স্যালুট সালমা এবং হাজারও এমন নারী

রাবেয়া জাহান আভা: সংসারের যন্ত্রণাময় অধ্যায় থেকে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে কন্ঠশিল্পী সালমাকে। এটা তার জন্য সৌভাগ্যজনকই বটে যে, জীবন থেকে সময় ফুরিয়ে যায়নি, এখনো তার শ্রোতাপ্রিয়তা আছে। যদিও আর দশটি মেয়ের মতো তিনিও চেয়েছিলেন সংসারটাকে ধরে রাখতে। বের হয়ে আসাটা অবশ্যই স্যালুট দেয়ার মতোই বিষয়। তবে তারপরও এই সমাজে টিকে থাকাটা তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের।   

salma-1গত কয়েকদিনে সালমার বিষয়টি সামনে আসায় আমার কেবলই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বান্ধবীর কথা মনে পড়ছে বারবার। উচ্ছল, সর্বদা হাসিখুশি বন্ধুটি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জাদুকরি কন্ঠ দিয়ে ভুলিয়ে রাখতো আমাদের সবাইকে। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যতো অনুষ্ঠান হতো সবগুলোতেই তাকে চ্যাম্পিয়ন হওয়া চাই। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম ওর গান। একই হলে থাকতাম বলে ওর ব্যক্তিগত বিষয়ও জানা ছিলো সবার। ওর সাথে মাঝে মাঝেই দেখা করতে আসতো দেশের অতি নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া ব্রিলিয়ান্ট প্রেমিকটি। এটা এক ধরনের গর্বের বিষয় হিসেবেও দেখা হতো কার প্রেমিক কতটা নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়ে বা কতটা ভাল রেজাল্ট করা। কিন্তু ওর মধ্যে একধরনের হতাশাবোধ কাজ করতো সবসময়। বলতো যে, ছেলেটির সাথে বিয়ে করাটা ওর পরিবার মেনে নেবে না। তবে ও একা একা বিয়েটা করবে পরিবারের অমতেই।

পরে শুনেছিলাম ওরা বিয়ে করেছে। এরপর অনেকদিন দেখা হয়নি আমার ওই বন্ধুটির সাথে। বেশ কয়েকবছর পর হঠাৎই এক বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা ওর সাথে। খুব সাধারণ পোশাকে আসার বিষয়টি আমার নজর কেড়েছিলো। তবে অল্প কথাতেই এটুকু বুঝেছিলাম ওর বর একটা নামকরা ‍প্রতিষ্ঠানের বস টাইপের এবং ইতিমধ্যেই ওরা গাড়ি, ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে। কিন্তু ততোদিনে ওর গানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে ওর স্বামী নামের প্রেমিক পুরুষটি।

এর কয়েকবছর পর ঢাকায় একই এলাকায় থাকার সুবাদে আবারো হঠাৎই আরেকদিন দেখা। এরপর প্রায়ই দেখা হতো আমাদের। কথা হতো, ততোদিনে সে দুই বাচ্চার মা, গান তো স্বর্গবাসী হয়েছে। গাড়ীতে চড়ে বেড়ায়, গার্মেন্টস মালিক স্বামী প্রায়ই মারধোর করে বউকে আরো বেশি জব্দ করতে। তবে ডিভোর্স নেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করা মেয়েটি। কোন মুখ নিয়ে যাবে তাদের কাছে, সমাজের কাছে। নিজের পছন্দের বিয়ে, না টেকার দায় তো তারই। পরিবার কেন বইবে তার দায়!

ততোদিনে আমার বন্ধুটি শিখে গেছে পরিবারের কাছে দেখাতে যে, সে কতোটা ভালো আছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবাইকে সহযোগিতা করতে পারছে আর্থিকভাবে-নিজে মার খেয়েও। বাচ্চারা পাচ্ছে বিলাসময় জীবন, সামাজিক স্বীকৃতি। আর আমার বন্ধুটির ঘরে বসে নীরবে চোখের জল ফেলা ছাড়া যে আর কিছুই করার নেই। গান ছেড়েছিলো ভালোবেসে, ভালো থাকার প্রয়াসে। এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। অনেক মেয়ের এভাবেই বড্ড দেরি হয়ে যায় বুঝতে, প্রিয় মানুষটিকে চিনতে। সেই মানুষ যাকে ভালোবেসে একদিন ঘর, পরিবার সব ছেড়েছিলো।

ava-edited
আভা

এই চিত্র আমাদের পুরো সমাজের অনেকটা জুড়ে। সালমার সময় ফুরিয়ে যায়নি, ফিরতে পেরেছে তার পরিবারের কাছে কারণ ওই পরিবারের দায়ভার বহন করার শক্তি এখনো তার ফুরিয়ে যায়নি। দেশের মানুষ যারা তার গান ভালোবাসতো তারা এখনো তাকে ভুলে যায়নি। কতজন পারে নি:শেষ হয়ে এভাবে ফিরতে। সালমা স্যালুট পাবার যোগ্য অবশ্যই। তার এখন তার বড়ো প্রয়োজন অনেক বেশি মানসিক শক্তি নিয়ে আবার গানের জগতে ফিরে আসা। মানুষের খোটা দেয়া কথা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করা। নিজের বাচ্চাকে সুস্থ, হাসিখুশি জীবন দেয়া। তবে তারাও কী স্যালুট পাবার যোগ্য নয়, যারা শুধুমাত্র একটু আশ্রয়ের, ভালোবাসার অভাবে দিনের পর দিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এসব ভালোবাসায় ভরা (?) স্বামী নামক প্রেমিক পুরুষের ঘর করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর মানসিক, শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে; সন্তানের মুখের হাসি, নিশ্চিত সামাজিক জীবন কেড়ে না নিতে।

সমাজের মানুষের প্রতিনিয়ত কাটা দেয়া কথা, পরিবারের দোষারোপ, সন্তানের অনি্শ্চিত ভবিষ্যত(আর্থিক, সামাজিক), সর্বোপরি নিরাপত্তাহীন সমাজে টিকে থাকার লড়াইটা যে আরো বেশি কষ্টদায়ক, অসহনীয়; প্রতিদিন মার খাওয়ার চেয়ে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.