ঋতুপর্ণের “সব চরিত্র কাল্পনিক”: একটি নারীবাদী পাঠ

অনুপম সেন অমি: ঋতুপর্ণ ঘোষের “সব চরিত্র কাল্পনিক” ছবিটা নিয়ে লেখার ইচ্ছে আমার অনেকদিন থেকেই। আমি দেখেছি ঋতুর ছবি খুব সচেতনভাবেই ইন্টারটেক্সচুয়াল। যেমন অন্য কোন গল্প, গান, কবিতা তাঁর ছবির মূল টেক্সটের কাঠামো তৈরি করে। আর এই ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি পেরিয়ে/এড়িয়ে তাঁর ছবির পাঠ তাই অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। সেই সাথে চরিত্রায়ণের বিষয়ও নির্ভর করে আনুষঙ্গিক কী কী রেফারেন্স ছবিতে আছে তার উপরে। তাঁর অন্যান্য প্রধান ছবির ক্ষেত্রেও হয়তো ধারণাটা সত্য।

ন্যারেটিভ প্যাটার্নের কথা ভেবেই এই ছবি নিয়ে লেখার আগ্রহটা আসে। এর ফ্ল্যাশব্যাক ন্যারেটিভ, টেম্পোরাল ডিসটর্শন এবং গল্পের কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি আঙ্গিকের দিক থেকে উত্তরাধুনিক। বিশেষ করে, যেভাবে পুরো ন্যারেটিভে কবিতার কথা, কবির কথা, ব্যক্তিগত গল্প ও কবিতার পেছনের গল্পকে ভেঙ্গেচুড়ে একই ফ্রেমে দেখানো হলো (ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন স্থানে), তা গল্পের ফ্র্যাগমেন্টেড বয়ানকে প্রতিস্থাপন করে অন্য এক মাত্রায়।

বিষয়টা হচ্ছে পুরো ছবির বয়ান পাওয়া যায় তখনই, যখন সব ভাঙ্গা ইমেজ এক করে দেখা হচ্ছে। এই উপায়েই সিমপ্লি ন্যারেটিভের তথাকথিত লিনিয়ারিটিকে সাধারণত ভাঙ্গা হয়। তখন আমরা আর একের পর দুই দেখি না বা দেখি না কোন সরলরৈখিক যাত্রা। এই ফ্র্যাগমেন্টেড মেমোরি ন্যারেটিভের সুবিধা হলো আমরা যেকোনো জায়গা থেকেই এর ব্যাখ্যা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারি। অথবা আলাদা ভাবে (আমি বলতে চাচ্ছি যে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই) দেখাও যেতে পারে কিভাবে তৈরি হচ্ছে সিনেমার পুরো বয়ানটা।  যেমন করে আমার এই লেখায় আমি এই ছবির উপর একটা নারীবাদী পাঠ দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো। দেখতে চাইব কি করে এই ছবির ন্যারেটিভের ভেতর দিয়ে নারীবাদী তত্ত্বীয় আলোচনা সম্ভব হতে পারে।

মূলত গল্পে প্রধান দুই নারী চরিত্র—একজন হলেন “রাই” আর অপরজন হচ্ছেন “নন্দ’র মা” যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম প্রিয়বালা দাস। প্রথমজন হচ্ছেন কবি ইন্দ্রনীলের স্ত্রী আর অপরজন তাদের ঘরে ঝি এর কাজ করেন এবং এর বিনিময়ে থাকা খাওয়া ছাড়াও টাকা পান। সিনেমার ন্যারেটিভ এ এই দুইজনের রিপ্রেজেন্টেশন দু’রকম। এর কারন হতে পারে তাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শ্রেণীদূরত্ব/বিন্যাস। গল্পে নন্দ’র মায়ের আইডেন্টিটি সংকটের বিষয়টা যতটা প্রকাশ পেয়েছে তাকে নিয়ে লেখা কবিতায় অথবা কোন বিশেষ ভাবনায়, রাইয়ের সংকট, বিশেষত ব্যক্তিক, ঠিক ততোটাই থেকে গেছে অপ্রকাশিত। বরং কবিতায় রাই এসেছে রোম্যান্টিক অনুষংগ হিসেবে যেখানে তার ব্যক্তিত্বের সংকটের জায়গাটা অনুচ্চারিত থেকে গেছে সবসময়। টেক্সচুয়াল রিপ্রিজেন্টেশনে তার ব্যক্তিত্বের ইমেজ মেটাফোরিকাল হয়ে উঠে আসে। কবির মনোজগতে তৈরি করা ইমেজ তার বাস্তব ব্যক্তিত্বকে প্রতিস্থাপন করে শব্দীয় আঙ্গিকে।   

