প্রসঙ্গ: “পেছনের নারীটি কে”

ইশরাত জাহান ঊর্মি: পরিবর্তন নিশ্চয়ই আসছে। কিছুটা হলেও আসছে। আমার আগের অফিসের এক সিনিয়র কলিগ একদিন বলেছিলেন, 

আপনারে কোন কথা বলতে ভয় পাই। কী না কী বলবো, আর আপনি লিখে দেবেন! ভয় লাগে!
আর মাত্র কদিন আগে এক জুনিয়র কলিগ বলছিলেন,
আরে ঊর্মি আপা, তোমার সাথে কী ইয়ার্কি করবো, তুমি আবার লিখে দিবা। তোমারে ডরাই।

ইশরাত জাহান ঊর্মি

আমাকে মানে আমার লেখাকে “ডরাচ্ছেন” তারা। এই যে ইয়ার্কি করলেও তা নিয়ে লিখে দেয়ার কথা বলছেন, তারা তার মানে কি আমি ইয়ার্কি বুঝি না? আমার কি হিউমার সেন্স নাই?  যাপিত জীবনে নারীর প্রতি বৈষম্য আর অসংগতি নিয়ে আমি লিখি। যেটা ইয়ার্কি, যেটা বন্ধুত্বের বা যা সহকর্মী সুলভ রসিকতা, সেটা আমি এবং আমরা ভালোই বুঝি। ইয়ার্কি আমরাও করি। কখনও ছেলেদের চেয়েও বেশি করি। তবু এই যে তাদের “ডরানো” এইটা সিগনিফিকেন্ট। ঠাট্টা ইয়ার্কি আর রসিকতার ছলে মেয়েদের ঊন করে দেখার দিন যে ফুরিয়ে আসছে, সেটা বুঝে এইসব পুরুষেরা সতর্ক হচ্ছেন।

তো, এই পরিবর্তনটা আসছে আমাদের মতো কিছু মানুষের লেখার মধ্য দিয়েই এইটা নিশ্চয় স্বীকার করবেন। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এইসব লেখালেখি খুব যে অমর-অজর কিছু, তা নয়। অনেকের লেখার মধ্যে অকারণ-অর্থহীন ঝাঁজ-ক্ষোভ দেখতে পাই, ব্যক্তিগত বিষ উগরানো দেখতে পাই-যেটা খুবই অপছন্দ করি আমি। এদের সকলের লেখাই (আমার সহ) একদিন মহাকালের ভাঁড়ার ঘরে চলে যাবে বলেই মনে হয় আমার।

তবে আজ থেকে ৫০ বা ১০০ বছর পর এ অঞ্চলের নারীবাদ নিয়ে যদি কোনো গবেষণা হয়, তাহলে হয়তো এই লেখাগুলোর কথা আসবে, এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের শহুরে নারীদের জীবন হয়তো কিছুটা উঠে আসবে, সেটাও কম পাওনা নয়।
কিন্তু এই লেখার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের চেষ্টা করা – এই লেখাগুলি কোথায় কোন মাধ্যমে ছাপা হচ্ছে সেটা বোধহয় ভাবা জরুরি। অন্তত: আমার কাছে জরুরি মনে হচ্ছে এখন। আগেও জরুরি মনে হতো, এখন একটি ঘটনার পর আরও জরুরি মনে হচ্ছে। নারীকে মজ্জাগতভাবেই যারা অর্ধমানব ভাবে, নারীকে মা এবং কন্যার বাইরে হলেই যারা বেশ্যার দৃষ্টিতে দেখে, তাদের মতো বিকৃত সম্পাদকদের পোর্টালে লিখে কী পরিবর্তন আনবো আমরা?
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি মাহবুব হক শাকিল মারা যাওয়ার পর এইসব পোর্টাল এবং পোর্টাল সম্পাদকদের নোংরামি দেখছি আমি। যাদের মাথাভর্তি বর্জ্য আর বিষ্ঠা। শাকিল কিভাবে মারা গেছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। হার্ট এ্যাটাকের কথা বলা হয়েছে কোথাও কোথাও। কিন্তু তিনি যেভাবেই মারা যান ইতিমধ্যে “পেছনের নারী” নিয়ে রসালো গল্প, নিউজ নামের চটি আর প্রতিহিংসামূলক লেখা শুরু হয়ে গেছে।

