বুয়েটে গো-মাংস ও ‘আপন-পর’ সংস্কৃতি

সুপ্রীতি ধর: আমি তখন যমুনা টেলিভিশনে কাজ করি (যে যমুনা আলোর মুখ দেখেনি)। টিভি লাইসেন্স নিয়ে ঝামেলা চলছে, আমরা আন্দোলন করছি তখন। হাইকোর্টে যাই, রাস্তায় নামি প্রতিদিন নিয়ম করে। এরই মধ্যে একদিন প্রেসক্লাবে দিনভর প্রতীকী অনশনও হলো আমাদের। সেই কর্মসূচির নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের সাংবাদিক নেতা, বড় ভাই অনেকে।

অনশন শেষে দেখি সবার জন্য খাবারের প্যাকেট এসেছে।

কী খাবার? জানলাম, তেহারি। হঠাৎই আমার কানে কানে এসে একজন বলে গেল, ‘দিদি, এটা তো গরুর মাংস, খাবেন আপনি’? একবার তাকে দেখলাম, তার নামের পিছনে ‘সংখ্যালঘু’ তকমা আছে। সাথে সাথেই আমি তকমাধারীদের মুখের দিকে তাকালাম। আমি নিজে সর্বভুক প্রাণী, কিন্তু অন্যরা? তারা তো সব খুইয়ে বসে নেই। এটা সংস্কারের বিষয়। নেতা ভাইকে জানালাম, আমাদের জন্য আলাদা খাবার আনতে।

atack_on_hindusউনি তখন যে উত্তর দিলেন, আমার এখনও কানে বাজে। উনি বলেছিলেন, ‘কেউ না খেলে আমার কিছু করার নেই, আলাদা করে কিছু করা যাবে না’। কয়েকজনের সাথে সংহতি জানিয়ে আমিও সেদিন সেই খাবার খাইনি। নিজেদের টাকায় খিচুরি এনেছিলাম আমরা। কিন্তু তীব্রভাবেই জানিয়েছিলাম সেই নেতা ভাইকে যে, এটা আপনারা ঠিক করলেন না। খাবার অর্ডারের সময় আপনাদের কেন মনে থাকবে না যে, এইদেশে আরও কিছু ‘মানুষ’ আছে, যাদের সংস্কার আলাদা!

এটাই একমাত্র ঘটনা না। বহু বছরের এই জীবনে এরকম বহুকিছুর মুখোমুখি আমার হতে হয়েছে। অন্যদের মুখোমুখি হতে দেখেছি।

এইতো সেদিনই একটি জিডির কপি দেখলাম। নারায়ণগঞ্জের একটি সেবায়েত আশ্রমের একজন ধর্মগুরু থানায় জিডি করেছেন এই বলে যে, মন্দিরের পাশের বাড়ির একজনের মৃত্যু-পরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য আনা গরুর মাংস মন্দিরের পুকুর ঘাটে রাখা হয়েছে এবং সেখানে ধোয়া-ধোয়ির কাজ হয়েছে। এতে সেবায়েতদের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই ঘটনায় কোনো পদক্ষেপ আদৌ নেয়া হয়েছে কীনা, জানা যায়নি। ধরেই নিতে পারি দেশজুড়ে সংঘটিত আর দশটা মূর্তি ভাঙা, মন্দির ভাঙচুর, সংখ্যালঘু উচ্ছেদের মতোনই এই ঘটনারও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের আবার অনুভূতি আছে নাকি?

আমরা তো ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, প্রতিবেশিদের কেউ কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের নিমন্ত্রণ করলে বলে যেতেন মাকে যে, মাসীমা/বৌদি, আলাদা আয়োজন আছে আপনাদের জন্য। আসবেন কিন্তু! এটা কেন বলতো? বলতো শ্রদ্ধাবোধ থেকে, যাতে গরু-খাসীতে মাখামাখি না হয়ে যায়, সেই শিক্ষা থেকে। তো, সেই শিক্ষা কি ভুলে গেল সবাই?

আজকে এতোগুলো কথা বলার কারণ হচ্ছে, ফেসবুকে দেখছি, বুয়েটে সিভিল সামিটে নাকি খাসীর মাংসের তেহারি বলে গরু খাওয়ানো হয়েছে, যেখানে সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরাও ছিল। এবং কাজটি করেছে আনোয়ার স্টিল কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় আমি কাকে দায়ী করবো? ওই স্টিল কর্তৃপক্ষ? নাকি বুয়েট কর্তৃপক্ষকে?

