‘নারীশক্তি’ মানে শারীরিক শক্তিকেও বুঝতে হবে

তামান্না সেতু: ‘নারীশক্তি’ শব্দটি বলার সময় এখনো অধিকাংশ নারী-পুরুষ একে নারীদের মানসিক শক্তি বলেই মনে করে। নারীশক্তির অর্থ যে মানসিক শক্তির পাশাপাশি শারীরিক শক্তিও হতে হবে এ কথা ভাবার মন এখনো কেন যেন আমাদের হয়নি।

একটি মেয়ে পরিস্থিতির কারণে যদি কাউকে বলে ‘এক থাপ্পরে দাঁত ৩২ টা ফেলে দেবো’ বা ‘পিটিয়ে হাড্ডি গুড়ো করে ফেলবো’ তাহলে তার মা, বোন, বান্ধবীও তাকে বলবে, ‘তুই ব্যাটা ছেলেদের মত কথা বলিস কেন?’

মেয়েরা সর্বোচ্চ বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে সাহায্য চেয়ে তার মানসিক শক্তির জানান দিতে পারে অথবা ‘তুমি আমার কাছে এলে কিন্তু আমি চিৎকার করবো’ বলতে পারে, কিন্তু একটা মেয়ে এসব না করে হাত মুঠ করে টেনে একজনের নাক বরাবর ঘুষি মেরে দিতে পারে এই ভাবনা আমাদের আসে না।

ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক বৈশাখি মেলা থেকে আমার মা আমার জন্য কাঁচের রেশমি চুড়ি কিনে এনেছিল। শারি -চুড়ির প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার অসীম ভালবাসা। সেই চুড়ি অনেক চেষ্টার পরও আমার হাতে ঢুকাতে না পেরে মা হতাশ হয়ে বলেছিল, ‘হাত তো ছেলেদের মতো শক্ত বানায় ফেলছিস ডাংগুলি খেলে। মেয়েদের হাত নরম না হলে হয়?’

setuনারীশক্তি মানে মেয়ে শিক্ষিত হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে সব ঠিক আছে। কিন্তু মেয়ে মুঠ পাকিয়ে চোয়ালে ঘুষি মেরে দেবে এ চিন্তায় নৈব নৈব চ।

বাংলা ছবির নায়িকা মানেই আমাদের কাছে ‘বাঁচাও বাঁচাও’! ধর্ষিতার গলায় দড়ি বা ‘আমি কিন্তু চিৎকার করে লোক ডাকবো বলে দিলাম’! কেন?
আশার কথা হলো ইদানিং এর বাইরেও সিনেমা হচ্ছে। আমার দেখতেই ভাল লাগে মাহী নামের মেয়েটা লাফিয়ে লাফিয়ে শয়তান লোকদের হাত-পা ভেঙে দিচ্ছে।

আমি খুব সচেতন পরিবারকেও দেখেছি, জোরে কথা বলা তাদের বাড়ির ছেলেদের জন্য গ্রান্ট হলেও মেয়েদের জন্য এটা অভদ্রতা। জোরে পা চালিয়ে হাঁটা, প্রয়োজনে দৌড় দেয়া, কাঁধে ভারী ব্যাগ নেয়া, শরীর শক্ত হয়ে যায় এমন কাজ করাকে তারা ছেলেদের কাজ বলে মনে করে। তারাও চায় ‘নারীশক্তি’ জ্বলে উঠুক। কিন্তু ওই যে বলেছি তার মানে শিক্ষিত হয়ে ওঠা বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা (কিন্তু আস্তে গলায়), বিপদে চিৎকার করে ওঠা (সাহায্য চেয়ে)।

আশ্চর্যজনক সত্য কথা হলো এই রুপ সবথেকে বেশি ওভারকাম করতে পেরেছে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষেরা। এদের ভেতর নারী পুরুষ এর কাজের ক্ষেত্র একই রকম মোটামুটি। মাটি কাটা, ইট ভাঙা, ক্ষেতের কাজে প্রত্যেকের সমান বিচরন। এরা বিয়ের পাত্রি খোঁজার সময় নরম সরম মেয়ে খোঁজে না। উলটো শক্ত সামর্থ্য মেয়েকে প্রাধান্য দেয় কারন উপার্জন দুজনকেই করতে হয় এবং শিক্ষা কম থাকার কারনে এদের কাজের ধরন মূলত কায়িকশ্রম নির্ভর।

নারীশক্তির অর্থ অবশ্যই মানসিক শক্তির পাশাপাশি শারীরিক শক্তিও হতে হবে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীকে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ কেন সবসময় শরীরের জোরে ধর্ষন করতে পারবে? কেন শক্তির দিক থেকে একজন নারী পুরুষ সমান হবে না।

রাগ হতে পারেন অনেকে আমার কথায়, কিন্তু সত্যি বলছি যখন আমি শুনি একজন পুরুষ একজন নারিকে নির্যাতন করেছে তখন প্রথমে নারীটির ওপর রাগ লাগে পরে কষ্ট হয়। আমার মনে হয়, কেন সে নিজেকে রক্ষা করে ওই পাশন্ডটাকে পিটিয়ে সোজা করতে পারলো না।

অথচ পৃথিবীর আদি ইতিহাস বলে এই আমরাই শুরু করেছিলাম শক্তির কাজ। আমরা সূর্যের সন্তান। আমরা কৃষি কাজ করেছি, পশু শিকার করেছি, প্রতিটা মানব দলের নেতা ছিল নারী (রেফারেন্স -ভোলগা থেকে গঙ্গা)।

ব্যবহার না হলে ধারালো চাকুও দিয়েও কিছুদিন পর চোরের নাক কাটা যায় না। আমাদের অব্যবহিত শক্তিতেও আজ মরিচা ধরেছে।
আমাদের স্বামী, রাস্তার পুরুষ, লোকাল বাসের যাত্রি তাই আজ আমাদের নিগৃহীত করে পার পেয়ে যায়। আমরা তাদের হাত মুচড়ে দিতে পারি না। জন্ম দেই নারী নির্যাতন শব্দের। ইউনিভারসিটির শিক্ষিকার উপড়ে ফেলা চোখ, আগুনে দগ্ধ শরীর, পিটিয়ে থেতলে ফেলা দেহ মানসিক শক্তি লেখা কাগজের তাবিজের দিকে তাকিয়ে তাই আজ হাসে।

আমি বলছি না, নারীরা শক্তি দিয়ে পুরুষকে নির্যাতন করুক বা করা উচিত। যা অন্যায় তা সকলের জন্য অন্যায়। আমি বলছি শারীরিক শক্তি দিয়েই শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হয়। সেই প্রতিরোধের শক্তি অর্জন করুন। কায়িক শ্রমের কাজগুলোতেও আপ্নারা অংশ গ্রহন করুন।

জন আব্রাহামের মাসল দেখে মুগ্ধ হবার পাশাপাশি নিজের মাসল এবং নায়িকার মাসল দেখার জন্য মনকে অভ্যস্ত করুন।
আর হ্যা, যেদিন দেখবেন নায়িকার হাতের মাসল দেখেও আপনার চোখ-মন স্বাভাবিক আছে, সেদিন জানবেন মানসিক শক্তির দিক থেকেও এবার আপনি একজন শক্তিমান নারী।
ওটা না পারা পর্যন্ত মানসিকতাতেও আপনি দুর্বল।

শেষ কথা, শক্তি নির্যাতন করতে নয়, নির্যাতন প্রতিরোধে ব্যবহার করুন। সেখানেই শক্তির মুক্তি।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.