স্ত্রী ও কন্যার সাথে মাহবুবুল হক শাকিল

বলা হচ্ছে, একজন নারী কূটনীতিকের প্রেমে পাগল হয়ে শাকিল অভিমানী, কখনও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতেন। এখন তার মৃত্যুর পর সেই নারীকে দায়ী করে বিভিন্ন ইতর টাইপের পোস্ট দেখতে পাচ্ছি।
আপনারা বলতেই পারেন, কোনো নারী যদি কোনো পুরুষের জন্য এরকম মারা যেতো, তবে সবাই ঝাঁপায়া পড়ে পুরুষের চরিত্র হননে লেগে যেতেন। আমি বলতে পারি, আমি অন্তত: কারও চরিত্রহনন করতাম না। অন্যদের দায়িত্ব নিচ্ছি না, কিন্তু আমি করতাম না।

মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সে সম্পর্ক ঘিরে নানান মাত্রা নিয়ে বাইরের কারোর, যারা অন্তত: যাকে বা যাদের নিয়ে বলা হচ্ছে তাদের কাছের নন, তাদের বলাটা অরুচিকর। আমরা এইসব চর্চার মধ্যে নেই বলে এসব খুব সহজে বলে ফেলি। কাছের মানুষ যারা ছিলেন শাকিলের, তারা তাকে এই মোহ, এই প্রেমের বিভ্রম (ধরেই নিলাম তার মৃত্যুর কারণ এটাই) থেকে বের করতে সাহায্য করেছিলেন কিনা, আমার জানা নেই।

যারা এখন “ভাই ভাই” বা ‘বন্ধু বন্ধু’ করে যতটা না শাকিলের জন্য শোক প্রকাশ করছেন, তারচে বেশি ক্ষমতাবানের সাথে সম্পর্ক ছিল এইটা প্রাণপনে নির্লজ্জের মতো বুঝাচ্ছেন, (কারো ভাই বা ভাইয়ের মতো কেউ মারা গেলে সারাক্ষণ ফেসবুকে ছবি আপ করতে পারে, আর স্ট্যাটাস দেয়ার মতো মানসিক অবস্থায় থাকে, এইটা একটা বিরাট বিস্ময়!)

তারা প্রাপ্তবয়স্ক এই সরকারি চাকরির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মানুষটিকে কখনও কাউন্সিলরের পরামর্শ নেয়ার কথা বলেছিলেন কিনা তাও জানি না। কিন্তু প্রেম সংক্রান্ত কোনো ঘটনায় পুরুষ মরলেই পুরো ঘটনাকে একটা কোণ থেকে দেখে ‘কে এই এলা” মার্কা আজেবাজে লেখা যারা ছাপছেন, পুরুষ মরলেই বিপরীত নারীটি “ছলনাময়ী”, “ডাইনী” এইসব শব্দে আখ্যায়িত করছেন, তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি আমি।

এদের রুচি, মানসিক নিচতা, ভ্রষ্টতা এইসব নিয়েই এরা সমাজে প্রগতিশীলতা ফলান। তাদের এই “ফলানো” প্রগতিশীলতায় আমি ইস্তফা দিচ্ছি। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা, আজেবাজে, হাবিজাবি, মাথার মধ্যে দুর্গন্ধ-বিষ্ঠা-বর্জ্য ভরা সম্পাদকদের পোর্টালে আমি আর পরিবর্তনের আশায় লিখবো না।

আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমার প্রচেষ্টা প্রতিবাদ সবই ক্ষুদ্র হবে। কিন্তু তবু তো প্রতিবাদ!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.