চেতনা ও নারী-পুরুষের সমতার আকাঙ্ক্ষাকে ভাগাড়ে নিক্ষেপ করছে।

এরকম অপযুক্তি যদি চলতে থাকে তাহলে কিছুদিন পরে বলা হতে পারে যে খাদ্যের স্বাবলম্বিতার জন্য আমাদের জেনেটিক্যালি মডিফাইড সীড বা জিএমও বীজের দিকে যেতে হবে, আমাদের নদীনালা ভরাট করে জমি তৈরি করতে হবে, আমাদের পাহাড়্গুলো কেটে আবাস্থল বানাতে হবে, ফুলবাড়ির কয়লা তুলে জ্বালানি সংকট দূর করতে হবে, সুন্দরবন কেটে ব্যবসাকেন্দ্র বানাতে হবে ইত্যাদি। এটাও বলা হবে যে নারীরা অনেক বেশি ঘরের বাইরে কাজ করেছেন, এখন সর্বোপরি নারীদের ঘরের ভেতরে থাকা বাঞ্ছনীয়, তাদের শুধু পুরুষের মনোরঞ্জন ও দৈহিক বাসনা-লালসা মেটানোর কাজে ব্যস্ত থাকা আবশ্যক। নারী-পুরুষের সমতা অধর্মী ব্যাপার, সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের চেতনার জন্য হানিকর, সমাজে বিশৃংখলা তৈরি করছে, পারিবারিক ঐতিহ্য ভেংগে দিচ্ছে, গেলো গেলো আমাদের দেশ রসাতলে গেলো।

যখন যুক্তিবোধ ও যুক্তিতর্ক কাজ করে, যুক্তিকে অযৌক্তিকভাবে ভয় দেখানো হয় তখন এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ। আসুন আমরা এই অপচেষ্টা রুখে দাড়াই। নারী-পুরুষের সমতার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাই। কিশোরীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনকে (তা যদি স্বেচ্ছাকৃত হয়) কেন ধর্ষণ হিসেবে ধরা হবে না সেটা নিয়ে আওয়াজ তুলুন।

মেয়েদের নুন্যতম বিয়ের বয়স ১৮ ই রাখতে হবে, ক্রমশ এর উপরে যাওয়া আবশ্যক। এর নিচে কোন বিয়েকে বৈধতা দেয়া যাবে না। কিশোরীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ হিসাবে আইনে আনতে হবে। সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা ও সমাজব্যবস্থায় সমতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া প্রতিটি মেয়ে শিশুর অধিকার। এই অধিকারকে অস্বীকার করা নয় বরং বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

শেয়ার করুন:
  • 261
  •  
  •  
  •  
  •  
    261
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.