স্টিল কর্তৃপক্ষ আয়োজনে থাকলেও বুয়েটের লোকজন তো ছিল। তার মানে উভয়ই সমানভাবে দায়ী এই ঘটনার জন্য।

ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম যে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় কার্তুজ নিয়ে এরকম একটি সংকট তৈরি হয়েছিল হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের মধ্যে। ইংরেজরা প্রচার করেছিল, যে কার্তুজ ওরা মুখ দিয়ে কেটে শত্রুপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারে, সেটিতে গরু এবং শুকরের চর্বি রয়েছে। এ নিয়ে তখন ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।  

তো, শুনলাম বুয়েটের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। আর কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চেয়েছে।

আমার সিম্পল কথা, এখানে ক্ষমা চাইলেই কি সব দোষত্রুটি ক্ষমার যোগ্য? যে অন্যায়টা হলো, যে অনাচারটা হলো, সেটা কি কেবল ক্ষমা চাওয়ার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়? এটা যে একটা কালচারের ওপর কতো বড় আঘাত, সেটা কি কারও গর্দভ মাথায় ঢুকবে?

যেসব সনাতন ধর্মাবলম্বী জীবনভর একটা সংস্কারের (আমি কিন্তু ধর্ম বলছি না) মধ্যে বড় হয়েছে, তাদের আজ কেমন লাগছে? এর সাথে নাসিরনগরের ঘটনার কোনো পার্থক্য আছে? এর সাথে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সংখ্যালঘু উচ্ছেদের কোনো পার্থক্য আছে?

আর এই যে ক্ষমা চেয়েই খালাস পাওয়ার সংস্কৃতি, সেটা তো ‘মালাউন’ বলে গালি দিয়ে পরক্ষণেই তা অস্বীকারের শামিল। কোথাও কেউ গো-মাংস খাওয়াচ্ছে, কোথাও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করছে, কোথাও সংখ্যালঘু নারীদের ‘গণিমতের মাল’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সবই একই সূত্রে গাঁথা।

অনেকেই বলছেন, আজ যদি উল্টোটা হতো? যদি গরুর মাংস বলে শুকরের মাংস খাওয়ানো হতো মুসলমানদের? আর সেটা যদি করতো কোনো হিন্দু প্রতিষ্ঠান? কয়টা বাড়ি জ্বলতো? কতজন মরতেন? কতজন দেশ ছাড়তেন একরাতে এক কাপড়েই? তার কোনো হিসেব আছে?

আসলে এই যে এতোসব বলছি, এসবই অরণ্যেরোদন মাত্র। আমি জানি, যারা এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে বড় হয়নি, তারা বলবে, কী আর এমন হয়েছে! খেয়েছে তো খেয়েছে, শেষ। ক্ষমাও চাওয়া হয়েছে। আর কী চাও!

attack-11আমি তাদেরকে বলি, একটিবার, মাত্র একটিবার নিজে ওই ছেলেটি বা মেয়েটির জায়গায় নিজেকে ভাবুন, যে কোনোদিন গো-মাংস খাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি, (যেমন আপনিও শুকর খাওয়ার কথা ভুলেও মনে আনেন না) যে গরুকে মায়ের জায়গায় ভেবে এসেছে, যে একটা নির্দ্দিষ্ট ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বড় হয়েছে!

বন্ধু অশেষ রায় লিখেছেন, খুব অবাক হই সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঝাণ্ডাধারী সেইসব কাণ্ডারী ও বুদ্ধিজীবীদের হীরম্ময় নীরবতা দেখে! মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা অসাম্প্রদায়িকতা যখন আজ চরম বিপন্ন, দেশের নানান জায়গায় হিন্দু ও আদিবাসীদের উপর আক্রমণ ‘৭১ এর বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখনো তাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। সুসময়ে ঘরে ফসল তোলায় তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিজীবীদের শিরদাঁড়া যখন পদক-পদবীর কাছে নতজানু হয়ে খকে, তখন সামনে শুধু ঘোর অন্ধকার ছাড়া আর কী থাকে?

এতোসব ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ দলে দলে দেশ ছাড়ছে, আগেও ছাড়তো, প্রতিদিনই ছাড়ে। ছোট বোন মলিনা তার বাড়ি থেকে ঘুরে এসে জানালো, তাদের এলাকার তিনটি ঘর থেকে ১৬ জন মানুষ চলে গেছে। কোথায় যায় আমরা জানি। কিন্তু কীভাবে যায়, কেমন থাকে, সেই খবর কি আমরা রাখি? ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া সহজ কথা না, প্রতিটি ইঞ্চি বালুকণা মনের ভিতরে জায়গা নিয়ে থাকে, এই টান অনেক মধুর, আবার প্রচণ্ড কষ্টেরও। যে যায় সেই জানে কেবল।

তাই বলছিলাম কী, ভাবুন, আপনারা ভাবুন। একাই থাকবেন এখানে? যেমন থাকে পাকিস্তান-আফগানিস্তানে! থাকবেন সেইরকম? থাকতে চান? সময় নেই আর, তারপরও বুকটা টান করে একবার দাঁড়ান না ভাই আমাদের পাশে! যতোটা খারাপ ভাবেন, আমরা কি আসলে তাই?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.