প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কি ধর্ষণ উৎসাহিত হবে না?

আনা নাসরীন: পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম অপরাধের একটা ধর্ষণ; স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর সবচাইতে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের একজন ধর্ষক কিন্তু আবহমান কাল থেকে আমাদের সমাজে (বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে) এক অবিশ্বাস্য বর্বরতা চলে আসছে – ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ঘটনাটা ধামাচাপা দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা ধর্ষকের দিক থেকে এটাই হবার কথা, কিন্তু ভীষণ মর্মান্তিক ব্যাপার হলো ধর্ষিতার পরিবারও এমন একটা সমঝোতার প্রস্তাব লুফেই নেয় বুঝি, কতোটা নিরুপায় হয়ে ধর্ষিতার পরিবার এমন সিদ্ধান্ত নেয়

যেখানে একজন ধর্ষিতা সমাজের সব মানুষের সহমর্মিতা, সহানুভূতি পানার কথা, সেখানে আমাদের এই চূড়ান্ত অমানবিক সমাজে একজন ধর্ষিতা হয় নিন্দা আর বিদ্রুপের শিকার এর মাশুল দেয় অনেকেই আত্মহত্যা করে, আর অনেককেই তার ওপর বর্বরতম অপরাধটা করা পুরুষটিকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়ে ন্যূনতম মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ চাইবে সমাজ থেকে এই বর্বরতা দূর হোক এই বিয়ের কথায় আবার ফিরছি পরে

বোধগম্য কারণেই বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন করা নিয়ে দেশে নানামুখী সমালোচনা হচ্ছে আমি নিজেও এটা নিয়ে লিখেছি এখানেই সবদিকের নানা বিতর্কের মুখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা নিয়ে সংসদে কথা বলেছেন কোন খুব উত্তপ্ত ইস্যু নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করার বক্তব্য দেন, এটা প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে কিন্তু দুঃখিত, তাঁর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট তো হতেই পারিনি বরং একটা নতুন আতঙ্ক যুক্ত হয়েছে মনে

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিরোধিতা যারা করেন, তাদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ লুকাননি মাননীয় প্ৰধানমন্ত্রী তারপর নানা রকম যুক্তি দেবার চেষ্টা করেছেন তিনি তোর বক্তব্যের যে অংশটা আশঙ্কা তৈরি করছে সেটা কোট করছি নীচে –

“আমরা ১৮ বছর পর্যন্ত বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছি কিন্তু একটি মেয়ে যদি… যে কোনো কারণে ১২-১৩ বা ১৪-১৫ বছরের সময়ে গর্ভবতী হয়ে যায় – তাকে গর্ভপাত করানো গেল না তাহলে যে শিশুটি জন্ম নেবে তার অবস্থান কী হবে? তাকে কী সমাজ গ্রহণ করবে? তাহলে এই বাচ্চাটির ভবিষ্যৎ কী হবে? তার ভাগ্য কী হবে? এ রকম যদি কোনো ঘটনা ঘটে তাহলে কী হবে?” (বিস্তারিত – http://m.bdnews24.com/bn/detail/bangladesh/1254016)

পরবর্তী আলোচনার আগে দেখা যাক আমাদের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা, যেখানে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেয়া আছে ঠিক এভাবে –

“কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে

পুরো সংজ্ঞাটা আগ্রহীদের জন্য দেয়া হলো, কিন্তু আমার আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশটা হলো – “নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়)” অর্থাৎ অনিচ্ছায়, অসম্মতিতে তো বটেই এমনকি সম্মতিতেও (এমনকি কারো স্ত্রী হলেও) ১৬ বছরের নীচে কোন মেয়ের সাথে যৌন সম্পর্ক মানেই ধর্ষণ

আনা নাসরীন

এখন প্রধানমন্ত্রী যখন “যে কোনো কারণে ১২-১৩ বা ১৪-১৫ বছরের সময়ে” মেয়েদের গর্ভবতী হওয়াকে বাল্যবিবাহ বিরোধী আইনের ‘তবে’ বলে যা লিখা আছে সেটার ব্যাখ্যা হিসাবে দাঁড়া করাচ্ছেন তার মানে কী ভয়ঙ্কর না? ১৬ এর নিচে একটা মেয়ে গর্ভবতী হয়ে গেলে (এমনকি নিজের সম্মতির যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও) সে কি ধর্ষিতা নয়? এর সাথে জড়িত পুরুষটি কি ধর্ষক নয়? তো বাবা-মা এর সম্মতিতেও যখন বিয়ে দেয়া হবে ওটা কি ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়ার সেই বর্বর রীতিটিরই চর্চা না?

এতদিন সমাজের নানা পর্যায়ে এই কাজটা হয়েছে, সচেতন মানুষ এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন, ধর্ষিতার বাবা-মা কে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন এখন তো এই বর্বর বিয়েকে রাষ্ট্র রীতিমতো আইন করে স্বীকৃতি দিচ্ছে! বর্তমানের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন বাল্যবিবাহের মহামারী তৈরি তো করবেই, এখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর  এই ধরনের বক্তব্য কি ধর্ষকের সাথে বিয়ের মতো বর্বর রীতিটিরও মহামারী তৈরি করবে না? আর এভাবে যদি ধর্ষণের অপরাধ থেকে মুক্তি পাবার উপায় রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা স্বীকৃত পথেই হতে পারে, তাহলে সেটা ধর্ষণকে কি উৎসাহিত করবে না?

এই চর্চা অবশ্য নতুন না আমাদের কি মনে পড়ছে, এইতো কিছুদিন আগেই তুরস্কে এমন একটা আইন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিলো, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ধর্ষিত হলে (সন্মতিতে হলেও) সেই মেয়েকে ধর্ষক বিয়ে করতে রাজি হলে ধর্ষক ধর্ষণের অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে (বিস্তারিত – http://www.bbc.com/bengali/news-38026016) এখন এই ভুত ভর করেছে আমাদের ওপর – আমরা আসলে এই আইনই করছি স্রেফ একটা মুখোশ পরে এটা সেদিন সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় প্রকাশিত হয়ে পড়েছে   

কী করার আছে আমাদের? ‘তুরস্কের ভুত’ই যেহেতু আমাদের ঘাড়ে চেপেছে, তুরস্কের জনগণের পথে হেঁটেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে – তুরস্কে দেশব্যাপি তীব্র প্রতিবাদের মুখে ওই আইন করা থেকে পিছিয়ে আসে এরদোয়ান সরকার (বিস্তারিত – http://bangla.bdnews24.com/world/article1246850.bdnews) আমাদের মেয়েশিশুগুলোকে যদি অনিবার্য ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে হয়, তাদের সুন্দর একটা আগামীর ভিত তৈরি করতে হয়, তাহলে সমাজের সব স্তর থেকেই তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। প্রস্তুত তো আমরা?

শেয়ার করুন:
  • 59
  •  
  •  
  •  
  •  
    59
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.