বিয়ের বয়স: শারীরিক না মানসিক?

নায়না শাহ্‌রীন চৌধুরী: বিয়ে ব্যাপারটা আসলে কী? ১) পরিবার গঠনের জন্য দায়িত্ব নেওয়ার একটা সামাজিক, ধর্মীয় বা আইনগত এগ্রিমেন্ট? নাকি ২) শুধুমাত্র নির্বিঘ্ন যৌনজীবন কে বৈধতা দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া?

যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয় তাহলে রাষ্ট্র যে আইন করেছে তা একেবারেই যথার্থ। বিয়ের জন্য যে বয়সটি (শর্ত প্রযোজ্যর মত বাকি ক্লজসহ) বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সে বয়সটি তে সবারই নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকে। আর তখনই যদি সেই ব্যাপারটা সামনে আসে, কেয়া বাত!

naina-2
নায়না শাহরীন চৌধুরী

অবশ্য, মেয়েদের কথা একটু আলাদা। শরীরী আনন্দের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ বা সন্তান ধারণের ব্যাপার গুলোয় মেয়েদের অল্পবয়সে ঝক্কি সামলাতে হয়। হোক না! এদেশে যত কম বয়সে বিয়ে হয়, সন্তান হয়, ব্যাপারটা ততই গর্বের। অনেকেই বলে, আমার ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে, ১৪ বছরে বাচ্চা হয়েছে। আমার মায়ের সাথে আমার বয়সের ফারাক বেশি না। এসব হাসিমুখে ও সগর্বে উচ্চারিত হয়। বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে অনুমতি অন্তত একটি ১৮ বা ১৬ বা আরও কম বয়সের কোন বিবাহিত মেয়ের থেকে আশা করা যায় না।

এক্ষেত্রে অভিভাবক ও স্বামী এবং তার পরিবারই প্রধান। একটি শিশুকে এদেশে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় যৌনকর্মে ব্যবহারকে ভদ্রলোকেরা ‘ধর্ষণ’ বলে থাকেন, কিন্তু বিবাহিত মেয়েদের আবার ধর্ষণ কি? আমাদের সামাজিক ধর্মীয় পরিমণ্ডলে পুরুষতান্ত্রিকতার ফ্যান্টাসিতে অল্পবয়সী মেয়ে চরমভাবে আকাঙ্ক্ষিত। তা সে বেশ্যালয় হোক বা বিয়ের বাজার। গত একশ বছর এমনই হয়ে আসছে, এবং খুব বেশি পরিবর্তন আসলে, আমরা মানতেও পারবো না।  

যাইহোক, বিয়ের অর্থ যদি প্রথম অপশন হয়ে থাকে, তাহলে তো একটু ঝামেলা আছে। ১৮ বছরে আপনার মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার আগে তাকে সংসার সম্পর্কে সার্বিক ভাবে বোঝাতে হবে। দায়িত্ব নেওয়ার মত গড়ে তুলতে হবে। এখন তো আর অত যৌথ পরিবার নেই। তার আসন্ন সন্তানটিকে মানুষ করার মত ট্রেনিং তাকে দিতে হবে। মানে এক কথায়, ছোট থেকেই তাকে পাকিয়ে ঝানু করে ফেলতে হবে। তবে যদি সে বিয়ে ব্যাপারটার মানে বুঝতে পারে!  

হ্যাঁ, এটা এমন নয় যে আপনার সন্তানটিকে ১৮ বা ২১ বছরেই বিয়ে দিতে হবে। বা হলেও খুব দোষনীয় বলছি না। আমার ধারণা পরিষ্কার নয় বিয়ের বয়সের পরবর্তী লাইনগুলো নিয়ে। বয়সের অপব্যবহার তো বাল্যবিয়েতেই হয়। আর এখন তো বেহুলার বাসরঘরের মত একটা ফুটোও রাখা হ’লো। কোন বিশেষ অবস্থায়একটি মেয়ে শিশু কে এমন একটি সম্পর্কে যেতে বাধ্য করতে পারে অভিভাবক? সেটা সেই শিশুর জন্য কতটা ভাল সেটা কি অভিভাবকরা সত্যি নির্ধারণ করতে পারেন?

আমাদের দেশে কনের বয়সের থেকে পাত্রের অবস্থা বড় হয়। ১৪ বছরের মেয়ে ৩০ বছরের পাত্রের স্ত্রী হয় আর এক অসহ্য দাম্পত্য সম্পর্ক আমৃত্যু বহন করে। গ্রামে গঞ্জে ছোট মেয়েদের সাধ্য না থাকলেও নরমাল ডেলিভারি হয় ব্লেড বা কঞ্চি দিয়ে যৌনাঙ্গ চিরে। শাশুড়ি মুখে পান দিয়ে গর্বের সাথে চাউর করেন সেই কথা। মেয়েটির কষ্ট বা মৃত্যু নতুন শিশুর কলকাকলিতে হারিয়ে যায়।

বিয়ে ব্যাপারটা তো একটা বিরাট দায়িত্ব হওয়ার কথা। শারিরিক মানসিকভাবে উপযুক্ত না হ’লে কিভাবে একটা মেয়ে বা ছেলে একটা সংসার চালাবে। যে বয়সটা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটাতে সাধারণত প্রেম, আবেগ, নির্বুদ্ধিতা, অস্থিরতা হরমোনের মতোই আসা-যাওয়া করে। বয়সের ঐ পর্যায়ে স্থিরতা , বিচক্ষণতা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, সংযম জরুরি, যদি সংসার ধর্ম শুরু করে থাকেন। পারলে ভালো। না পারলে বিপদ। আপনার সংসার হয়তো আপনার বাবা-মা শুরু করিয়ে দেবেন, কিন্তু করতে হবে আপনাকেই।

আমরা এখন একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে, তবু সামাজিক প্রাচীনত্ব মননে ধারণ করে চলছি কি আমাদের পূর্বপ্রজন্মের নস্টালজিয়ায়? নাকি সত্যি ভাল চাই আমাদের সামনের আগামী প্রজন্মের? প্রশ্নটা বিবেকের কাছেই রাখলাম।    

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.