রাই খুব ভালো কবিতা বুঝে না, এমনও হতে পারে সে কবিতাময় সবকিছুতেই এলিয়েনেটেড বোধ করে। সে সংসারমুখী। ভালো থাকতে চায় সংসার, স্বামী নিয়ে। কোন অর্থনৈতিক কষ্ট  তাদের থাকবে না এমন একটা ঘর চাই সে। সাজানো ঘর/সংসারের প্রত্যাশা খুব সহজেই স্টিরিওটাইপ করে দেয় তার অবস্থান।  কনভেনশনাল নারী হিসেবেই সে উপস্থাপিত হয় এখানে যার কাছে সৃষ্টিশীলতা বলতে সেই ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে” অনুবাদ পর্যন্তই। তাও এটি করা ক্রিয়েটিভ রাইটিং ক্লাসের জন্য; কোন সৃজনশীল অভ্যাস থেকে নয়, বরং একধরনের দায়বদ্ধতা থেকে। অনুবাদের অরিজিনালিটি নিয়েও সে জাস্টিফাই করে ছবির শুরুতে। এই অনুবাদ ছাড়া আর কোন চিন্তা তার মাথায় আসে নি কেননা তার ভাষায়—“আই ওয়াজ টু লেজি টু থিংক সামথিং অরিজিনাল”।

ছবির শুরুতেই এই অরিজিনালিটি নিয়ে অজুহাত অথবা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে মৌলিক হতে না পারা অথবা সৃষ্টিশীল হতে না পারার ব্যর্থতা তার পরবর্তী জীবনে কবি ও সৃষ্টিশীলতার সাথে দিন যাপনের দায়, আপাত দুঃখবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অপারগতাকে জাস্টিফাই করে দেয়। আর এই সৃষ্টিশীল অনুপস্থিতি তাকে খুব স্টিরিওটিপিক্যাল নারী করে তুলে যার কাছে বৈষয়িক সুখই মূলত প্রধান। স্বামীর চাকরি না থাকা তার কাছে বেদনাদায়ক। ভালো সংসারের আশা আর সৃষ্টিশীলতা এক সাথে চলতে পারে না, যেহেতু তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক ডিসকোর্সেই একজন নারীর মধ্যে এই দু’ইয়ের সহাবস্থানের সম্ভাবনা বেশ প্রকট।    

অনুপম সেন অমি

লেখার অরিজিনালিটি নিয়ে মন্ত্যবের মধ্যে দিয়ে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। ছবির শুরুতেই রাইয়ের মুখ থেকে এই সহজ স্বীকারোক্তি কবি হিসেবে তার স্বামী ইন্দ্রনীলের অনবদ্যতা ও তার নিজের কবি হতে চাওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস দু’টাকেই নির্দেশ করতে পারে। অরিজিনালিটিকে মহৎ করে তোলারও একটা আন্ডারটোন আছে এই কথায়, আর সেক্ষেত্রে ইন্দ্রনীল তার কবিতায় এই অরিজিনালিটি নিয়ে কাজ করতে পারেন যেটা রাই চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেন নি। এই না পারাটা যতটুকু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা তার চেয়েও সামাজিক। কেননা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে খুব সফল নারী কবি কেউ হতে চায় না। এটা এই সমাজ ব্যবস্থায় নারীর কাছে প্রত্যাশিত কোন দক্ষতাও নয়। তাই রাই অসচেতনভাবেই সেই ডিসকোর্সকে মেনে নিতে পারে/নিয়েছে একজন নারী হিসেবে।     

