এই যুগের সীতা পাঠ (পর্ব ১)

farzana-aksha-3
ফারজানা আকসা জহুরা

ফারজানা আকসা জহুরা: সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করলেও সেই মানব সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা একমাত্র এই নারীকুলের। বলতে পারেন, মানবজাতির মধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষমতা একমাত্র এই নারীকুলের। এটা অন্য কারোর দেয়া “দয়া” বা “দান” নয়, স্বয়ং ঈশ্বর সৃষ্টির আদিতেই নারীকুলকে এই ক্ষমতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরের দেয়া এই ক্ষমতা কবে কখন কে হরণ করলো তা জানি না, তবে রাবণের সীতা হরণের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি যে সহিংসতার চর্চা শুরু হয়েছিল, তা আজও বিদ্যমান।

ঋষি বাল্মীকি রচিত মহাকাব্য রামায়ণে রাবণ একটা নেগেটিভ চরিত্র। আর তাই তার পক্ষে সব অপকর্ম করা সম্ভব। তাই তো সে সীতাকে হরণ করে নিজের ও তার সাম্রাজ্যের ধ্বংস ডেকে এনেছিল। অন্যদিকে রাম সে একটি পজেটিভ চরিত্র। কারণ সে ভালো ছেলে, সে মায়ের কথা শুনে …. ভাইয়ের কথা শুনে … সবার কথা ভাবে, সবাই তার খুবই আপন! জনগণের দুঃখের কথা ভেবে ভেবে সে অস্থির …….l অথচ এই রাম ভাবেনি শুধু সীতার কথা, সীতাকে বিশ্বাসও করেনি! আর তাই তো সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। তাতেও কি সন্দেহ দূর হয়েছিলো রামের?  জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত রাম সীতাকে বনবাসে পাঠায়ে দিব্যি রাজত্ব করেছেন।

ওদিকে পতিভক্ত সীতা! যার জন্ম শুধুই স্বামীর জন্য, তার সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য! আর তাই তো তাকে স্বামীর সাথেও বনবাসে যেতে হয়েছিল, আবার স্বামীর আদেশেই বনবাসেও যেতে হয়েছিল! তবুও সে ‘উফ’ করতে পারেনি …. পারেনি কোনো প্রতিবাদ করতে। কারণ সমাজের চোখে চরিত্রবান নারীরা স্বামীর আদেশ অমান্য করে না …. স্বামীর মুখে মুখে তর্কও করে না। স্বামী যে তাদের কাছে ভগবান, তাই তো সীতা স্বামীর বিরুদ্ধ কোনো অভিযোগ না করে বনবাসে গিয়ে রামের মূর্তি বানিয়ে পুজো করেন! বলুন তো, এমন নারীকে সমাজ যদি আদর্শ না বানায়, তা হলে কি চলে? আর এই সব কারণেই আজ আমাদের সমাজে নারী হিসাবে সীতাই আদর্শ আর পুরুষ হিসাবে রাম।

feminism-1অথচ এই সমাজ কখনো দেখেনি, কতটা অপমানে, কতটা কষ্টে সীতা সংসার ত্যাগ করেছিলেন! আর সেটা তো কেবল আত্মসম্মান বোধের কারণে, তাই নয় কি? কই সমাজ তো আমাদের সীতার সেই আত্মসম্মান বোধের শিক্ষা দেয় না? আবার সীতা রামের নাম-পরিচয় ছাড়াই তার দুই পুত্রকে মানুষ করেছিলেন। স্বামীর পরিচয় বা সন্তানদের বাবার নাম তো তার দরকার পড়েনি …. না রামের কোনো ধরনের সাহায্য। অথচ সমাজ কখনো আমাদের সীতার এই সাহসী মনোবলের কথাও বলে না। বলে না তার নীরব প্রতিবাদের কথা। যে প্রতিবাদের কারণে সে দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা না দিয়ে দেবী ধরিত্রীকে আহ্বান করেন দ্বিখণ্ডিত হতে, তাকে পাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমাদের এই সমাজ সীতার সকল গুনকে গুম করে নারীদের আত্মত্যাগের পাঠ পড়ায় এবং অগ্নিপরীক্ষায় অনুপ্রেরিত করে।

এই সমাজের নারীরাও যেন কেমন! তারাও মনে মনে রামের মতোন বর চায়। আর তাই তো তাদের রামেরা মায়ের কথা, বোনের কথা, ভায়ের কথা, বন্ধুর কথা.. আত্মীয়স্বজন কথা..পাড়া-প্রতিবেশীর কথা ..সবার কথাই শুনে ও বিশ্বাস করে। তাই তো এই রামেদের স্ত্রী ছাড়া সবাই আপন হয় l

কিন্তু রামেরা স্ত্রীকে কীভাবে দেখে? সে তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তাদের জীবনে, হোক না সে তাদের ঔরসজাত সন্তানের মা, তবুও সে বিশ্বস্ত না! তার নামে মায়ের কাছে, ভায়ের কাছে, বোনের কাছে বদনাম করা যায়! ঐটা তো স্ত্রীর সম্মান, তার তো কিছুই না! তাই এই সমাজের রামেরাও সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে দিব্যি নতুন জীবন শুরু করেl তাতে তাদের মান সম্মানের তো কোনো ক্ষতিই হয় না, বরং আরো বাড়ে।

