পেডোফিলিয়াকেই বৈধতা দেবে এই ‘বিশেষ’ আইন

তানিয়া মোর্শেদ: ক’দিন আগে চ্যানেল আই-এ বিবিসি বাংলা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের এক নারীনেত্রী বাল্যবিয়ে বিষয়ে “ব্যাখ্যা” করছিলেন “বিশেষ” অবস্থা কেমন হতে পারে। উদাহরণ দিলেন, ছোটবেলায় পিতৃহীন মেয়ে যার বয়স এখন ষোল, তার মা হঠাৎ জানতে পারলেন তার ক্যান্সার এবং তিনি আর মাত্র কয়েক মাস বাঁচবেন। সেক্ষেত্রে তিনি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যেতে পারেন।

শুনে মনে হলো তাকে জিজ্ঞাসা করি, যদি মেয়েটির বয়স নয় হয়, তখন কী হবে? ১৫/১৬ বছরের মেয়ের বিয়ে দিলেই মেয়েটির জীবন নিরাপদ? এই বয়সে তার শরীর-মন কোনটিই প্রস্তুত নয় সংসার করার জন্য। অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর গর্ভধারণ মা-শিশু দু’জনের জন্যই জীবন ঝুঁকি। এছাড়া আছে নানা রোগ। জরায়ু ক্যান্সার থেকে শুরু করে আরও অসুস্থতা, যা জীবন ভর সেই নারীটিকে সয়ে যেতে হয়। এই নিয়ম অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণ ও গর্ভধারণকে উৎসাহিত ও সামাজিকভাবে আরও প্রতিষ্ঠিত করবে।

অ্যাবরশনকে নিষিদ্ধ বা অনুৎসাহিত করারও চিন্তা থেকে এটা করা। মেয়েদের “নিরাপত্তা” দেবার নাম করে বাল্যবিবাহ কি নতুন কিছু? বিশেষ করে ইসলামিক দেশগুলোতে? পনের শ বছর আগেই তো মেয়েদের “রক্ষা” করার নামে এ ঘটনা ঘটেছে!

অনেক অল্প বয়সেই মনে প্রশ্ন জাগতো, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাবা হয়ে নিরাপত্তা না দিয়ে “স্বামী” হয়ে নিরাপত্তা দিতে হবে, এ কেমন ফিলোসফি? পরে তো জেনেছি, দত্তক নেওয়াই ইসলামে নাই, আর কেন নাই জেনে বমি লাগে!

“বিশেষ” অবস্থা বলে একেকজন একেক ধরনের কথা বলতে পারেন। প্রথমেই ধরি, বাবা-মা চান ১৬ বছরের মেয়ের বিয়ে দিতে। কারণ অনেক হতে পারে। যেমন, এমন ছেলে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে যা মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো! তখন বাবা-মা যেকোন ধরনের বিশেষ অবস্থার কথা বলতে পারেন। মেয়ের নিরাপত্তার অজুহাত দিতে পারেন।

যদিও বিয়ে কেন, সন্তানের মা হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক, স্বামী বর্তমান নারীর নিরাপত্তাও নেই সমাজে, রাষ্ট্রে! “বিশেষ” অবস্থাটি সত্যিকার অর্থে কে পরীক্ষা করবেন? আর অল্প বয়স্ক ছেলে-মেয়ে যদি শারীরিক সম্পর্ক করে এবং গর্ভধারণ ঘটে, তাহলে বিয়ে দিয়ে দিলে সব সমস্যার সমাধান হবে, এটা ভাবা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ? উন্নত সমাজে স্কুলে শিক্ষা দেওয়া হয় যেন অল্প বয়সে গর্ভধারণ না ঘটে সে বিষয়ে। এটাকে হেলথ ক্লাস বলে। একটি বয়সে ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া হয় পরিবর্তনশীল শরীর সম্পর্কে।

পিউবার্টি কী, কেন, কী হয় শরীরে, কী করা উচিৎ বা অনুচিৎ ইত্যাদি এর অংশ। সেক্স এডুকেশন মানে কিন্তু কীভাবে সেক্স করতে হয়, তা নয়। অধিকাংশ বাংলাদেশীর ধারণা, এটা বুঝি সেক্সুয়াল অ্যাক্ট শেখায়! অথচ এই ক্লাস শুধু যে মানব শরীরের পরিবর্তন এবং তা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, পিরিয়ড কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মোকাবেলা করতে হবে তাই শেখায়, তা নয়।

এখানে এইডসসহ অন্যান্য যৌন রোগ সম্পর্কেও বলা হয়। যৌন রোগ থেকে রক্ষা, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ সম্পর্ককেও বলা হয়। অথচ এই শিক্ষা বাংলাদেশে চালু করার কথা স্বপ্নেও ভাবা যায় কি?

ভাবটা এমন সেক্স এডুকেশন দিলে ছেলেমেয়েরা সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ হবে! আমরা উন্নত সমাজের খারাপ দিক কোন প্রশ্ন ছাড়াই নেই, কিন্তু যা ভালো তা নিয়ে সামান্য ভাবতেও রাজী নই! সেক্সুয়াল অ্যাক্ট শেখার জন্য যেন বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা বসে আছে!

ক’দিন আগে খবরে জেনেছি, বাংলাদেশে স্কুলের ৭০% ছেলে-মেয়ে পর্নোগ্রাফি দেখে!

আর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সাথে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিয়ে মানে ম্যারিটাল রেইপ। এই কারণে সন্তান হচ্ছে ধর্ষণের সন্তান। যা মা-সন্তান দু’জনের জন্যই অনাকাংখিত। নিরাপত্তার জন্য পড়ালেখা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া, সর্বোপরি আত্মবিশ্বাসী হওয়া প্রতিটি নারীর যেমন নিজস্ব চেষ্টা হতে হবে, সেভাবে মা-বাবা, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে যার যার নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

রাষ্ট্রকে নারীর পথ রুদ্ধ করা নিয়ম নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কের সাথে প্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে দিয়ে পেডোফিলিয়াকে বৈধতা দেওয়ার নামই হচ্ছে এই “বিশেষ” আইন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.