ছবির প্রেক্ষাপটে একটা কথা বলা যায় যে সফল কবিতালিখন—এই কাজ পুরুষের। ইন্দ্রনীল কবিতা লেখে এবং কবি হিসেবে তার পরিচিতিও আছে সমাজে। কিন্তু রাইয়ের সাথে তার ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার জায়গাটা সবসময়ই নড়বড়ে। ব্যক্তি রাই নীলের কবিতায় আসে না উপমা হিসেবে। বরং নীল তার কবিতার নায়িকা কাজলরেখার সাথে একাত্ম করে দেয় রাইয়ের অবস্থান। রাইয়ের সাব্জেক্টিভ অবস্থান নীলের কবিতায় অবজেক্ট হয়ে যায়। এমনকি রাইয়ের গল্পগুলোও নীলের কবিতা হয়ে যায়। রাই অসচেতনভাবেই তার এই সাবজেক্টিভ অবস্থান ভুলে নীলের কবিতার উপমিত নারীর সাথে নিজেকে আত্মস্থ করে নেয়। তার ব্যক্তিগত অনুভূতি আর গল্পগুলো নীলের কবিতায় রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টাও সে মেনে নেয়। এটি ঘটতে পারে তার নিজের সৃষ্টিশীলতা নিয়ে সংশয়ের কারনে অথবা তার ব্যক্তি অবস্থান থেকে রূপক অবস্থানে অসচেতন বিচ্যুতি/ স্থানান্তরের কারনে।

অন্যদিকে ছবির অনেক দৃশ্যে দেখা যায় রাই নীলের জন্য মাঝে মাঝেই চিঠি রেখে যায়। খুব সাধারন কিছু কথা/তথ্য থাকতে পারে এই চিঠিগুলোতে। তার এই চিঠি আর নীলের কবিতা লেখার অভ্যাস কিন্তু গল্পের ন্যারেটিভে একটা সুক্ষ্ম বাইনারিও তৈরি করে যেখানে চিঠির সাহিত্যিক অবস্থান কবিতার মতো কখনোই নয়। এছাড়াও বিষয়টা এমন হতে পারে যে, কবিতার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে অপারগতাই রাইয়ের চিঠি লেখার অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছে। চিঠি এখানে একটা ফেমিনিন উপাদানও হতে পারে যেটির অরিজিনালিটি অথবা সাহিত্যিক মূল্য নিয়ে রাইকে না ভাবলেও চলে এবং চিঠির বিষয়বস্তুকে সাহিত্যিক মূল্যে না ফেলেও একে রোম্যান্টিসাইজড করে ফেলা যায় সহজেই। সহজ অনুভূতিকে ব্যক্ত করার একটা মাধ্যম যেহেতু চিঠি হতে পারে তাই সেখানে কবিতার মতো জটিল উপমা বা উতপ্রেক্ষা ব্যবহারের প্রয়োজনও পড়েনা। তাই সহজ আবেগ প্রকাশের মাধ্যম এই চিঠি রাইয়ের সৃষ্টিশীলতার দায়কে ম্লান যেমন করে দেয় ঠিক তেমনি তার নারী সত্তাকেও মূর্ত করে আমাদের কাছে। তাই আমরা এই কবিতা-চিঠির বাইনারিতে একটা সুক্ষ্ম জেন্ডার পলিটিক্সও টের পেতে পারি।     

আলোচনাটা আরো ইন্টারেস্টিং হতে পারে যখন রাই নীলকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হলে তার ব্যক্তি সত্তার মুক্তি ঘটতে পারত নীলের বিমূর্ত কবিতার ভেতর তার যে অবজেক্টিভ রিপ্রিজেন্টেশন সেখান থেকে। কিন্তু ব্যক্তি নীলের মৃত্যু একই সাথে রাইয়ের ব্যক্তিসত্তারও বিকাশ হতে দেয় না। রাই বরং নীলের কবিতাকে কোন পরাবাস্তব উপায়ে নিজের সাথে ইন্টিগ্রেট করে নেয়। ব্যক্তি নীল আর কবি নীলের ভেতর পার্থক্য সে আর করতে চাই না। এই করতে না চাওয়াটার ভেতর এক ধরনের সাবজুগেটেড ঘেরাটোপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। শেখর এর কাছে না যাওয়াটাও এক প্রকারের ব্যক্তিচিন্তার নতিস্বীকার হতে পারে।

নীলের কবিতা যা আর কখনো লেখা হবে না এমন এক “ন্যারেটিভ অব ডিসকন্টিনিউটিতে” রাই ঢুকে পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে তার “একা থাকার সিদ্ধান্ত” নীলের সৃষ্টিশীলতার কাছে আত্ম-সমর্পন/ত্যাগ  মনে হলেও, এই সিদ্ধান্ত একটা পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যে পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশার কাছে নন্দ’র মায়ের আত্ম-পরিচয় লোপ পায়, সেই একই চাপা কোন প্রত্যাশাও ব্যক্তি রাইকে কাব্যিক উপমায় মূর্তমান করে তুলতে পারে।

শেয়ার করুন:
  • 70
  •  
  •  
  •  
  •  
    70
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.