তসলিমা নাসরিন আমাদের তারুণ্যের নির্মাতা

ভিকারুন নেসা: তখন আমি কৈশোর পেরিয়ে সদ্য তারুণ্যে পা রেখেছি। মফস্বল থেকে আসা রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের জড়োসরো, লাজুক, ভীতু তরুণী। ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবনে প্রথম পরিবারের গণ্ডির বাইরে পা রাখা আমার। এই প্রথম স্বাধীনতা পাওয়া এক তরুণী, যার ইচ্ছে করে সমস্ত পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করতে। সবকিছুতেই আমার চরম উৎসাহ এবং আগ্রহ। সব কিছুতেই অংশগ্রহণ করতে চাই।

বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে এক অনভিজ্ঞ তরুণী। বলাই বাহুল্য খুবই আগ্রহ নিয়ে টিএসসিতে স্বরশ্রুতি নামে একটি আবৃত্তি সংগঠনে যোগ দেই। থাকতাম শামসুন নাহার হলে। হলের গেট বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যা ছটায়। তাই সৃজনশীল কোন কাজে অংশ নিলেও সেটির স্টেজ শোতে কখনই অংশগ্রহণ করতে পারতাম না। এ নিয়ে প্রচণ্ড মনো:কষ্টে ভূগতাম। এছাড়া সন্ধ্যা ছটা হলেই আমাদের ছেলে ক্লাশমেট কিংবা গ্রুপের সদস্যরা বলতো –যাও মুরগির খাঁচায় ঢুকো, কু –কু —কুক।

ভীষণ কষ্ট নিয়ে বলতে চাইতাম, আমাদেরও ইচ্ছা করে রাত দশটা পর্যন্ত বাইরে থাকতে। কিন্তু কিছু পশুরুপী পুরুষ মানুষের জন্যই আমাদের এই খাঁচায় ঢুকতে হয়। কিন্তু বলার মতো সাহস ছিল না। তখনও কিন্তু জানতাম না আমার এই না বলা কথা একজন বলা শুরু করেছেন।

সে সময় আমাদের সংগঠনটি কলকাতায় জাতীয় কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তারই প্রাথমিক আলোচনার জন্য সংগঠনটির আহ্বায়ক নাঈমুল ইসলাম খান কলকাতায় গেলেন। শুনলাম তার সাথে একজন নারীও গেছেন, তার নাম তসলিমা।

তিনি আমাদের নাঈম ভাইয়ের প্রেমিকা,তসলিমা নাসরিন। জানি না ঘটনা আদৌও সত্যি কিনা। তবে এ নিয়ে অনেক হাসাহাসি, টিপ্পনি এবং বিরক্তিও প্রকাশ করছিল সবাই। কয়দিন এ সম্পর্ক থাকে, কিংবা তিনি এতোই সস্তা যে পুরুষ সংসকৃতি কর্মীরাও চাইলেই তাকে অনায়াসে বিছানায় নিতে পারে, ইত্যাদি নানা বিতর্ক। তবে আমি কিন্তু একটু চমকিতই হয়েছিলাম। বিশেষ করে প্রেমিকের সাথে বিদেশ ভ্রমণ আমার কাছে বেশ রোমাঞ্চকরই মনে হয়েছিল। সে সময়ে এর জন্য যে সাহস, মনোবল, এবং প্রথা ভাঙ্গার ইচ্ছাশক্তি লাগে, সে সবই ছিল আমার মুগ্ধতার কারণ।

সেই প্রথম জানলাম তসলিমা নাসরিন নামে একজন নারী, যিনি আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, সামাজিক প্রথার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে পত্রিকায় কলাম লিখছেন, কবিতা লিখছেন। খুবই আগ্রহ নিয়ে এবং অস্ভব মুগ্ধতা নিয়েই তার লেখা পড়তে শুরু করলাম। দূরে পড়ে রইলো রবীন্দ্রনাথ, সমরেশ মজুমদার, সুচিত্রা, কিংবা বুদ্ধদেব গুহ। বিভিন্ন বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে, লাইব্রেরিতে গিয়ে তার সব লেখাই গোগ্রাসে পড়তে চাইতাম। শুধু আমি নই, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা সবাই ওর লেখা পড়ার জন্য উদগ্রীব থাকতো। বিশেষ করে আমাদের মেয়ে বন্ধুরাই সবচেয়ে বেশী ভক্ত হয়ে গেল উনার।

কেন ভক্ত হলাম আমরা সব সাধারণ, ভীতু টাইপের মেয়েরা? কিংবা মফস্বল থেকে আসা হলে থাকা “আধা গাঁইয়া” মেয়েরা? (হলে থাকা মেয়েদের বাসায় থাকা মেয়েরা এইভাবেই মূল্যায়ন করতো।)