আমার এক দূর সম্পর্কের নামাজি পরহেজগার ভাই, যিনি মদ খেতে হবে বলে নামকরা জাহাজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এক সময় তিনি বোনের আদেশে একটি কন্যাসহ বৌকেও ছেড়ে দিয়েছিলেন। আবার তালাকের দুই বছরের মধ্যে তিনি আবার বিয়ে করে দিব্যি সংসার শুরু করেছিলেন।

আমার আরেক ইমানদার হাজী দাদী তার বড় ছেলের বৌকে তথাকথিত ‘কন্ট্রোল’ করতে না পেরে,  বৌকে তালাক দেওয়ান। ঐ চাচীর কোলে একটি কন্যা সন্তান ছিলো। চাচাও দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার শুরু করেছিলেন। অথচ তালাকপ্রাপ্ত ঐ দুইজন নারী কিন্তু আর বিয়ে করেননি।

torture-1এই তো কিছুদিন আগে উচ্চ শিক্ষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আর অগ্নিপরীক্ষা দিবেন না বলে পাতালে গেলেন। তাও কি তিনি রক্ষা পেলেন? তার “রামরুপি” অতীতের স্বামী, যিনি কিনা নিজেই প্রেম করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন , তিনি ফেসবুকে তার অতীত স্ত্রীর সতীত্ব বর্ণনা করলেন যে, “তিনি ছিলেন দুশ্চরিত্রা”।

জানি না তিনি যে প্রেম করতেন ঐটা পরকিয়া ছিল কিনা? তবে শিক্ষিকা যে সীতার মতোনই নিজ পরিচয়ে তার সন্তানকে মানুষ করতে চেয়েছিলেন তা প্রমাণিত। অথচ এই বিংশ শতাব্দীতে উনি তা পারেননি! নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলে গেলেন। আর এই চলে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া।

ওদিকে এইসব রামেদের বৌয়ের অভাব হয় না। স্ত্রীর চরিত্রে কলঙ্ক লেপনকারিগণ ঠিকই দ্বিতীয় … তৃতীয় বিয়ে করে আমাদের বুকের উপর রাম সেজে বসে আছেন। কই তাদের তো কোনো অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় না?

অনেক আগে একটা সিনেমা দেখে ছিলাম, নাম “শাস্তি”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছোট গল্প l গল্পে দুই ভায়ের বৌ সারাদিন ঝগড়া করে …. বৌদের ঝগড়ায় দুই ভাই বিরক্ত, একদিন বড় ভাই রাগের মাথায় বৌকে খুন করে ফেলে। বড় ভাই বুঝতে পারে সে খারাপ কাজ করেছে, তার অনুশোচনা হয়।

কিন্তু ছোট ভাই, সে তার বড় ভাইকে স্ত্রী হত্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য …. নিজের স্ত্রীকে হত্যাকারী বানায়! বলে, “বৌ গেলে বৌ পাবো, ভাই গেলে ভাই পাবো না”। কেন জানি এই কথাটা মাথায় খুব বাজে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমনই যে কখনত্ত বৌয়ের অভাব হয় না!

আমাদের এই সমাজের পুরুষেরা রাবণ হয়ে সীতাকে হরণ করে, আর রাম হয়ে অগ্নিপরীক্ষা নেয়, বিশ্বাস না হলে বনবাসে পাঠায়! কি কিছু ভুল বললাম?

মনে নাই? পিএইচডি করা উচ্চশিক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ শিক্ষিকাকে? যার “রাবণরুপি” স্বামী তাকে তথাকথিত কন্ট্রোল করতে না পেরে চোখই উপড়ে  ফেলেছিলেন! ঐ স্বামী ও স্ত্রীর সতীত্ব বর্ণনা করলেন যে, “তার বৌ ছিলেন দুশ্চরিত্রা” !

আবার দেখুন এই যে সেদিন মাটি থেকে উঠে আসা নাম করা গায়িকা, যার গানে মুগ্ধ হয়েই কোটিপতি ভদ্রলোক তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই তো তার গান বন্ধ! নিশ্চয় তাকেও পদে পদে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে? এখন তিনি প্রতিবাদ করেছেন, নিজের মতোন বাঁচতে চেয়েছিলেন, আর তাই তো তাকেও একই কথা শুনতে হলো “দুশ্চরিত্রা”।

এই সমাজের সীতারা যতদিন স্বামীর অত্যাচার মেনে নিয়ে, অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে দিয়ে ঘর করবে, ততদিন তারা ঠিক আছে, তাদের চরিত্র ঠিক আছে। কিন্তু যখন আর তারা সেটা মানবে না, তখনই তারা দুশ্চরিত্রা … বেশ্যা … কুলটা ইত্যাদি।  অন্যদিকে রামেরা সোনার আংটি, যা বাঁকা হলেও ভালো। তাতে এক রতি সোনা না থাকলেও চলবে, তাই না?

খ্রিষ্টপূর্বে রচিত রামায়ণের রাম রাবণের দেখা এই বিংশ শতাব্দীতে বড়বেশি করে বিদ্যমান। সমাজ আমাদের কখনো আমাদের দ্রৌপদী হতে বলে না, পুরুষদেরও ভীম হতে বলে ন । হ্যাঁ, আমি অগ্নিকন্যা দ্রৌপদীর কথা বলছি।  

চলবে……..

শেয়ার করুন:
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
    13
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.