কারণ আর কিছু না, আমি কোনদিন কাউকে যেসব কথা বলিনি বা বলতে পারিনি, একজন নারী হয়ে চিরদিন যে কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি, যে জীবন যাপন করি আমি, একজন নারী হিসেবে তা আমার ভীষণ অপছন্দ। সেসব কথাই তার কলামে উঠে এলো।

নারী হিসেবে ধর্ম আমাকে কতটুকু অধিকার দিয়েছে, আমার প্রতি অন্যায়ের শোধ নেয়ার অধিকার আছে আমারও। সব কিছু প্রচণ্ড সাহসের সাথে, আস্হার সাথে যে নারীটি লিখতে শুরু করলেন, তিনি তসলিমা নাসরিন। তার লেখা কতোটা প্রাঞ্জল, কতোটা গভীর, কতোটা প্রাজ্ঞ, সে বিচার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। শুধুমাত্র আমি যা বলতে ভয় পাই, তাই সে নির্দ্বিধায় বলে দিচ্ছে। আমি যা করতে চাই, তা সে করে দেখাচ্ছে। তার প্রতি মুগ্ধ হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু কারণের আর দরকার ছিল না আমাদের।

আমাদের অতি রক্ষণশীল সমাজে, পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান। পুরুষতান্ত্রিকতা বেশিরভাগ নারী-পুরুষের বিশ্বাসে, সংস্কৃতিতে এবং আচরণে। সে সমাজের দিকে তর্জনী তুলে প্রতিবাদ করার ফলস্বরুপ তার নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পেশাজীবন, পরিবার যে তছনছ হয়ে যেতে পারে, সে তোয়াক্কা তিনি করেননি। তার কলম অনবরত কথা বলছিল অন্যায়ের বিপক্ষে, দুর্বলের পক্ষে।

সমালোচকদের মতে, তখন তিনি নাইমুল ইসলাম খান, ইমদাদুল হক মিলন কিংবা সৈয়দ শামসুল হক এর ঘাড়ে পা রেখে পাঁচিল টপকেছিলেন বিখ্যাত হওয়ার জন্য। আমি নারী হিসেবে বলতে চাই, তাহলে তো তিনি অনেক বেশী মেধাবী। অনতত তিনি জানেন, আমাদের সমাজের অনেক নারী শরীর খেকো পুরুষের কাছ থেকে কিভাবে নিজের প্রাপ্য আদায় করে নিতে হয়। আমরা নারীরা তো জানিই না আমরাও একজন মানুষ। মানুষ হিসেবে আমাদের সম্মান, মর্যাদা, যোগ্যতা অন্য কোনো পুরুষ মানুষের চেয়ে কম নয়, এই আত্মবিশ্বাসই তো নেই আমাদের। আমাদের মতো বাংগালী নারীদের তো এসব কথা তসলিমাই নাসরিনই শিখিয়েছেন, আত্মবিশ্বাস জন্মিয়েছেন।

তসলিমার লেখার মানের বিচার করার আমার কোনই দরকার নেই। আমি বিচার করতে চাই তার বক্তব্য, কী তথ্য তিনি আমাকে দিচ্ছেন- সে সব। সত্যি কথাগুলো যা কেউ কোনদিন বলার সাহস দেখায়নি, সে আমাকে তাই বলে সত্যের পথ দেখিয়েছে। আমার কষ্টের সমব্যাথি হয়েছে। যে দুর্বল মানুষের জন্য কথা বলে, মানুষের মুক্তির কথা বলে, যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, যে সত্যি কথা বলে, তাকে আমরা মানবিক মানুষ বলি। সে হিসেবে তিনি তো পরম মানবতাবাদী একজন মানুষ। আমাদের সমাজে বিপ্লব ঘটানো এক নারী, যা আর কখনো কেউ করেনি এদেশে।

শুধুমাত্র একজন মানবতাবাদী, এবং বিপ্লবী হিসেবেই আমি তাকে বিচার করতে চাই। বলতে চাই একজন নারী হিসেবে আপনি যা করেছেন, যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার জন্য এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আপনাকে সঠিক মূল্যায়ন না করুক, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আপনার নামটি প্রদীপের মতোই সবসময় জ্বলজ্বল করবে। প্রদীপের আলোয় সব অন্ধকার নিশ্চয়ই বিলীন হবে সেদিন। আপনার কলমের ক্ষুরধারায়, আপনি শুধু আমাদের জন্য শক্তির রসদ যুগিয়ে যান প্রিয় তসলিমা। যতোই সমালোচনা হোক – আপনার জন্য আমাদের মতো অতি সাধারণ, ভীতু নারীদের শুভকামনা সব সময়ই থাকবে।

শেয়ার করুন:
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.